ছাত্র-জনতার বিজয়ের স্মৃতিবাহী আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের চেতনা এবং নতুন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণকে স্মরণ করে শুরু হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন। অধিবেশনে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মউৎসর্গকারী সকল শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। একই সঙ্গে ১৯৯১ সালের পর দীর্ঘ ৩৫ বছর বিরতিতে ২০২৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়াকে দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এক অনন্য ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে আখ্যায়িত করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বিকেল ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এর সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হয়।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটেছে। শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে একটি গণতান্ত্রিক, শক্তিশালী ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনে সংসদ সদস্যদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মহান জাতীয় সংসদ ও ব্যক্তিগত পক্ষ থেকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান। স্পিকার আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, নতুন রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদা ও পারস্পরিক সহযোগিতা সুদৃঢ় হবে এবং গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা আরও বেগবান হবে। সংসদকে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার সর্বোচ্চ উল্লেখ করে তিনি দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান।
অধিবেশনের কার্যপ্রণালী বিধির ১২(১) বিধি অনুযায়ী স্পিকার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের জন্য ৫ সদস্যের সভাপতিমণ্ডলীর নাম ক্রমানুসারে ঘোষণা করেন। মনোনীত সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যরা হলেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায় (ঢাকা-৩), জামাল নিজাম (চট্টগ্রাম-১৩), মুহাম্মদ নওশাদ জমির (পঞ্চগড়-১), নিলুফার চৌধুরী মনি (মহিলা আসন-১০) এবং মো. মুজিবুর রহমান (রাজশাহী-১)। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে তালিকায় থাকা নামের ক্রমানুসারে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যরা অধিবেশন পরিচালনা করবেন।
এরপর স্পিকার অধিবেশনে শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সংসদ গত ১২ জুলাই প্রয়াত সাবেক ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, স্পিকার ও মন্ত্রী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে। এ ছাড়া সাবেক মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা সতীশ চন্দ্র রায়, মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ জাহান চৌধুরী, সাবেক চিফ হুইপ ও প্রতিমন্ত্রী মোশাররফ হোসেন মিয়াসহ মোট ১২ জন সাবেক সংসদ সদস্যের মৃত্যুতে শোক জানানো হয়। পাশাপাশি একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি আল মুজাহিদী, চিত্রশিল্পী মোস্তফা মনোয়ার, রাজনৈতিক চিন্তাবিদ ও গবেষক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক এবং শিক্ষাবিদ ড. মকবুল হোসেনের প্রয়াণে শোক প্রকাশ করা হয়।
শোক প্রস্তাবে বাদ পড়া সাবেক সংসদ সদস্যদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান। তিনি যশোরের ঝিকরগাছা থেকে নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য আবু সাদেক মোহাম্মদ আবু সাঈদ এবং গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ থেকে নির্বাচিত মাওলানা আব্দুল আজিজের নাম শোক প্রস্তাবে যুক্ত করার অনুরোধ জানান।
পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য রেখে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মণি নাটোরের সাবেক প্রতিমন্ত্রী ফজলুর রহমানের নাম শোক প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্তির অনুরোধ জানান। একইসঙ্গে তিনি নেপালের সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় মহান সংসদের পক্ষ থেকে শোক ও সমবেদনা প্রস্তাবের আহ্বান জানান।
চিফ হুইপ জানান, বন্ধুপ্রতিম দেশ নেপালের এই দুর্যোগে সহায়তার জন্য প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় উদ্ধার কাজ ও মেডিকেল টিম প্রেরণের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশনা দিয়েছেন।
সংসদে উত্থাপিত শোক প্রস্তাবসমূহ সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। নেপালের দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশসহ সকল প্রয়াত ব্যক্তিবর্গের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। নীরবতা পালন শেষে প্রয়াতদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করে মোনাজাত পরিচালনা করেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ।
