রংমিস্ত্রি বাবুলের এক মুখে দুই কথা। গ্রেপ্তার হওয়ার দিন বলেছিল; কাজের মেয়ে তাহমিনার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের কারণে তিন খুন করেছে। রিমান্ডে এসে বদলে গেল ভাষ্য। বলেছে; টাকা চুরি করতে গিয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। আদালতে দেয়া স্বীকারোক্তিতে সে একই কথা বলেছে। প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে বাবুলের কোন কথাটি সত্য। নাকি বাবুল বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। ভাষ্যর মাধ্যমেই সিলেটের মিতালী আবাসিক এলাকার ট্রিপল মার্ডারের ঘটনার রহস্য নিজেই জিইয়ে রাখলো বাবুল মিয়া। তবে তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বাবুলের বক্তব্যের বাইরেও বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে তদন্ত করছেন। বাবুলের দুই বক্তব্যে তারাও রহস্যের মধ্যে পড়েছেন। বিষয়টির সুরাহা একটাই। ঘটনার দিন বাবুলের হাত কেটেছে। ঘটনাস্থলে তার রক্ত ঝরেছে। সিআইডি’র ক্রাইমসিনের কর্মকর্তারা চারজনেরই রক্তের নমুনা সংগ্রহ করেছেন। এটি আদালতের নির্দেশ পেলে পাঠানো হবে ফরেনসিক ল্যাবে। যদি রক্তের নমুনায় মিল খুঁজে পাওয়া যায়, তাহলে পুলিশ সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারবে। তবে, মামলার বাদী নিহতের মেয়ে সেলিনা সুলতানা এজাহারে যে ঘটনার আশঙ্কা করেছেন, সেটি নিয়েও তদন্ত চলছে। পুলিশ কয়েকটি বিষয়কে সামনে রেখে তদন্ত চালাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে- বাবুল যদি ঘাতক হয়, তাহলে সে একা কি তিনজনকে হত্যা করতে পারে? তার সঙ্গে কিলিং মিশনে একাধিক ব্যক্তি ছিল কিনা? ভাড়াটে হিসেবে বাবুলকে ব্যবহার করা হয়েছে কিনা? জমি সংক্রান্ত পূর্ব বিরোধের সঙ্গে ঘটনার সম্পৃক্ততা রয়েছে কিনা? আলোচিত এ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন নিয়ে পুলিশও রয়েছে চ্যালেঞ্জের মুখে।
গত ১২ই আগস্ট সকালে সিলেট নগরের মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসায় খুন হন সিলেটের পরিচিত ব্যবসায়ী আব্দুল সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনা বেগম। দিনদুপুরে বাসায় ঢুকে তাদের খুন করা হয়। পরে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে ঘটনার দিন বিকালে রংমিস্ত্রি বাবুল মিয়াকে গ্রেপ্তার করে। তার দেখানো স্থান থেকে খুনে ব্যবহৃত চাকু উদ্ধার হয়েছে। ঘটনার দিনই বাবুলের ভাষ্য থেকে জানা গেছে- কাজের মেয়ে তাহমিনার সঙ্গে প্রেমের সূত্র ধরে সে ওই খুন করেছে। পুলিশও তার বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে তদন্ত শুরু করে। ঘটনার দুইদিন পর নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় যে অভিযোগ দেয়া হয়, সেখানে তারা বাবুলকে আসামি করেননি। আসামি অজ্ঞাতই রাখেন। তবে, এজাহারে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে ঘটনা ঘটতে পারে বলে উল্লেখ করেন আব্দুস সাত্তারের মেয়ে। মামলার পর পুলিশ এরই মধ্যে চারদিনের রিমান্ডে এনে বাবুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। পরে বাবুল এ ঘটনার দায় স্বীকার করে ২০শে আগস্ট আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। সেখানে সে গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে প্রেম নয়, টাকা চুরি করতে ওই বাসায় গিয়েছিল বলে জানায়।
পুলিশের কাছে ইতিমধ্যে জবানবন্দির বিবরণ এসেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাবুল প্রথমে প্রেমের কথা বললেও পরবর্তীতে বলেছে টাকা চুরির ঘটনা। সে টাকার জন্য ওই বাসাতে গিয়েছিল। চুরির সময় ধরা পড়ে যাওয়ায় সে এক এক করে তিনজনকে খুন করেছে। এ সময় তার হাতও কেটে যায়। হাতে সে ব্যান্ডেজ করে। ওই সময় বাসার দরোজায় মানুষের চিৎকার শুনে সে পেছনের বেলকুনি দিয়ে পালিয়ে যায়। তাৎক্ষণিক খোঁজাখুঁজি করে ড্রয়ার ভাঙার সরঞ্জাম সে তখন পায়নি বলেও জানায়। তারা বলেন, বাবুল শেষে যে বক্তব্য দিয়েছে সেটির কিছু প্রমাণ পাওয়া গেছে। কারণ, বাবুল তার বাসার ভাড়া হিসেবে কিছু টাকা মালিককে দিয়েছিল। এদিকে, এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্তে সন্তুষ্ট নয় শাহী ঈদগাহবাসী। তারা জানিয়েছেন- প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় না আনলে বৃহত্তর আন্দোলনে যাবেন। গতকাল সিলেট নগরের শাহী ঈদগাহে মানববন্ধন শেষে সমাবেশে তারা এ কথা বলেন। মানববন্ধনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিহত দম্পতির কন্যারা তাদের মা-বাবার হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। যুক্তরাজ্য প্রবাসী বিশিষ্ট কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব ও সমাজসেবক হেলাল চৌধুরীর সভাপতিত্বে এবং স্থানীয় ব্যবসায়ী সোহাগ আহমদের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন- নিহত দম্পতির কন্যা তাহমিনা সাত্তার এনি ও সেলিনা সুলতানা শিখা।
মানববন্ধনে নিহত পরিবারের সদস্যরা বলেন- হত্যাকাণ্ডের পর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন কারণের কথা বলা হয়েছে। একেক সময় একেক ধরনের বক্তব্য আসায় হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নিয়ে তাদের মধ্যে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে। যুক্তরাজ্য প্রবাসী সমাজসেবক হেলাল চৌধুরী অপরাধীদের ধরতে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে প্রশাসনকে ৩ দিনের আল্টিমেটাম দেন। এই সময়ের মধ্যে রহস্য উদ্ঘাটন ও আসামিদের গ্রেপ্তার না করলে আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানান তিনি। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম মানবজমিনকে জানিয়েছেন- গ্রেপ্তার হওয়া বাবুলের বক্তব্যই শেষ নয়। পুলিশ সব বিষয়ে গভীরভাবে তদন্ত চালাচ্ছে। মামলার বাদী যে অভিযোগ করেছে, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশ তদন্ত চালাচ্ছে। পুলিশের একাধিক টিম এ নিয়ে কাজ করছে।
