ভারতে কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর আসন্ন স্মৃতিকথা ‘বিলংগিং: আ জার্নি অব লাভ’ নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট করেছে ভারতের অন্যতম বড় প্রকাশনা সংস্থা পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ভারতে বইটির প্রকাশক তারা নয়। তবে বইটির প্রকাশনা থেকে সরে দাঁড়ানোর কারণ হিসেবে সোনিয়া গান্ধীর সম্পাদকীয় পরিবর্তনে রাজি না হওয়ার যে খবর ছড়িয়েছে, তা সঠিক নয়। এক বিবৃতিতে পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া বলেছে, ভারতে ‘বিলংগিং’-এর প্রকাশক পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া নয়। লেখক সম্পাদকীয় পরিবর্তনে রাজি না হওয়ায় পেঙ্গুইন বইটি প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এমন ধারণা পরিস্থিতির সঠিক প্রতিফলন নয়। তবে প্রতিষ্ঠানটি স্বীকার করেছে, তারা বইটি প্রকাশ করতে আগ্রহী ছিল। প্রকাশনা সংস্থাটি বলেছে, একজন প্রকাশক হিসেবে লেখকের লেখা তথ্য যাচাই করা এবং বইয়ের স্বার্থে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া তাদের অধিকার ও দায়িত্ব। এটি প্রকাশনা প্রক্রিয়ারই স্বাভাবিক অংশ। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি।
বিবৃতিতে বলা হয়, একজন প্রকাশক হিসেবে তথ্য যাচাই করা এবং বইটির সর্বোত্তম স্বার্থে লেখককে পরামর্শ দেয়া আমাদের অধিকার ও দায়িত্ব। এটি প্রকাশনা প্রক্রিয়ার একটি স্বাভাবিক অংশ। তবে সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে আলোচনায় ঠিক কী হয়েছিল, সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে পেঙ্গুইন। তারা বলেছে, সংশ্লিষ্ট আলোচনার পুরো সময়জুড়েই বইটি প্রকাশের ব্যাপারে তাদের আগ্রহ ও প্রস্তুতি ছিল। তবে লেখকের সঙ্গে হওয়া গোপনীয় আলোচনার বিষয়ে তারা আর কোনো মন্তব্য করবে না। পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া বইটির প্রকাশক না হওয়ায় এখন কয়েকটি ভারতীয় প্রকাশনা সংস্থা এর প্রকাশনা স্বত্ব পাওয়ার দৌড়ে রয়েছে। এর মধ্যে হার্পারকলিন্স চুক্তি চূড়ান্ত করার কাছাকাছি রয়েছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান আলফ্রেড এ. নফ- যা পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউসেরই একটি ইমপ্রিন্ট, তারা ঘোষণা করেছে, সোনিয়া গান্ধীর স্মৃতিকথা আগামী ১০ই নভেম্বর প্রকাশ হবে। নফের মাধ্যমে দেয়া এক বিবৃতিতে সোনিয়া গান্ধী বলেন, তার পরিবারকে নিয়ে অনেক কিছু লেখা হলেও পরিবারের সদস্যদের কর্মকাণ্ড, তাদের উদ্দেশ্য এবং মানুষের স্বাভাবিক দুর্বলতার সত্যিকারের চিত্র খুব কম বর্ণনাতেই উঠে এসেছে। তার ভাষায়, বিভিন্নভাবে এই বইটি তাদের মানবিকতার প্রতি আমার শ্রদ্ধাঞ্জলি। তিনি আরও বলেন, বইটিতে গত ছয় দশকে ভারতে প্রত্যক্ষ করা সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি অনন্য দৃষ্টিভঙ্গিও পাঠকরা পাবেন।
‘বিলংগিং’ বইয়ে নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ নানা অধ্যায় তুলে ধরেছেন সোনিয়া গান্ধী। ১৯৮৪ সালে তার শাশুড়ি ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর তার ব্যক্তিগত জীবন সম্পূর্ণ বদলে যায়। ইন্দিরার পর তার ছেলে রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হন। সাত বছর পর, ১৯৯১ সালে রাজীব গান্ধীও হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। পরবর্তীতে সোনিয়া গান্ধী সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তিনি দীর্ঘ সময় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন। দল তাকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দিলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস ক্ষমতা হারায় এবং নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার গঠন করে। সোনিয়া গান্ধী বলেন, হৃদয়ভাঙা ও প্রিয়জনকে হারানোর অভিজ্ঞতাই আমাকে রাজনীতির প্রকাশ্য জগতে ঠেলে দিয়েছিল। তার আগে আমি আমার ব্যক্তিগত জীবনকে কঠোরভাবে আড়াল করে রেখেছিলাম।
নিজের স্মৃতিকথা লেখা তার জন্য সহজ ছিল না বলেও জানিয়েছেন সোনিয়া গান্ধী। তিনি বলেন, নিজের জীবন নিয়ে লেখা আমার জন্য সহজ ছিল না। এর অর্থ ছিল নিজেকে উন্মুক্ত করা, এমন কিছু মুহূর্ত ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেয়া, যেগুলো আমি সবসময় গভীরে লুকিয়ে রেখেছিলাম। তবে ধীরে ধীরে রাজনীতির সক্রিয় পরিসর থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে অতীতের দিকে ফিরে তাকানোর সময় তার জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়ের মধ্যে ভালোবাসা ও আনুগত্যের একটি ধারাবাহিক যোগসূত্র তিনি দেখতে পান। সেই গল্প শুরু হয়েছে ইতালির একটি ছোট শহরে কাটানো সরল শৈশব থেকে। এরপর তা বিস্তৃত হয়েছে ভারতে রাজীব গান্ধীর স্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পুত্রবধূ হিসেবে কাটানো জটিল ও ঘটনাবহুল জীবনে। সোনিয়া গান্ধীর ভাষায়, এভাবেই তার জীবনের গল্প হয়ে উঠেছে ভালোবাসা, পরিবার, ব্যক্তিগত ক্ষতি এবং ছয় দশকের ভারতীয় সমাজ-রাজনীতির পরিবর্তনের এক দীর্ঘ যাত্রা।
