নামেই শুধু সরকারি হাসপাতাল, বাস্তবে যেন কোনো অভিভাবক নেই। অনিয়ম, চরম অবহেলা, ডাক্তারদের স্বেচ্ছাচারিতা আর যন্ত্রপাতির বিকলতায় খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা ব্যবস্থা একপ্রকার ভেঙে পড়েছে। সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। বাধ্য হয়ে তাদের ঝুঁকতে হচ্ছে ব্যয়বহুল বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দিকে।
?স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি কেবল দীঘিনালা স্থানীয়দের ভরসা নয়; পার্শ্ববর্তী রাঙ্গামাটির লংগদু, বাঘাইছড়ি এবং দেশের অন্যতম শীর্ষ পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে আগত পর্যটকসহ ৩ লক্ষাধিক পাহাড়ি-বাঙালি বাসিন্দাদের একমাত্র জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্র। বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার মূল ভিত্তি হলেও বর্তমানে হাসপাতালটির দুর্দশা দেখার যেন কেউ নেই।
রোববার সকাল ১১টায় সরজমিন হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় এক ভয়াবহ চিত্র। প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. মো. আলী মারজুই রহমান। অনুপস্থিত রয়েছেন আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. ত্রিলোক চাকমা, ডেন্টাল চিকিৎসক মাজেদুল ইসলাম আরমান ও ডেন্টাল সহকারী রয়েল ঘোষও।
?অনুসন্ধানে জানা যায়, কাগজে-কলমে হাসপাতালে ১১ জন চিকিৎসক পদায়ন থাকলেও বাস্তবে তাদের উপস্থিতি ‘ডুমুরের ফুল’। ‘রোস্টার ডিউটি’র দোহাই দিয়ে বেশির ভাগ চিকিৎসক কর্মস্থলে না এসে নিজ নিজ এলাকায় অবস্থান করেন। ডিউটি ফাঁকি দিয়ে চিকিৎসকদের একটি বড় অংশ বাইরের প্রাইভেট চেম্বারে চিকিৎসা বাণিজ্যে ব্যস্ত। বিশেষ করে আরএমও রাঙ্গামাটিতে এবং ডেন্টাল অ্যাসিস্ট্যান্ট রয়েল ঘোষ প্রায় দেড় মাস ধরে হাসপাতালে অনুপস্থিত থেকে খাগড়াছড়ি সদরে নিজস্ব প্রাইভেট চেম্বার চালাচ্ছেন। এর মধ্যে ২ জন ডাক্তারকে আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালে সংযুক্ত করা হয়েছে।
চিকিৎসা নিতে আসা কবাখালীর বাসিন্দা নজরুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পরিবারের দাঁতের সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে যাই। গিয়ে দেখি ডাক্তার নেই। ডাক্তার কোথায় কেউ কিছু বলতে পারে না। দুই ঘণ্টা বসে থেকেও বিনা চিকিৎসায় ফিরে আসতে হয়েছে।’ স্থানীয় বাসিন্দা অনিমেষ চাকমা বলেন, ‘ডিউটি চলাকালীন ডাক্তার বাইরে থাকে কীভাবে? স্টাফরা ফোন দিলে তবেই ডাক্তার আসে! এটা কেমন নিয়ম?’
হাসপাতালের চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনায় দেখা গেছে চরম দুর্নীতির চিত্র। অভিযোগ রয়েছে- হাসপাতালের নিজস্ব ইসিজি মেশিনটি স্টাফদের অবহেলায় অকেজো করে রাখা হয়েছে, যার কারণে বাধ্য হয়ে রোগীরা বাইরে থেকে ফি দিয়ে প্রাইভেট ইসিজি করাচ্ছে। প্রাথমিক চিকিৎসার অতি প্রয়োজনীয় ‘থার্মোমিটার’ পর্যন্ত নেই হাসপাতালে। অন্যদিকে, জরুরি বিদ্যুৎ (আইপিএস)’র জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে পাওয়া ১ লাখ টাকায় নিম্নমানের আইপিএস কিনে তা নষ্ট করে রাখা হয়েছে। হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়মিত কাজ না করায় পুরো হাসপাতাল ময়লা-আবর্জনায় দুর্গন্ধে ভরপুর।
হাসপাতালের এই লেজেগোবরে অবস্থার পেছনে ইউএইচএফপিও ডা. মারজুই ও আরএমও ডা. ত্রিলোক চাকমাকে সরাসরি দায়ী করছে স্টাফরা। গত ১৯শে এপ্রিল ডা. মারজুই যোগদানের পর থেকেই সেবার মান তলানিতে ঠেকেছে বলে অভিযোগ তাদের। আরএমও ডা. ত্রিলোক চাকমা কর্মস্থল ফাঁকি দিয়ে রাঙ্গামাটির একটি প্রাইভেট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়মিত রোগী দেখেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ?হাসপাতালের প্রধান সহকারী আশাপূর্ণ চাকমা বলেন, ‘বড় স্যার ও আরএমও স্যার নিজেরাই তো অফিসে আসেন না। উনারা না আসলে ছোটরা তো ফাঁকি দেবেই। বড় স্যার এখানে থাকতে চান না, তিনি নাকি ঢাকায় তদবির করছেন। আমি বেশি কিছু বলতে পারবো না, আপনি ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলেন।’ ?অনুপস্থিত ডেন্টাল চিকিৎসক ডা. মাজেদুল ইসলাম আরমান মুঠোফোনে জানান, ‘রোগী এলে অফিস থেকে জানালে আমি মোবাইলে প্রেসক্রিপশন দিয়েছি। আমি চট্টগ্রামে আছি, আগামীকাল আসবো।’ তবে অভিযুক্ত ডা. মারজুই ও আরএমও ডা. ত্রিলোক চাকমার ফোনে কল দেয়া হলেও কেউ রিসিভ করেননি। ?খাগড়াছড়ির ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. রতন খীসা বলেন, ‘ইউএইচএফপিও বা আরএমও কেউই আমার কাছ থেকে ছুটি নেননি। বিষয়টির তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
