কাগজে-কলমে সব হিসাব একদম নিখুঁত। নিয়মিত পাঠানো পাক্ষিক প্রতিবেদনেও ছিল না কোনো অসঙ্গতির ছাপ। কিন্তু সরজমিন গুদামে ঢুকে বস্তা গুনতেই বেরিয়ে এলো জালিয়াতির থলের বিড়াল। হদিস মিলছে না ১০০ টন চাল ও ২০ টন গমসহ মোট ১২০ টন সরকারি খাদ্যশস্যের। একইসঙ্গে গায়েব হয়ে গেছে ৬ হাজার ৫০০টি খালি বস্তা। তবে চাল-গম ও বস্তা কম পাওয়া গেলেও উল্টো হিসেববহির্ভূতভাবে ৪১ টন ধান বেশি পাওয়া গেছে। মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলা সরকারি খাদ্য গুদামে (এলএসডি) এ নজিরবিহীন অনিয়মের ঘটনা ঘটে। অনিয়ম ঢাকা দিতে কাগজে-কলমে ভুয়া হিসাব বজায় রাখার অভিযোগে ইতিমধ্যে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। সিলগালা করে দেয়া হয়েছে পুরো খাদ্য গুদাম। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঘিওর খাদ্য গুদাম থেকে চলতি মাসের ১৫ই আগস্ট যে নিয়মিত পাক্ষিক প্রতিবেদন পাঠানো হয়, তাতে মজুত পুরোপুরি ঠিকঠাক দেখানো হয়েছিল। কিন্তু মাত্র ১০ দিনের মাথায় খাদ্য অধিদপ্তরের উচ্চপর্যায়ের এক বিশেষ পরিদর্শনে সব ধামাচাপা ফাঁস হয়ে যায়। গুরুতর এই জালিয়াতির ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার রাতে খাদ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক (সংস্থাপন) অনির্বাণ ভদ্র স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ দেয়া হয়। একই দিন দিবাগত রাত ১০টার দিকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মানিকগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আইয়ুব রায়হান। বরখাস্ত হওয়া দুই কর্মকর্তা হলেন, ঘিওর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ফারহানা আক্তার এবং খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (খাদ্য পরিদর্শক) শ্রী বিপুল কুমার। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।
অডিটে যেভাবে ধরা পড়লো জালিয়াতি: প্রজ্ঞাপন সূত্রে জানা যায়, সারা দেশে খাদ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন গুদামগুলোতে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিতে মহাপরিচালকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে বিশেষ অডিট কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে গত ২৫ই আগস্ট (মঙ্গলবার) খাদ্য অধিদপ্তরের উচ্চপর্যায়ের একটি তদন্ত দল ঘিওরে সরজমিন পরিদর্শনে যায়। তারা গুদামে রক্ষিত খাতাপত্রের সঙ্গে সরজমিন থাকা খাদ্যশস্যের প্রকৃত মজুত মিলিয়ে দেখেন। তদন্তে ১০০ টন চাল, ২০ টন গম ও ৬ হাজার ৫০০টি খালি বস্তা কম পাওয়া যায় এবং সরকারি হিসাব ছাড়াই অতিরিক্ত ৪১ টন ধান মজুত দেখতে পান কর্মকর্তারা। উপস্থিত তদন্ত দল বিষয়টি তৎক্ষণাৎ হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে প্রশাসন বিভাগকে অবহিত করে। এরপরই তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর আগে গত মঙ্গলবার দুপুরের দিকে অডিট চলাকালেই তথ্যের চরম অসঙ্গতি দেখে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের উপস্থিতিতে ঘিওর এলএসডি সিলগালা করে দেয়া হয়।
১৫ই আগস্টের প্রতিবেদন ঘিরে প্রশ্ন: ঘটনার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠে এসেছে গত ১৫ই আগস্ট জমা দেয়া পাক্ষিক প্রতিবেদন নিয়ে। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় জানায়, নিয়ম অনুযায়ী উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মাসে দুইবার মজুতের পাক্ষিক প্রতিবেদন পাঠান। সর্বশেষ ১৫ই আগস্ট পাঠানো রিপোর্টেও খাদ্যশস্যের পরিমাণ সঠিক দেখানো হয়েছিল। কিন্তু মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে কীভাবে ১২০ টন চাল-গম গায়েব হলো, নাকি দীর্ঘদিন ধরেই ভুয়া রিপোর্টের মাধ্যমে এ জালিয়াতি চালিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। পাওয়া যায়নি অভিযুক্তদের বক্তব্য: বিশাল অঙ্কের খাদ্যশস্য ঘাটতির বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ফারহানা আক্তার এবং গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শ্রী বিপুল কুমারের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি। দু’জনই গা ঢাকা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। মানিকগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আইয়ুব রায়হান জানান, খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মহোদয়ের নির্দেশে বিশেষ অডিট চলাকালে ঘিওরে এই বড় ধরনের গরমিল ধরা পড়ে। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং গুদামটি আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। তদন্ত শেষে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
