মাঠে গিয়ে গর্ভবতী মায়েদের আস্থা ফেরাচ্ছেন ডা. সিনথিয়া

মাঠে গিয়ে গর্ভবতী মায়েদের আস্থা ফেরাচ্ছেন ডা. সিনথিয়া

ফন্ট সাইজ:

একজন মা যখন সন্তানসম্ভবা হন, তখন তাঁর মনে একসঙ্গে কাজ করে আনন্দ, স্বপ্ন আর নানা আশঙ্কা। প্রসবের সময় কোথায় যাবেন, কীভাবে সন্তান জন্ম নেবে, জটিলতা দেখা দিলে কী করবেন—এসব প্রশ্নও ঘুরপাক খায়। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার অনেক গর্ভবতী মায়ের মধ্যে এখনো হাসপাতালে গিয়ে সন্তান প্রসবের বিষয়ে অনীহা কিংবা নানা ধরনের ভীতি রয়েছে।

এই বাস্তবতায় গর্ভবতী মায়ের নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা এবং নরমাল ডেলিভারির প্রতি আগ্রহ বাড়াতে মাঠপর্যায়ে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ সিনথিয়া তাসমিন। হাসপাতালের সেবার পাশাপাশি তিনি ছুটে যাচ্ছেন প্রত্যন্ত এলাকার কমিউনিটি ক্লিনিক, চা বাগান ও গ্রামাঞ্চলে। মা সমাবেশ, কমিউনিটি ক্লিনিকসহ মাঠপর্যায়ের নানা কার্যক্রমের মাধ্যমে গর্ভবতী মায়েদের সচেতন করছেন, দিচ্ছেন প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরামর্শ এবং নিরাপদ প্রসবের বিষয়ে তৈরি করছেন আস্থা।

এরই ধারাবাহিকতায় রবিবার (২৩ আগস্ট) সিন্দুরখান ইউনিয়নের ইজারাগাঁও কমিউনিটি ক্লিনিকে অনুষ্ঠিত হয় “মা সমাবেশ”। সেখানে প্রায় ৫৮ জন গর্ভবতী মা অংশ নেন। তাঁদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার পাশাপাশি মাতৃত্বকালীন বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতামূলক পরামর্শ দেওয়া হয়।

এর আগে টিপরাছড়া, কালীঘাট, ফুলছড়া, উদনাছড়া, জাগছড়া, আমরাইলছড়া, হুগলিয়া, জঙ্গলবাড়ি, খাইছড়া, লাংলিয়া চা-বাগানসহ আশিদ্রোন কমিউনিটি ক্লিনিকেও মা সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
সমাবেশগুলোতে গর্ভবতী মায়েদের এক মাসের জন্য আয়রন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিনসহ প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। পাশাপাশি গর্ভকালীন সময়ে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ, প্রয়োজনীয় বিশ্রাম এবং প্রসবের আগে ও পরে করণীয় বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে কথা বলেন চিকিৎসকরা।
তবে এই আয়োজনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি ছিল প্রসবের সময় ঝুঁকি না নিয়ে হাসপাতালে আসা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিরাপদ নরমাল ডেলিভারির চেষ্টা করা।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, গত এক বছরে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রায় ২ হাজার ৪০০ গর্ভবতী মায়ের নরমাল ডেলিভারি হয়েছে। বর্তমানে প্রতি মাসে গড়ে ১৭০ থেকে ২৪০টি নরমাল ডেলিভারি হচ্ছে।

সমাবেশে অংশ নেওয়া এক গর্ভবতী মা বলেন, “আগে নরমাল ডেলিভারি নিয়ে অনেক ভয় ছিল। ডাক্তার আপা আমাদের সঙ্গে কথা বলে বুঝিয়েছেন কখন হাসপাতালে যেতে হবে, কী কী সতর্কতা নিতে হবে। এখন অনেকটাই আত্মবিশ্বাস পাচ্ছি।”

আরেক গর্ভবতী মা বলেন, “গর্ভাবস্থায় কী খাবার খেতে হবে, কোন ওষুধ কখন নিতে হবে এবং কীভাবে নিজের যত্ন নিতে হবে। এসব বিষয়ে আজ বিস্তারিত জানতে পেরেছি। সবচেয়ে ভালো লেগেছে, ডাক্তার নিজে আমাদের কাছে এসে কথা বলেছেন।”

ডা. সিনথিয়া তাসমিন গর্ভবতী মায়েদের উদ্দেশে বলেন, গর্ভাবস্থা মা ও শিশুর সুস্থতার জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পুষ্টিকর খাবার, প্রয়োজনীয় বিশ্রাম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। প্রসবের সময় কোনো ধরনের ভয়, ভুল ধারণা বা কুসংস্কারের কারণে যেন কেউ হাসপাতালে যেতে দেরি না করেন।”
তিনি বলেন, “সময়মতো হাসপাতালে এলে গর্ভবতী মা ও নবজাতকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অনেক সহজ হয়। আমরা চাই, প্রত্যন্ত এলাকার কোনো মা যেন চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না হন। তাই হাসপাতালের পাশাপাশি আমরা তাঁদের বাড়ির কাছাকাছি কমিউনিটি ক্লিনিক, চা-বাগান ও গ্রামাঞ্চলে গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতামূলক বার্তা পৌঁছে দিচ্ছি।”

নরমাল ডেলিভারি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “প্রত্যেক মায়ের জন্য নিরাপদ প্রসবই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নরমাল ডেলিভারির জন্য চেষ্টা করা সম্ভব। তবে মা ও শিশুর নিরাপত্তার স্বার্থে যখন যে ধরনের চিকিৎসা প্রয়োজন, সেটিই নিশ্চিত করা হবে। আমাদের উদ্দেশ্য হলো—ভয় দূর করে গর্ভবতী মা ও তাঁদের পরিবারের মধ্যে হাসপাতালে নিরাপদ প্রসবের প্রতি আস্থা তৈরি করা।”

শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নরমাল ডেলিভারি বাড়ানোর এই উদ্যোগে মাঠপর্যায়ে ডাঃ সিনথিয়া তাসমিনের সরাসরি সম্পৃক্ততা ইতোমধ্যে গর্ভবতী মা ও তাদের পরিবারের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। প্রত্যন্ত এলাকার মায়েদের কাছে চিকিৎসাসেবা ও স্বাস্থ্যবার্তা পৌঁছে দিয়ে নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করার এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে নরমাল ডেলিভারির প্রতি মানুষের আস্থা আরও বাড়বে এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।