ক্রিকেটারদের একের পর এক ইনজুরির ঘটনায় আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) মেডিকেল বিভাগ। সম্প্রতি লিটন কুমার দাসের ইনজুরি নিয়ে মেডিকেল বিভাগে কর্মরতদের শোকজও করা হয়। তবে এই বিভাগের সীমাবদ্ধতা নতুন নয়। পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও ফিজিওর অভাব দীর্ঘদিনের। সেই যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এ বিভাগে যুক্ত হয়নি আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম। নেই বিসিবির কোনো আধুনিক মানের এম্বুলেন্সও। এসব কারণেই নতুন করে বিসিবির মেডিকেল বিভাগ ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মেডিকেল বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সরকার মাহবুব আহমেদ শামীম। তিনি জানিয়েছেন দ্রুতই একটি আধুনিক এম্বুলেন্স কিনতে যাচ্ছে বিসিবি। নতুন পরিকল্পনা নিয়ে তিনি বলেন, ‘একাডেমি ভবনে আমাদের প্রায় ৩০০০ স্কয়ার ফিট জায়গা বরাদ্দ করা আছে। সেখানে আমরা কী করতে পারি, সেটা নিয়ে আমরা আলাপ-আলোচনা করেছি।
একটা পরিকল্পনাও করেছি, প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। এখানে আমাদের চিকিৎসক সংখ্যা কম। সংখ্যা বাড়াতে হবে। সবচেয়ে বড় সমস্যা ইমার্জেন্সির কোনো ব্যবস্থা নেই। আমরা ইমার্জেন্সি মেডিকেল ইউনিট, তারপরে ওপিডি, পুনর্বাসন ইউনিট, অবজারভেশন সেন্টার করবো। তবে তা ধাপে ধাপে হবে। এছাড়াও শর্ট টার্মে কী কী আমরা করতে পারি এরকম করে, আমরা আলোচনা করেছি। প্রত্যেকটা জায়গা একেবারে অত্যাধুনিক হবে। আমরা মানের দিক থেকে কোনো ছাড় দেবো না।’ ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম ও সিলেটের মাঠে অনুশীলনের সময় চিকিৎসা সুবিধার অভাব দেখা দেয়। ঢাকার বাইরের ভেন্যুগুলোতে অবকাঠামো না থাকায় ঢাকায় আসতে হয় ক্রিকেটারদের। এই সমস্যার সমাধানের জন্য আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বোর্ড। পাঁচটি ভেন্যুতে একজন করে চিকিৎসক, ট্রেনার ও ফিজিও নিয়োগ দেবে বিসিবি। একই সাথে মাঠের সেবার জন্য অ্যাম্বুলেন্স কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অতীতে অনুশীলনের দিনে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ায় এনে কাজ চালানো হতো।
নিজস্ব গাড়ি থাকলে সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছানো সম্ভব হবে। শামীম বলেন, ‘আমাদের আপনি একদম ঠিক বলেছেন। আমরা দ্রুত একটা অ্যাম্বুলেন্স কেনার পরিকল্পনা করছি। আমরা আঞ্চলিকভাবেও চিন্তা করেছি। পাঁচটা ভেন্যু আছে আমাদের, ওখানে একজন করে ডাক্তার, ফিজিও ও ট্রেনার- এরকম নিয়োগ করা যায় কিনা, সে নিয়েও আমরা চিন্তাভাবনা করছি।’ আঞ্চলিক পর্যায়ে এই সুবিধা চালু হলে ঢাকার ওপর চাপ কমবে। চিকিৎসা কর্মকর্তা নিয়োগের জন্য উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করবে বিসিবি। অন্যদিকে অভিযোগ আছে ক্রিকেটাররা অনেকেই ইনজুরির তথ্য গোপন করেন। খেলোয়ারদের চোটের তথ্য গোপন করার বিষয়ে সচেতনতা তৈরির কাজ করবে বোর্ড। দল এবং খেলোয়ারদের পক্ষ থেকে অনুরোধ থাকলেও চিকিৎসার নিয়মের বাইরে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সমপ্রতি লিটনের চোট নিয়ে স্ক্যান রিপোর্ট এবং চিকিৎসা প্রক্রিয়া আলোচনার জন্ম দেয়। গ্রেড-১ চোটের ক্ষেত্রে শরীরকে ২১ থেকে ৩০ দিন সময় দিতে হয়। এই সময়সীমার আগে মাঠে নামলে চোটের মাত্রা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। খেলোয়ারদের জন্য বীমা সুবিধা চালুর বিষয় নিশ্চিত করেছে বোর্ড।
চুক্তিভুক্ত ক্রিকেটাররা গ্রেড-১ বীমা সুবিধার আওতায় থাকেন। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটারদের জন্য বীমা সুবিধা বিদ্যমান। শামীম বলেন, ‘অতীতে কিছু জায়গায় প্রোটোকলে আপস করা হয়েছে, হয়তো কোনো প্লেয়ার বা টিম ম্যানেজমেন্টের বিশেষ অনুরোধে পূর্ণ সুস্থতার আগেই কাউকে রিহ্যাবে পাঠানো হয়েছে বা মাঠে নামানো হয়েছে। ভবিষ্যতে আমরা মেডিকেল প্রোটোকলের বাইরে এক চুলও নড়ব না। আমাদের মেডিকেল টিমের অনুমতি ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না।’ চিকিৎসার পাশাপাশি খেলোয়ারদের মনের যত্নের বিষয় যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর জন্য মনস্তত্ত্ববিদ যুক্ত করে ব্যবস্থা সাজানো হবে। চিকিৎসা বিভাগের সমালোচনা নিয়ে বক্তব্য দেন শামীম।
দেশের ৯৯ শতাংশ খেলোয়ারকে মাঠে নামানোর পর চোটের ঘটনা ঘটলে সব দায় আসে চিকিৎসক দলের ওপর। অতীতে দেশের বাইরে গিয়ে চিকিৎসা নেয়ার উদাহরণ দেখা গেছে। অস্ট্রেলিয়া সফরের আগে তাসকিন আহমেদ ও নাহিদ রানা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। এর আগে চিকিৎসার কারণে সিঙ্গাপুর গিয়েছিলেন লিটন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে চিকিৎসার জন্য বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমবে। শামীম বলেন, ‘আমরা ক্রিকেট বোর্ডের সবার সহায়তায় মেডিকেল ইউনিটকে একেবারে আন্তর্জাতিক মানের এবং এর চেয়ে ভালো করে তৈরি করতে পারব। যে পরিকল্পনা করছি, তাতে বিদেশ থেকে বাংলাদেশে চিকিৎসা নিতে আসবে, আমাদের বাইরে যেতে হবে না। এটা আমি আপনাদেরকে নিশ্চয়তা দিতে পারি।’
