ফেনীতে কথিত পরকীয়ার ঘটনায় তোলপাড় চলছে। যে ঘটনার কাছে হার মেনেছে সিনেমাও। কল্পনাকেও হার মানানো ঘটনা এখন টক অব দ্যা টাউন। চারদিকে হইচই পড়া ঘটনা নিয়ে পরিবার থেকে সমাজপতি, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনেও তোলপাড় চলছে। একটি ঘটনা নিয়ে কথিত সমাজপতিদের বিচার, চার সন্তানের জননী ও দুই সন্তানের এক জনককে একই রশিতে এক খুঁটিতে ১৬ ঘটনা বেঁধে চালানো হয় শারীরিক নির্যাতন। কয়েক ঘা জুতাপেটার পর দুইজনের গলায় জুতার মালা পরিয়ে ঘুরানো হয়। এ সময় গানের তালে নিত্যও করেছে উপস্থিত কয়েজন। ওই গৃহবধূ ও যুবদল নেতার ওপর নির্যাতন আর অপমানের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভ করা হয়। যার ভিডিও ফুটেজ ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়।
আলোচিত ঘটনাটি জেলার সোনাগাজী পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের হালিম ডাক্তার পুলের গোড়া এলাকার। সূত্র জানায়, সোমবার রাত সাড়ে ১২টা থেকে মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় ১৬ ঘণ্টা চলে এ ঘটনা। তবে এখানেই শেষ নয়, ঘটনার রেশ এখনো চলছে, সবশেষ এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আটক তিনজনকে কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত। তার আগে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটেছে দুই পরিবারে। আর নতুন করে বিয়ের মাধ্যমে সংসার বেঁধেছেন দুইজন।
পুলিশ, স্থানীয় বাসিন্দা ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সোমবার রাত সাড়ে ১১টার পর পূর্ব চরগণেশ এলাকার মাওলানা নুর আলমের স্ত্রী কামরুন নাহার রুমার বাড়িতে যান যুবদল নেতা চরচান্দিয়া ইউনিয়নের ভূঁইয়া বাজারসংলগ্ন অলি মাঝি বাড়ির মো. আবু সুফিয়ানের ছেলে জয়নাল আবেদিন প্রকাশ এরশাদ উল্লাহ।
রাত সাড়ে ১২টার দিকে আশপাশের লোকজন তাদের দেখতে পেয়ে আটক করেন। পরে দু’জনকে মারধর করে এক রশিতে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয় প্রায় ১৬ ঘণ্টা। অভিযোগ রয়েছে, মঙ্গলবার দুপুরের দিকে স্থানীয় মাতুব্বর জযনাল আবদিন ও এরশাদ মিয়াজির নেতৃত্বে সালিশ বসিয়ে ওই নারীর সঙ্গে তার স্বামীর বৈবাহিক সম্পর্ক ভেঙে দেয়ার ‘ফরমান’ও জারি করে কথিত সমাজপতিরা। নির্যাতন আর কথিত সালিশে অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষ উপস্থিত ছিলেন। সালিশে উপস্থিত থাকা একজন জানান, এরশাদ ও রুনা যে ঘটনা ঘটিয়েছে তা কোনো সভ্য সমাজ মেনে নিতে পারে না। নৈতিক অবক্ষয়রোধে দু’জনকে জনতা আটক করে প্রাথমিক শাস্তি দিয়েছে।
এ ঘটনার পর থেকে রুমার স্বামী মাওলানা নুর আলম চার সন্তানকে বাড়িতে রেখে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। বুধবার সকালে তিনি বিভিন্ন লোকের মাধ্যমে জানার পর তার স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন। কোনোভাবেই আর সংসার করার কারণ নেই। এ ঘটনায় তিনি কোনো বিচারও চাইবেন না বলেও জানান। অন্যদিকে এরশাদ উল্যাহর স্ত্রী এ নিয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে এরশাদের দাবি যুবদলের নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধের জেরে তার বিরুদ্ধে কথিত ঘটনা তৈরি করা হয়েছে। দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের সুবাধে বিয়ের আগ থেকেই এরশাদ ও রুনার মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল বলে দাবি করেন কয়েকজন। রুনার সংসারে চার সন্তান আর এরশাদের দুই সন্তান থাকলেও দুইজনের যোগাযোগ কোনোদিন বন্ধ ছিল না। প্রায়শই দু’জন একান্ত সময় কাটাতেন বলেও জানান স্থানীয়রা। এ নিয়ে দুই পরিবারে মধ্যে বেশ কয়েকবার বৈঠক হলেও প্রেমের সম্পর্ক ফাটল ধরাতে পারেনি কেউ। বুধবার রাতে এরশাদ উল্যাহ ও কামরুন নাহার রুমার মধ্যে বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে। এরশাদের পিতা আবু সুফিয়ানের প্রচেষ্টায় রুমার পিতার এলাকায় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে বিবাহ সম্পন্ন হয়। বিয়ে নিয়ে এরশাদের পিতা বলেন, যে ঘটনায় দুইজনকে অপমান ও নির্যাতন করা হয়েছে তা সত্যি কি না আইনের মাধ্যমে তদন্ত করে বের করতে হবে। তবে রুমার ইজ্জত রক্ষায় তাকে এরশাদের দ্বিতীয় স্ত্রী করা হয়েছে।
এতে সামাজিকভাবে হেয় থেকে রক্ষার পাশাপাশি নিরাপদ আশ্রয় হলো রুমার। তবে দুইজন বিয়ের পর কোথায় আছে তা প্রকাশ করা হচ্ছে না। একটি সূত্র জানায়, দুইজনকে আটক করে আদালতে নিলে বিয়ের শর্তে মুচলেকা দিয়ে জামিন পান তারা। সে মোতাবেক বিয়ের পিঁড়িতেই বসতে হলো এরশাদ ও রুনাকে। অন্যদিকে এরশাদের প্রথম স্ত্রী অভিমান করে দুই সন্তান নিয়ে পিতার বাড়িতে চলে গেছেন। এসব ঘটনা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ। এরা হলো বাবর, হাসান ও ফাতেমা আক্তার। তাদের বিরুদ্ধে কামরুন নাহার রুমা ও এরশাদ উল্লাহর ওপর নির্যাতনের নেতৃত্ব দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ভুক্তভোগী এরশাদ উল্যাহর পিতা বাদী হয়ে বৃহস্পতিবার সকালে সোনাগাজী থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় ৯ জনের নাম উল্লেখসহ আরও ৫/৬ জনকে আসামি করা হয়েছে।
এদিকে, সোনাগাজী মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ আবুল হাসিম জানান, ভুক্তভোগী এরশাদের পক্ষে একটি লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। আটক তিনজনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ দেখে ঘটনায় জড়িত অন্যদেরও পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
জেলা পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার জানান, ঘটনায় জড়িতদের আটকে সোনাগাজী থানা পুলিশকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ফেনী জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট ফরিদুল হক খান নয়ন বলেন, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই নিজেরাই বিচারক ও শাস্তিদাতা হয়ে যাওয়ার প্রবণতা সমাজের জন্য ভয়ংকর। কাউকে ধরে মারধর করা, খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা কিংবা তার সংসার ভেঙে দেয়ার ‘ফরমান’ জারি করার অধিকার কারও নেই।
