রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামিকে আদালতে দেয়া জবানবন্দির বরাতে পাওয়া তথ্য খতিয়ে দেখার কথা বলেছে পুলিশ। গতকাল সংবাদ সম্মেলনে রংপুরের পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডিএনএ পরীক্ষা ও ডোপ টেস্ট করার জন্য আদালতে আবেদন করবেন তারা। পাশাপাশি গণপতি চক্রবর্তী যে জমি কিনে বাড়ি করেছেন, সেই জমি নিয়ে আসামির মধ্যে ক্ষোভ এবং ‘দাস ও ব্রাহ্মণের মধ্যে জাতগত ব্যবধানের’ বিষয়টিও পুলিশ খতিয়ে দেখছে বলে পুলিশ কমিশনার বলেছেন।
তিনি বলেছেন, ‘সিদ্ধার্থ দাসের জবানবন্দিতে একটা কথা উঠে এসেছে। তার পূর্বপুরুষদের জমি এরা (গণপতি চক্রবর্তী) কিনেছিল। কথা বলে আমরা একটু এটাও দেখতেছি যে, পূর্বপুরুষদের জমি, শোনা গেছে, একটু বেশি মূল্যে কেনা হয়েছিল। এই জমি কেনাটা তাদের (সিদ্ধার্থ) বংশের শরিকরা হয়তো ভালোভাবে নেয় নাই।
শরিকরা যারা আছে, তারা সবাই টাকা যেটা পাওয়ার কথা, ওই টাকাটা তারা পায় নাই। এটা নিয়ে তাদের মনের মধ্যে একটা ক্ষোভ থাকতে পারে। আবদুল মাবুদ বলেন, মাছুয়াপাড়ার বেশির ভাগ লোক হল দাস বংশের। আর স্যাররা হলেন ব্রাহ্মণের জাত। সেখানে একটু ব্যবধান ছিল। অর্থাৎ রাস্তাঘাটে দেখা-সাক্ষাৎ হতো, কিন্তু বাসায় আসা-যাওয়া ছিল না। এটা তো তাদের মনের মধ্যে ক্ষোভ থাকতে পারে। এই দুইটা বিষয় আমরা দেখছি।
ময়নাতদন্তে খোলাসা হয়েছে হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণের বিষয়টি। পুলিশ জানায়, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে শ্বাসরোধে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়নি প্রীতিলতা ও আগামী চক্রবর্তীর শরীরে। তবে বুধবার রাতে পুলিশ প্রহরায় থাকা গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে পানি দিয়ে আলামত নষ্ট করার অভিযোগ এনেছে এলাকাবাসী। এদিকে চার খুনের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে গোয়েন্দা সংস্থা ব্যর্থ বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
ময়নাতদন্তে শিক্ষক পরিবারের চার সদস্যকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করার প্রমাণ মিলেছে বলে জানিয়েছেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ। গতকাল সকালে রংপুর মেট্রোপলিটন সদর দপ্তর মিলনায়তনে তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, মাদক সেবনে বাধা দেয়ায় পরিবারের প্রত্যেককে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস। ময়নাতদন্তে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। হত্যাকাণ্ডের পর মুগ্ধ দাস দখিগঞ্জ শ্মশানে আশ্রয় নিয়েছিল বলে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে পাহারাদার বিদ্যুৎ দাস।
পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, ময়নাতদন্তের রিপোর্টে চারজনকে শ্বাসরোধ করে হত্যার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। আগামী চক্রবর্তী ও প্রীতিলতা চক্রবর্তীর ভ্যাজাইনাল সোয়াব নেয়া হয়েছিল। সেখানে কোনো ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়নি। গলায় শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হলে মানুষের মলমূত্র বের হয়ে আসে।
আমরা দেখেছি একজন ডোম বলেছিলেন ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে। আসলে ওই আলামত ছিল ডেডবডির।
তিনি আরও বলেন, দখিগঞ্জ শ্মশানের কেয়ারটেকার ছিল বিদ্যুৎ দাস। সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিল যে, মুগ্ধ দাস তার কাছে গিয়ে বলে দাদা আমাকে পানি দেও, আমি ও সিদ্ধার্থ স্যারসহ চারজনকে হত্যা করেছি। এ ছাড়া সিদ্ধার্থের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে গণপতি চক্রবর্তী স্যার জমি কিনেছিলেন। শোনা গেছে সেটি বেশি মূল্যে কেনার বিষয়টি তাদের বংশের অনেকে ভালোভাবে নেয়নি। এ ছাড়া টাকা ভাগাভাগির বিষয়টি আনুপাতিক হারে হয়নি।
এদিকে রংপুরে শিক্ষক পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। গতকাল দুপুরে নগরীর শাপলা চত্বরস্থ দলীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, একটি শিক্ষিত, ভদ্র পরিবারের চারজনকে হত্যা করা হলো। সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে গোয়েন্দা সংস্থার পেছনে। বিগত দিনে একজন নিরীহ, মামলা নেই, কারও সঙ্গে শত্রুতা নেই এমন মানুষকে গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন তুলে এনে ক্রসফায়ারে দিয়েছে। অথচ এমন হত্যাকাণ্ড ঘটলো আজও এর সঠিক ক্লু বের করা গেল না। গোয়েন্দা সংস্থা হত্যাকাণ্ডের সঠিক ক্লু বের করতে ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি বলেন, মানুষের জানমালের নিরাপত্তা কোথায়। দ্বিতীয়ত যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের দিয়ে প্রকৃত তথ্য জাতিকে জানাবার কিছু উদ্ঘাটন করতে পেরেছে বলে গণমাধ্যম বলতে পারেনি। আমি নিহতের পরিবারের প্রতি সমবেদনা, সহানুভূতি ও শোক জ্ঞাপন করছি। অবিলম্বে প্রশাসনকে হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদ্ঘাটন, জড়িতদের খুঁজে বের করার জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি।
এদিকে বুধবার রাতে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে পানি দিয়ে আলামত নষ্টের অভিযোগ তোলেন এলাকাবাসী। তারা জানান, গণপতি চক্রবর্তী মারা যাওয়ার পর তিনদিন ধরে বাড়ির লাইন জ্বালিয়ে রাখা ছিল। কিন্তু বুধবার সন্ধ্যায় হঠাৎ করে লাইট নেভানো হয়। এরপর পানির মোটর ছেড়ে দেয়া হয়। সেই পানি ট্যাংকি থেকে উপচে ছাদে পড়ে যায়। এনিয়ে স্থানীয়রা জিজ্ঞাসা করলে পুলিশ সদস্যরা কোনো জবাব দেয়নি।
মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী বলেন, এই বাড়িতে যারা ডিউটি করেন তারা কেউই বাড়ির বিদ্যুতের সুইচ সম্পর্কে অবগত নয়। তারা ভুল করে পানির মোটর ছেড়েছিল। পরবর্তীতে ট্যাংকি পানি পরিপূর্ণ হয়ে ছাদে পড়লে সেটি বন্ধ করে দেয়া হয়। এখানে আলামত নষ্টের কিছু নেই। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত আলামত ঘটনাস্থল থেকে শনিবারই নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
