সৌদি আরবের রিয়াদে সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৬ বাংলাদেশির মধ্যে পরিচয় শনাক্ত হওয়া নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ৭ প্রবাসীর জানাজা একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল সকাল ১০টায় আত্রাই উপজেলা সদরের মোল্লা আজাদ মেমোরিয়াল সরকারি কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত জানাজায় স্থানীয় সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তা, স্বজন ও সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন। জানাজায় ইমামতি করেন বগুড়ার সান্তাহার জামিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসার মুহাদ্দেস মুফতি রুহুল আমিন। উপস্থিত ছিলেন নওগাঁ-৬ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মো. রেজাউল ইসলাম, নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান প্রমুখ। জানাজায় শুরুর আগে আত্রাই উপজেলার গণ্ডগোহালী গ্রামের নিহত সহোদর মোহন ও সুমনের বাবা গুফফার প্রামাণিক বলেন, সৌদি আরবের রিয়াদে অগ্নিকাণ্ডে আমার দুই ছেলে একসঙ্গে চলে গেছে। এটাই হয়তো আল্লাহর ফয়সালা। আপনারা সবাই দোয়া করবেন, তাদের ক্ষমা করে দেবেন। এ সময় গুফফার প্রামাণিক আকুতি আর উপস্থিত মানুষের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে আকাশ-বাতাস। তিনি বলেন, ধারদেনা করে দুই সন্তানকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। এখন দেনা পরিশোধ করবো কীভাবে।
জানাজা শুরুর আগে একে একে নিহত সাতজনের খাটিয়া পাশাপাশি রাখা হয়। জানাজা শেষে মরদেহগুলো নিহতদের নিজ নিজ গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। আত্রাই উপজেলার গণ্ডগোহালী গ্রামের মরদেহগুলো পুনরায় বিকাল ৩টায় নামাজে জানাজা শেষে গ্রামের একই কবরস্থানে সারিবদ্ধভাবে খনন করা কবরে দাফন করা হয়। নিহত ১৬ বাংলাদেশির মধ্যে পরিচয় শনাক্ত হওয়া ৯ জনের মরদেহ বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৪টায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। পরিচয় শনাক্ত হওয়া নয়জনের মধ্যে আত্রাই উপজেলার সাত বাসিন্দা হলেন, উদনপৈ গ্রামের মো. ফরিদ গণ্ডগোহালী গ্রামের রুবেল প্রামাণিক, কলিমউদ্দিন ইসলাম, মোহন আলী ও তার ছোট ভাই সুমন আলী, ডুবাই গ্রামের সোহেল রানা এবং পারকাসুন্দা গ্রামের আব্দুল জলিল সরকার। এ ছাড়া নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার মহিষডাঙ্গা গ্রামের রবিউল ইসলাম এবং রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার মহিষডাঙ্গা গ্রামের শ্যামল উদ্দিনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। গত ৯ই আগস্ট রিয়াদের একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত হন।
পরে সৌদি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তাদের পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙ্গুুলের ছাপ পরীক্ষার মাধ্যমে নয়জনের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় বাকি সাতজনের মরদেহ কবে দেশে ফিরবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তাদের মরদেহ দ্রুত শনাক্ত করে দেশে ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা। আত্রাই উপজেলার মধ্যবোয়ালী গ্রামের নিহত মিনহাজের মা পারুল বিবি বলেন, হামার ছাওয়ালের লাশ নাকি শনাক্ত হয়নি। এজন্য পরে আসবে। সরকারের কাছে হামার আবদার, হামার ছেলের লাশ যেন দ্রুত নিয়ে আসে। হামার তো সব শেষ হয়ে গেছে। গণ্ডগোহালী গ্রামের নিহত রুবেল প্রামাণিকের স্ত্রী আঁখি বেগম বলেন, আমার এক মাসের বাচ্চাকে রেখে ওর বাবা চলে গেল। কেবল সুখের মুখ না দেখতেই আমার জীবনে অন্ধকার নেমে এলো।
তিনি রিয়াদের ওই সোফা কারখানার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তের দাবি করেন। একইসঙ্গে তিনি অগ্নিকাণ্ডে নিহত সকল পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার দাবি জানান। নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, অগ্নিকাণ্ডে নিহত নওগাঁর বাকি ছয় বাসিন্দার পরিচয় শনাক্ত ও তাদের মরদেহ দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়াও চলছে। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হচ্ছে। এ প্রক্রিয়া শেষ হলে মরদেহগুলো দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেয়া হবে। জেলা প্রশাসক নিহত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য শেখ রেজাউল ইসলাম নিহত পরিবারগুলোর ক্ষতিপূরণ প্রদানের ব্যবস্থাসহ সব সময় পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
