টাপুর টুপুর বৃষ্টি পড়ে

টাপুর টুপুর বৃষ্টি পড়ে

ফন্ট সাইজ:

টা পুর টুপুর বৃষ্টি পড়ে-কথাটি শুনলেই মনের ভেতর বৃষ্টির রিমঝিম শব্দে মন উচাটন হয়ে যায়। এখন যদিও বর্ষাকাল শেষ হয়ে শরৎকাল চলছে। মনে আছে বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘ঋতুর রংয়ে আঁকা’ নামের একটি বিশেষ অনুষ্ঠান তৈরি করেছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। তার পরিচালনায় এই অনুষ্ঠানে নৃত্যশিল্পীদের দিয়ে ছয় ঋতুর নাচ তিনি পরিবেশন করিয়েছিলেন। ছয় ঋতুর রং মানে একেক ঋতুর একেক রং। অথচ তিনি সেই সময়ের সাদা কালো টেলিভিশনে এই ঋতু বৈচিত্র্যকে এমনভাবে তুলে ধরেছিলেন যে, বিদেশিরা পর্যন্ত গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত এই ছয় ঋতু পালাক্রমে উপলব্ধি করেছিলেন। বলা বাহুল্য- ঋতুর রংয়ে আঁকা এই অনুষ্ঠানটি জাপান থেকে পুরস্কার বয়ে এনেছিল। সেটাই ছিল বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক পুরস্কার।

নদী, মাঠ, ফসল, ফুল, পাখি ও সবুজে ঘেরা এই সৌন্দর্য আমাদের মনে গভীর দেশপ্রেম সৃষ্টি করে। তাই বাংলাদেশের ছয় ঋতু ও দেশপ্রেম একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত।
ছয় ঋতু দেশের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের পরিচয় বহন করে। প্রকৃতির এই বৈচিত্র্য আমাদের মনে ও মননে দেশ এবং দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা জাগায়। গ্রীষ্মের তাবদাহে প্রাণ ওষ্ঠাগত। মাটি ফেটে হয় চৌচির। হঠাৎ করেই কালবৈশাখী আঘাত হানে। ভেঙে যায় ঘরবাড়ি। মাঝেমধ্যে ধূলিঝড়ও হয় তারপরও পাড়া-মহল্লায় বৈশাখী মেলা বসে। বাঙালির ঐতিহ্যবাহী সব পসরার মেলা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা। বাঁশের বাঁশি থেকে শুরু করে ছাই ফেলা কুলা পর্যন্ত পাওয়া যায় এসব মেলায়। আমরা দলবেঁধে এসব মেলায় যাই। নাগরদোলায় চড়ি। বায়স্কোপ দেখি।

বর্ষায় নদ-নদী, খাল-বিল থই থই করে পানিতে। চারদিকে পানি আর পানি। বর্ষার পানিতে নৌকা বাইচ হয়। গ্রামে গ্রামে উৎসবের আমেজ। অনেক সময় অতি পানি প্রবাহের ফলে বন্যার সৃষ্টি হয়। অতিবন্যায় ভেসে যায় বসতবাড়ি, ক্ষেতের ফসল, গবাদিপশু সহ কৃষকের শেষ সম্বল। তবুও আমরা বর্ষা উদ্‌যাপন করি। বর্ষা নিয়ে কালীদাসের সেই বিখ্যাত মেঘদূত-এর কথা তো আমরা সকলেই জানি। রবি গুরুর প্রিয় ঋতু বর্ষা, তাই তো তিনি বলেছেন-
ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই, ছোট সে তরী।
আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও ঋতু বৈচিত্র্য লিখেছেন-‘শাওনও রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে...’

এসব গানের কথা আমাদের বাংলাদেশের ঋতু বৈচিত্র্যের কথা মনে করিয়ে দেয়।
শরতের কাশবন সাদা ফুলে ফুলে ছেয়ে যায়। নীল আকাশে শুভ্র মেঘ খেলা করে। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সনাতন বাঙালিরা এই শারদীয় উৎসবে মেতে ওঠে এই শরতে। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে এই উৎসবে অংশগ্রহণ করে। শিউলি ফুলের মালা পরে শরৎ আসে আমাদের এই বাংলায়। ঋতুর রানী বলা হয় শরৎকে।

হেমন্তে সোনালি ধানে ক্ষেত ভরে ওঠে, কৃষক ঘরে তোলে তার সোনালি ফসল। ঘরে ঘরে পিঠেপুলির আয়োজন হয়। কৃষকের ঘরে নবান্ন উৎসব। আমরা যে পরিশ্রমী জাতি সেটাই পরিলক্ষিত হয় এই হেমন্তে। মৌ মৌ গন্ধে আমোদিত হয় চারদিক। বাতাসে তখন হালকা শীতের আমেজ। মাঠে মাঠে ছেলেপেলেরা নাড়া দিয়ে খেলা করে। ছোলা পুড়িয়ে খায় ক্ষেতের আলে বসে। খোলা মাঠে ঘুড়ি ওড়ায়। চিবুড়ি, দাঁড়িয়াবান্ধা, কিংবা গোল্লাছুট খেলায় মেতে ওঠে।

হেমন্তের পরই শীতের আগমন। শীত মানেই পিঠেপুলি। বিশেষ করে খেজুরের রস, ভাপা পিঠা, চিতই আর পাকন পিঠার কথা বলতেই জিভে জল চলে আসে। আমাদের ছেলেবেলায় দেখেছি শীতের সময় যাত্রা উৎসব হতো। এখন এটা শহরকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমিতে পিঠেমেলা বসে। কতো রকম পিঠার ডালি যে সাজিয়ে বসে দোকানিরা সেটা চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করা যায় না। নাট্যমঞ্চে নাট্য উৎসব হয়। মেলার পাশাপাশি লোকজ উৎসবের আয়োজন করা হয়। মাঝে মাঝে শৈত্যপ্রবাহে সাধারণ মানুষের নাকাল অবস্থা হয়। ছিন্নমূল মানুষের কষ্টের সীমা থাকে না। অনেক সময় বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন শীতবস্ত্র বিতরণ সহ নানা ধরনের উদ্যোগ নেয়। আমরা রাবেয়া খাতুন ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে প্রতি বছর অসহায় মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করে আসছি। ঋতুরাজ বসন্ত। ফাল্গুন এবং চৈত্র মিলে এই ঋতু। কোকিলের ডাক শুনেই আমরা বুঝতে পারি বসন্ত এসে গেছে। ফল ফুল, রূপ রস গন্ধ সবকিছু মিলিয়ে আমাদের দেশ অনন্য।
দেশপ্রেম শুধু দেশের মাটি ও প্রকৃতিকে ভালোবাসার নাম নয়; দেশের মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালন করাও দেশপ্রেমের অংশ। দেশের প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষা করা, নদী-খাল পরিষ্কার রাখা, বৃক্ষরোপণ করা, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের প্রতি সম্মান দেখানো এবং দেশের আইন মেনে চলা প্রকৃত দেশপ্রেমের পরিচয়।

যেকোনো স্বাধীনতা অর্জনের পেছনেও রয়েছে গভীর দেশপ্রেমের ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের সময় এ দেশের মানুষ মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছে। তেমনিভাবে ১৯৯০ এবং ২০২৪-এ দেশকে ভালো রাখার জন্য মানুষ জীবন দিয়েছে। তাদের আত্মত্যাগ আমাদের শেখায় যে, দেশকে ভালোবাসা শুধু আবেগের বিষয় নয়, প্রয়োজনে দেশের কল্যাণে ত্যাগ স্বীকার করাও দেশপ্রেমের দায়িত্ব।

ছয় ঋতুর বৈচিত্র্য বাংলাদেশের প্রকৃতিকে করেছে অপূর্ব ও অনন্য। এই প্রকৃতি আমাদের জীবন, সংস্কৃতি ও অনুভূতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তাই দেশের প্রকৃতি, মানুষ ও ঐতিহ্যকে ভালোবাসা এবং দেশের উন্নয়নে কাজ করা আমাদের প্রত্যেকের কর্তব্য। আমরা যদি দেশকে ভালোবাসি, পরিবেশ রক্ষা করি এবং সৎ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলি, তবে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ আরও সুন্দর ও সমৃদ্ধ হবে। ছয় ঋতুর রঙে যে দেশ বারবার সাজে সেই দেশকে ভালোবাসা তো নিঃশ্বাসের মতোই স্বাভাবিক। সেজন্য আমরা যেকোনো বয়সে গলা খুলে আবৃত্তি করতে পারি, গান গাইতে পারি। মনের অজান্তেই গেয়ে উঠি-বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদে এলো বান...।