একপাশে মেঘালয়ের পাহাড়, অন্যপাশে হিজল-করচের বন। আর মাঝখানে দিগন্তজোড়া স্বচ্ছ জলরাশি। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের আধার সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর। দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট ও প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষিত এই জলাভূমি একসময় ছিল জীববৈচিত্র্যের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, নিরাপত্তাহীন হাউজবোট, বেপরোয়া নৌযান চলাচল, প্লাস্টিক ও মানববর্জ্য এবং উচ্চশব্দের কারণে সেই টাঙ্গুয়ার হাওর এখন ক্রমেই হয়ে উঠছে পর্যটনের নামে মৃত্যুফাঁদ। সামপ্রতিক সময়ে হাউজবোট থেকে পড়ে দুই পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় হাওরের পর্যটন ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এর মধ্যে গত শুক্রবার মধ্যনগর থেকে যাদুকাটার উদ্দেশ্যে যাওয়ার পথে দক্ষিণকুল বৌলাই নদীতে চলন্ত ‘সাফিনা এ লাক্সারী ওয়াটার ভিলা’- হাউজবোট থেকে পড়ে ১০ বছরের শিশু রুকাইয়া নূরের মৃত্যু হয়।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার টাঙ্গুয়ার হাওরে ঘুরতে এসে পানিতে ডুবে মারা যান রাজশাহী জেলার শাহ্মখদুম উপজেলার মধ্যনওদাপাড়া গ্রামের নূর ইসলামের ছেলে কলেজছাত্র আব্দুল মাজেদ পিকলু। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টাঙ্গুয়ার হাওর ও আশপাশের নদ-নদীতে প্রায়ই নৌকাডুবি, পানিতে পড়ে মৃত্যু, হাউজবোটের যন্ত্রে কাটাপড়া এবং নৌযানের সংঘর্ষের মতো দুর্ঘটনা ঘটছে। চলতি বছরের ৬ই ফেব্রুয়ারি তাহিরপুরে মানিক মিয়া (২১), ২৪শে এপ্রিল সুফিয়ান (১৪), ২৯শে মে ওবায়দুল (৬), ৩১শে মে তামিম ইসলাম (১৫), ৫ই জুন নিঝুম (৮), ৯ই জুন সুলতানা বেগম (২৪), ১০ই জুন আমিন মিয়া (২৩), ২২শে জুন রুবেল মিয়া (৩০), ৭ই আগস্ট আলী আকবর খান এবং ২১শে আগস্ট কাশেম মিয়ার মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া গত ২৫শে ফেব্রুয়ারি টাঙ্গুয়ার হাওরগামী পর্যটকবাহী ‘মাছরাঙা’- হাউজবোটে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই সময় হাউজবোটে কোনো পর্যটক না থাকায় বড় ধরনের প্রাণহানি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
বাড়ছে হাউজবোট, বাড়ছে ঝুঁকি: পর্যটন মৌসুমে টাঙ্গুয়ার হাওরে হাউজবোটের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। স্থানীয়দের দাবি, বর্তমানে হাওরে ২০০টির বেশি হাউজবোট চলাচল করছে। পর্যটন মৌসুমে হাওরের বিভিন্ন অংশে সারি সারি হাউজবোট অবস্থান করতে দেখা যায়। অভিযোগ রয়েছে, অনেক হাউজবোট নির্ধারিত নৌপথ অনুসরণ না করে হাওরের বুক চিরে চলাচল করছে। এতে হাওরের জলজ উদ্ভিদ, মাছ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি হাউজবোটে উচ্চশব্দে গান-বাজনা, মাইক ও জেনারেটরের ব্যবহার এবং যত্রতত্র প্লাস্টিক ও মানববর্জ্য ফেলার কারণে হাওরের স্বাভাবিক পরিবেশও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
সবচেয়ে বড় সংকট উদ্ধার ব্যবস্থায়: টাঙ্গুয়ার হাওরের পর্যটন নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা দেখা দিয়েছে জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থায়। হাওরবেষ্টিত তাহিরপুর উপজেলায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন ও জনবল থাকলেও সেখানে ডুবুরি নেই। ফলে পানিতে ডুবে যাওয়া বা নিখোঁজের ঘটনায় সুনামগঞ্জ জেলা সদর থেকে ডুবুরিদল আসার অপেক্ষায় থাকতে হয়। স্থানীয়রা জানান, জেলা সদর থেকে ঘটনাস্থলে ডুবুরিদল পৌঁছাতে তিন থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে। অথচ পানিতে ডুবে যাওয়ার পর প্রথম কয়েক মিনিটই একজন মানুষের জীবন রক্ষার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তাহিরপুরে দ্রুত ডুবুরিদল, উদ্ধারকারী নৌযান ও আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন হাওর এলাকার মানুষ।
১৩ দফা নির্দেশনা কতোটা কার্যকর: টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, প্রতিবেশগত ভারসাম্য ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গত ২রা আগস্ট জেলা প্রশাসন দ্বিতীয় দফায় ১৩টি নির্দেশনা জারি করে। একইসঙ্গে হাওরে লাল নিশানা উড়িয়ে সতর্কতা জারি করা হয়। নির্দেশনায় হাউজবোট নিবন্ধন, পর্যটকদের নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত টাঙ্গুয়ার হাওরের ইসিএ ঘোষিত সীমানায় সব ধরনের হাউজবোট ও পর্যটকবাহী নৌযানের প্রবেশ ও চলাচল বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া হাউজবোটে উচ্চস্বরে গান-বাজনা, মাইক বা পার্টি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বহনেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। প্রতিটি নৌযানে পানি বিশুদ্ধকারী ফিল্টার, সেপটিক ট্যাংক ও অন্তত দু’টি ডাস্টবিন রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
হাওর বা জলাশয়ে কোনো ধরনের বর্জ্য না ফেলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। হাউজবোটের দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ ১০০ ফুটের মধ্যে রাখা, পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট, লাইফবয় রিং, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ও নিরাপদ গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের নির্দেশনাও রয়েছে। পর্যটকদের জন্য আচরণবিধি দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন, ট্যুর শুরুর আগে তা জানানো এবং জরুরি প্রয়োজনে প্রশাসন, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও হাসপাতালের যোগাযোগ নম্বর রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পর্যটক পরিবহন নিষিদ্ধের পাশাপাশি আকস্মিক ঝড়, প্রবল বৃষ্টি ও বজ্রপাতের আশঙ্কায় পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, কাগজে-কলমে এত নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে এর অনেকটাই মানা হচ্ছে না। মাঝে-মধ্যে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের অভিযান পরিচালিত হলেও অভিযান শেষ হওয়ার পর আবারও আগের চিত্র ফিরে আসে।
