দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতিতে মিয়ানমার দীর্ঘদিন ধরেই সংঘাতপীড়িত একটি রাষ্ট্র এবং একই সঙ্গে চীন ও ভারতের প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে মিয়ানমারের গুরুত্বের আরেকটি স্তর দ্রুত সামনে আসছে। তা হলো ‘বিরল মৃত্তিকা' উপাদান। বৈদ্যুতিক গাড়ি, বায়ুবিদ্যুৎ, উন্নত ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম, অর্ধপরিবাহী, মহাকাশ প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে ব্যবহৃত এসব খনিজ এখন আর শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়। এগুলো হয়ে উঠছে ভবিষ্যৎ ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা মিয়ানমারের নিরাপত্তা সীমান্ত, সম্পদ সীমান্ত ও ভূরাজনৈতিক সীমান্ত—এই তিনটি আন্তঃসম্পর্কিত বাস্তবতাকে প্রতিবেশী চীন ও ভারতের প্রভাবের মাধ্যমে স্পর্শ করছে।
মিয়ানমারের বিরল মৃত্তিকার গুরুত্ব বোঝার আগে বুঝতে হবে, আধুনিক বিশ্বে খনিজ সম্পদের অর্থ কীভাবে বদলে গেছে। একসময় তেল, গ্যাস, কয়লা ও লৌহ আকরিককে রাষ্ট্রীয় শক্তির প্রধান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে লিথিয়াম, কোবাল্ট, নিকেল, গ্রাফাইট এবং বিরল মৃত্তিকা উপাদান। কারণ আধুনিক প্রযুক্তির একটি বড় অংশ নির্ভর করছে এমন কিছু খনিজের ওপর, যেগুলোর উৎপাদন, পরিশোধন ও সরবরাহ সীমিত কয়েকটি দেশের হাতে কেন্দ্রীভূত। ফলে কোনো দেশের মাটির নিচে থাকা খনিজ সম্পদ তার অর্থনৈতিক সম্পদের পাশাপাশি কৌশলগত সম্পদেও পরিণত হচ্ছে।
এখানেই মিয়ানমারের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব নতুন মাত্রা পাচ্ছে। দেশটির উত্তরাঞ্চল, বিশেষ করে কাচিন ও উত্তর শান অঞ্চল, প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এবং দীর্ঘদিন ধরে জাতিগত সশস্ত্র সংঘাতের ক্ষেত্র। এসব অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ার ফলে খনিজ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণও একটি রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতার উৎস হয়ে উঠেছে। ফলে বিরল মৃত্তিকার বাণিজ্যকে শুধু খনিশিল্পের বিষয় হিসেবে দেখলে মিয়ানমারের বাস্তবতা বোঝা যাবে না। এটি একই সঙ্গে রাষ্ট্রক্ষমতা, বিদ্রোহী সংগঠন, সীমান্ত বাণিজ্য এবং বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতার প্রশ্ন।
এই বাস্তবতায় চীন ও ভারতের স্বার্থ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এটি মিয়ানমারের খনিজ সম্পদ নিয়ে দুই প্রতিবেশী শক্তির সাধারণ প্রতিযোগিতা। কিন্তু বিষয়টি আরও গভীর। এখানে প্রতিযোগিতাটি মূলত সরবরাহ-শৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতা, যা পুরোনো ধরনের ভূখণ্ড দখলের প্রতিযোগিতা নয়। বরং খনি থেকে শুরু করে পরিশোধন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্রযুক্তি এবং চূড়ান্ত পণ্যে রূপান্তরের পুরো শৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতা।
চীন এই ক্ষেত্রে ভারতের তুলনায় অনেক এগিয়ে। এর একটি প্রধান কারণ ভূগোল। কাচিন ও উত্তর শান চীনের সীমান্তবর্তী হওয়ায় চীনের জন্য এসব অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ, সীমান্ত বাণিজ্য এবং অবকাঠামোগত সংযোগ তুলনামূলক সহজ। বহু বছর ধরে চীন মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও অবকাঠামোগত সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। বিপরীতে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল তুলনামূলকভাবে কাছাকাছি হলেও দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড, দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা এবং সংঘাত ভারতের প্রত্যক্ষ প্রবেশকে কঠিন করে তুলেছে। ফলে ভারত বিরল মৃত্তিকা সংগ্রহে আগ্রহী হলেও চীন ইতোমধ্যেই সংশ্লিষ্ট সরবরাহ-শৃঙ্খলের ভেতরে অবস্থান করছে।
তবে ভারতের উদ্বেগকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। ভারতের জন্য মিয়ানমার কেবল একটি প্রতিবেশী দেশ নয়। এটি তার উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বঙ্গোপসাগর এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু। মিয়ানমারের মাধ্যমে ভারত পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে প্রবেশের সুযোগ পায়। ফলে চীন যদি মিয়ানমারের খনিজ সম্পদ, অবকাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর আরও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, তাহলে ভারতীয় কৌশলগত পরিসর সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন আসে—ভারত কি শুধু মিয়ানমার থেকে বিরল মৃত্তিকা সংগ্রহ করলেই চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে পারবে? উত্তর হলো, সম্ভবত না।
কারণ খনিজ উত্তোলন সরবরাহ-শৃঙ্খলের মাত্র একটি ধাপ। এর পর রয়েছে খনিজ পৃথকীকরণ, পরিশোধন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, চুম্বক তৈরি, শিল্পে ব্যবহার, পুনর্ব্যবহার এবং বিকল্প উপাদান উদ্ভাবন। বিশেষ করে শক্তিশালী স্থায়ী চুম্বক আধুনিক বৈদ্যুতিক গাড়ি, বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বিভিন্ন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা প্রতিযোগিতার তৃতীয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর হিসেবে চিহ্নিত করা যায় এবং প্রযুক্তি ও মূল্যসংযোজনের ওপর নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্র হিসেবে গুরুত্বের দাবি রাখে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা শুধু এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকবে না যে, কার কাছে মিয়ানমারের খনিজ যাবে। বরং প্রশ্ন হবে, কে সেই খনিজকে উচ্চমূল্যের প্রযুক্তিপণ্যে রূপান্তর করতে পারবে। খনি যদি মিয়ানমারে থাকে, কিন্তু পরিশোধন ও উচ্চপ্রযুক্তির শিল্প অন্য দেশে থাকে, তাহলে প্রকৃত অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ক্ষমতা খনিজ উত্তোলনকারী দেশের হাতে নাও থাকতে পারে।
এখানেই মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত বিষয়টিকে আরও জটিল করেছে। রাখাইন, কাচিন, শানসহ বিভিন্ন অঞ্চলে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তন এবং জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলোর উত্থান দেশটির সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে অনিশ্চিত করেছে। কোনো অঞ্চলের সামরিক নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তিত হলে সেখানকার খনিজ সম্পদ, পরিবহনপথ এবং বাণিজ্যিক প্রবাহের ওপরও নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তিত হতে পারে। ফলে বিরল মৃত্তিকা মিয়ানমারের শান্তি প্রতিষ্ঠার সহায়ক হওয়ার পরিবর্তে উল্টো সংঘাতকে অর্থায়নের নতুন উৎসে পরিণত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অর্থনীতির সূত্র কাজ করছে: যে সম্পদ অর্থনৈতিকভাবে মূল্যবান, সংঘাতপূর্ণ রাষ্ট্রে সেটিই অনেক সময় সংঘাতের প্রণোদনায় পরিণত হয়। সম্পদ যদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং বৈধ বাণিজ্যব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যবহৃত না হয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠী, সীমান্ত বাণিজ্য ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তাহলে সম্পদ শান্তির বদলে সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করতে পারে।
এই পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব প্রতিবেশী বাংলাদেশের ওপরও পড়তে পারে। বাংলাদেশের জন্য মিয়ানমারকে আর কেবল রোহিঙ্গা সমস্যার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যথেষ্ট নয়। রাখাইন ও চট্টগ্রামের মধ্যকার ভৌগোলিক নৈকট্য বাংলাদেশের জন্য একটি বিশেষ কৌশলগত বাস্তবতা তৈরি করেছে। মিয়ানমারের সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হবে, সীমান্ত নিরাপত্তা, মাদক ও অস্ত্রের প্রবাহ, মানবপাচার, সীমান্তবর্তী অর্থনীতি এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ওপর তার প্রভাব তত বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, মিয়ানমারের ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন বঙ্গোপসাগরের সামগ্রিক শক্তির ভারসাম্যকেও প্রভাবিত করতে পারে। চীন যদি মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের সম্পদ ও দক্ষিণমুখী যোগাযোগব্যবস্থাকে বৃহত্তর আঞ্চলিক বাণিজ্য কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করে, তাহলে বঙ্গোপসাগর–মিয়ানমার–চীন সংযোগ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বঙ্গোপসাগর এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগ রক্ষায় নতুন কৌশল গ্রহণ করতে পারে।
ফলে বাংলাদেশের সামনে একটি নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। মিয়ানমারকে শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। তাকে দেখতে হবে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সম্পদ অর্থনীতি এবং বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতার সম্মিলিত ক্ষেত্র হিসেবে।
এখানে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমুখী কূটনীতি। চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ এবং ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ককে এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে, যাতে বাংলাদেশ কোনো একক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র না হয়ে নিজস্ব অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত স্বার্থের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। বিশেষত চট্টগ্রাম বন্দর, বঙ্গোপসাগর এবং বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সম্পদ যদি আঞ্চলিক সরবরাহ-শৃঙ্খলের অংশ হয়, তাহলে বাংলাদেশ তার ভৌগোলিক অবস্থানকে শুধু নিরাপত্তা-ঝুঁকি হিসেবে না দেখে অর্থনৈতিক সুযোগ হিসেবেও বিবেচনা করতে পারে। তবে এই সুযোগ গ্রহণের পূর্বশর্ত হলো সীমান্ত নিরাপত্তা, অবকাঠামোগত সক্ষমতা এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন।
সবশেষে বলা যায়, মিয়ানমারের বিরল মৃত্তিকার কাহিনি আসলে মাটির নিচের খনিজের কাহিনি নয়; এটি একবিংশ শতাব্দীর ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের কাহিনি। শিল্পবিপ্লবের যুগে কয়লা ও ইস্পাত যেমন রাষ্ট্রের শক্তির ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল, তেমনি প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির যুগে বিরল মৃত্তিকা ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ভবিষ্যতের ক্ষমতার কাঠামো নির্ধারণ করতে পারে।
চীন ইতোমধ্যে খনিজ উত্তোলন থেকে পরিশোধন ও প্রযুক্তিপণ্য পর্যন্ত বিস্তৃত সরবরাহ-শৃঙ্খলে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। ভারত সেই ব্যবধান কমাতে চাইছে। কিন্তু প্রতিযোগিতার প্রকৃতি কেবল খনিজের মালিকানা নয়; বরং খনিজ থেকে প্রযুক্তি পর্যন্ত পুরো মূল্যশৃঙ্খলের নিয়ন্ত্রণ।
তাই মিয়ানমারের মাটির নিচের সম্পদকে কেন্দ্র করে যে নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে, সেটিকে বিচ্ছিন্ন কোনো খনিজ-বাণিজ্যিক ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি চীন–ভারত শক্তির প্রতিযোগিতা, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব এবং বাংলাদেশের নিরাপত্তা—সবকিছুকে একই সূত্রে যুক্ত করছে।
মিয়ানমারের মাটি সম্পদের আধার। কিন্তু সেই সম্পদের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হবে কে তাকে নিয়ন্ত্রণ করে, কে তাকে পরিশোধন করে, কে প্রযুক্তিতে রূপান্তর করে। এসব কারণেই মিয়ানমারের বিরল মৃত্তিকা আগামী দিনের চীন–ভারত প্রতিযোগিতার একটি নতুন ভূরাজনৈতিক সীমান্ত হয়ে উঠতে পারে। তাই ‘রোহিঙ্গা সমস্যা' সমাধান-প্রচেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশকে সতর্ক, সচেতন ও ওয়াকেবহাল থাকা জরুরি।
লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।
কেন চীন–ভারত প্রতিযোগিতার নতুন ভূরাজনৈতিক সীমান্ত মিয়ানমার
ড. মাহফুজ পারভেজ
মত-মতান্তর
১ ঘন্টা আগে
২৮ আগস্ট (শুক্রবার), ২০২৬, ১১ঃ০১ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
