কথিত পরকীয়ার ঘটনায় ফেনীতে তোলপাড় চলছেই। উল্টো ক্ষণে ক্ষণে ঘটনার দিক পাল্টাচ্ছে। চার সন্তানের জননী ও দুই সন্তানের পিতা যুগলকে আটক করে খুঁটিতে বেঁধে নির্যাতনের ঘটনা, বিচ্ছেদ, বিয়ে, মামলা ও আটকের ঘটনা গোলক ধাঁধাঁ তৈরি হয়েছে। রুনাকে প্রথম স্বামী তালাক দেয়ার পর এরশাদকেও তালাক দিয়েছে তার প্রথম স্ত্রী। ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নেয়ার চেষ্টা চলছে বলে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উঠেছে। পক্ষপাতের অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধেও। আটক তিনজনের মধ্যে দু’জনের জামিন হলেও একনম্বর আসামি কারাগারে। তাকে ছেড়ে না দিলে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেয়া হচ্ছে পরিবার পক্ষ থেকে।
এদিকে কোনো আপত্তিকর অবস্থা বা কারও ঘর থেকে আটক করা হয়নি বলে দাবি করেন রুনা ও এরশাদ। এরশাদের দাবি তিনি ঘরের বাইরে দরজার সামনে আর রুনা ঘরের ভেতরে অবস্থান করছিলেন এবং কথা বলছিলেন। দুইজনের সম্পর্ক বেআইনি হওয়ায় তার বাড়িতে মাঝেমধ্যে যাতায়াত ছিল, ওইদিনও তার ধারাবাহিকতা। এরশাদের দাবি কয়েকজন তাকে বল প্রয়োগের মাধ্যমে ঘরের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয় এবং রুনার শয়নকক্ষে নিয়ে ছবি ও ভিডিও ধারণ করে। পরে জোরপূর্বক শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করে। আর প্রেম ও পরকীয়া নিয়ে রুনা কোনো কথাই বলতে রাজি নন। তবে এরশাদের সঙ্গে বিয়ের সময় মন্তব্য করেছেন ১৪ বছর পরে হলেও মনের মানুষকে পেয়েছে।
অন্যদিকে স্থানীয়রা বলছেন, রুনার শয়নকক্ষ থেকে আপত্তিকর অবস্থায় দু’জনকে আটক করা হয়। এমন বক্তব্য রুনার সদ্য সাবেক স্বামী নুর আলমেরও। তিনি বৃহস্পতিবার রাতে ভিডিও বার্তা ও বিভিন্ন মাধ্যমে জানান তার স্ত্রী থাকাবস্থায় একাধিকবার এরশাদের সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় আটক করা হয়। পারিবারিক ও আত্মীয়দের মাধ্যমে সংসার টেকানোর স্বার্থে বৈঠকও হয়েছে। তবে পরকীয়া আর এরশাদ আসক্তি থেকে রুনাকে ফেরানো যায়নি। বাধ্য হয়েই তাকে শেষ মুহূর্তে তালাক দেন বলেও জানান নুর আলম।
এদিকে এক নম্বর আসামি আটক শাহজালাল মোহাম্মদ বাবর ফেনী সরকারি কলেজের ইসলামিক হিস্টোরি অ্যান্ড কালচার বিষয়ে অনার্স প্রথমবর্ষের ফাইনাল পরীক্ষার্থী। আটকের কারণে বৃহস্পতিবারের পরীক্ষাও দেয়া হয়নি। এ নিয়ে দুঃচিন্তায় তার পরিবার। সে সোনাগাজী পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড শিবিরের সেক্রেটারি। তার বাবা মোহাম্মদ ওমর ফারুক পৌর সেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি। পরিবারের দাবি রাজনৈতিক কারণে তাদের উপর প্রতিশোধ নেয়া হচ্ছে।
এরশাদের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, ঘরে তার এক খালা ও দেড় বছর বয়সী ভাগ্নে ছাড়া কেউ নেই। তার বাবা আবু ছুফিয়ানও লোকচক্ষুর আড়ালে চলে গেছেন। বাড়ির অন্য লোকজনও এ নিয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে তার খালা জানান, স্বভাবের কারণে আগ থেকেই এরশাদ পরিবার থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন। ১০ বছর আগে পারিবারিকভাবে বিয়ে করলেও সংসারে সাড়ে তিন বছরের এক ছেলে ও দুই বছর বয়সী এক মেয়ে রয়েছে এরশাদের। রুনাকাণ্ডের পর সন্তানদের নিয়ে বাপের বাড়িতে চলে গেছেন স্ত্রী। সতীনের সংসার মানবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন এরশাদের প্রথম স্ত্রী। এরইমধ্যে বৃহস্পতিবার এরশাদকে তালাক দিয়ে দেনমোহর পরিশোধের জন্য নোটিশ পাঠিয়েছেন তার প্রথম স্ত্রী।
ঘটনার সূত্রপাত সম্পর্কে স্থানীয় লোকজন জানান, সোমবার রাত পৌনে বারোটার দিকে একটি মোটরসাইকেল করে এরশাদসহ তিন যুবক ওই বাড়ির দরজায় মসজিদের সামনে নামে। কয়েক মিনিট পর দু’জন মোটরসাইকেল করে ফেরত গেলও একজন থেকে যান। বাড়ির সামনে দোকানে থাকা কয়েকজন এটি আঁচ করতে পেরে আরও কয়েকজনকে খবর দেন। তখনই তাদের সন্দেহ হয় রুনার ঘরেই আছে সে। এ সময় বাড়ির বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে এরশাদের অবস্থান নিশ্চিতের চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে অন্তরঙ্গ মুহূর্তের সেলফি তোলার সময় মোবাইলের আলো দেখেই সবাই নিশ্চিত হন এরশাদ রুনার কক্ষে। তখন ঘরের চারদিক ঘিরে রেখে দরজা খুলতে বললেও দু’জন খাটের এক কোণে মশারি মুড়িয়ে ছিলেন। কয়েকজন বেড়া ভেঙে ঘরে ঢুকে দু’জনকে আটক করে বেঁধে ফেলে। কিছুক্ষণ সেখানে রাখার পর উৎসুক মানুষের চাপ বাড়তে থাকলে ঘরের সামনে এক রশিতে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয় প্রায় ১৬ ঘণ্টা। মানুষের ভিড় সামাল দিতে একপর্যায়ে একই বাড়ির সাবেক কাউন্সিলর ও সমাজ কমিটির সভাপতি নিজাম উদ্দিনের ঘরের এক কক্ষে আটক করা হয়। তখন বসানো হয় সালিশ। সোনাগাজী পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও সমাজ কমিটির সভাপতি নিজাম উদ্দিন, পৌর যুবদলের আহ্বায়ক ও ৯ নম্বর ওয়ার্ড সমাজ কমিটির সভাপতি ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে বসে সালিশ। বিচারে আলমের সমাজের এনাম, শাহিন, এমরান হোসেন ও এরশাদের পক্ষে আসেন চরচান্দিয়া গ্রামের আবুল কাশেমসহ কয়েকজন। চট্টগ্রাম থেকে আনা হয় নুর আলমকে। সিদ্ধান্ত জানানো হয় সমাজে বসবাস করতে হলে এবার আর ছাড় নয়, রুনাকে তালাক দিতেই হবে। সমাজপতিদের ফরমান অনুযায়ী কাজী ডেকে রুনাকে তালাক দেয়ার পর দু’জনকে তুলে দেয়া হয় পুলিশের হাতে। অবশ্য বিয়ের পর বিভিন্ন সময়ে রুনার দেনমোহর পরিশোধ করে দিয়েছিলেন আলম।
