একের পর এক ভয়ংকর খুন

সহযোগীদের খবর

একের পর এক ভয়ংকর খুন

ফন্ট সাইজ:

প্রথম আলো

‘একের পর এক ভয়ংকর খুন’—এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। প্রতিবেদনে বলা হয়, রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে খুনের ঘটনার মতো একটি হত্যাকাণ্ড ঘটে গত জুনে। লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের সেই ঘটনায় (গত ২৫ জুন) মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করেন এক যুবক।

নিহত ব্যক্তিরা হলেন শাহিনুর বেগম (৪০) এবং তাঁর তিন মেয়ে সাইমা আক্তার (২১), ইকরা (১৭) ও সিপা (১০)।

শুধু রংপুর ও লক্ষ্মীপুর নয়, দেশের বিভিন্ন জায়গায় একই পরিবারের একাধিক সদস্য খুন হওয়ার ১৮টি ঘটনা পাওয়া গেছে গত ছয় মাসে (২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৪ আগস্ট)। এসব ঘটনায় অন্তত ৪৭ জন নিহত হয়েছেন। কোনো ক্ষেত্রে এক পরিবারের দুজন, কোনো ক্ষেত্রে তিনজন, কোনো ক্ষেত্রে চারজন এবং কোনো ক্ষেত্রে পাঁচজন নিহত হয়েছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরে আলাদাভাবে একই পরিবারের একাধিক সদস্য হত্যার পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। ১৮টি ঘটনা পাওয়া গেছে সাতটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, কোনো ঘটনায় সম্পত্তি বা জমির বিরোধ এবং কোনোটির সঙ্গে মাদকের সম্পর্ক সামনে এসেছে। কোনোটি দাম্পত্য ও পারিবারিক কলহের কারণে ঘটেছে বলেও উল্লেখ করেছে পুলিশ। কোনো কোনো ঘটনার কারণ এখনো অজানা।

সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধবিষয়ক বিশ্লেষকেরা বলছেন, একের পর এক একসঙ্গে একাধিক খুনের ঘটনা মানুষের মনে নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি করছে। আপাতদৃষ্টিতে এসব ঘটনার একটির সঙ্গে অন্যটির মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু গভীর বিশ্লেষণে দেখা যাবে, মিল রয়েছে।

যেমন নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতায় মাদক সহজলভ্য হয়ে গেছে। এতে মাদকাসক্ত ব্যক্তির সংখ্যা বাড়ছে। মাদকাসক্ত ব্যক্তি হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে। এমন ভয়ংকর মাদক ছড়িয়ে পড়েছে, যাতে আসক্তদের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশে জমির বিরোধ একটি বড় সমস্যা। সরকারগুলো এই বিরোধ নিষ্পত্তি সহজ করতে পারেনি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়নি। ফলে জমির বিরোধের কারণে দেশে বহু সংঘর্ষ ও হত্যার ঘটনা ঘটছে।

বিশ্লেষকেরা আরও বলছেন, বাংলাদেশে জমির বিরোধ একটি বড় সমস্যা। সরকারগুলো এই বিরোধ নিষ্পত্তি সহজ করতে পারেনি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়নি। ফলে জমির বিরোধের কারণে দেশে বহু সংঘর্ষ ও হত্যার ঘটনা ঘটছে।

অপরাধ নিয়ে গবেষণাকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, একেক ঘটনার কারণ একেক রকম। তবে প্রতিটির পেছনে সামাজিক ও কাঠামোগত নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি রয়েছে। পারিবারিক বিরোধ, সম্পদ, প্রভাব ও প্রতিশোধের প্রবণতার সঙ্গে অপরাধের ঘটনার দ্রুত তদন্ত এবং বিচার না হওয়াও এ ধরনের সহিংসতার অন্যতম কারণ।

ঘটনাগুলো ভয়ংকর, উদ্বেগজনক

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছিলেন, দা হাতে এক যুবক দুপুর ১২টার দিকে ঘরে ঢুকে মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে মারাত্মক আহত করেন। এতে দুজনের মৃত্যু হয় ঘটনাস্থলেই। দুজন মারা যান হাসপাতালে। অভিযুক্ত যুবকের নাম অন্তর মজুমদার।

হত্যাকাণ্ডের পর পালানোর সময় অন্তর মজুমদারকে স্থানীয় লোকজন আটক করে মারধর করেন। এতে তাঁর মৃত্যু হয়। অন্তর মজুমদার কেন চারজনকে কুপিয়ে হত্যা করলেন, তা এখনো অজানা। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, অন্তর মাদকাসক্ত ছিলেন। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, মাদকের টাকার জন্যই এই হত্যাকাণ্ড হতে পারে।

হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পাঁচ দিন পর আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় রায়পুর থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া বলেন, সাত-আট বছর ধরে অন্তর মাদকাসক্ত। তিনি বাড়িতে মাদকের টাকার জন্য বাবা-মাকে মারধর করতেন।

এদিকে রংপুরে একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনার সঙ্গেও মাদককে সামনে এনেছে পুলিশ। গত শনিবার রাতে রংপুরের মাছুয়াপাড়ার বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর (১২) লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ বলছে, চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।

এ ঘটনায় গত রোববার ভোরে মাছুয়াপাড়ার মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামের দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওই দিনই সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার আবদুল মাবুদ দাবি করেন, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে।

যদিও এ ঘটনার আসল কারণ এটাই কি না, তা নিয়ে মানুষের সন্দেহ রয়েছে। মঙ্গলবার মামলাটি থানা থেকে পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) হস্তান্তর করা হয়।

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় গত ২৫ জুলাই খুন হন স্বপন দাশ গুপ্ত (৬৫) ও তাঁর স্ত্রী কল্পনা দাশ গুপ্ত (৫৫)। হত্যার অভিযোগ তাঁদের একমাত্র ছেলে রিমন দাশ গুপ্তের বিরুদ্ধে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র বলছে, মাদকাসক্ত রিমন দীর্ঘদিন ধরে বেকার। চাকরি নিয়ে তর্কের একপর্যায়ে বাবা-মাকে কুপিয়ে হত্যা করেন তিনি। অর্থাৎ এ ঘটনায় মাদকাসক্তি ও বেকারত্বের মতো দুটি সামাজিক সমস্যা সামনে আসে।

সিলেট নগরের রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার নিজ বাসায় ১২ আগস্ট সকালে ব্যবসায়ী আবদুস সাত্তার (৯০), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) ও গৃহপরিচারিকা তাহমিনা (২০) খুন হন। এ ঘটনার দিন বিকেলেই পুলিশ রায়নগর এলাকা থেকে বাবুল মিয়া (৪০) নামের একজনকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে।

গ্রেপ্তার বাবুল মিয়া রংমিস্ত্রি ও কসাইয়ের কাজ করতেন বলেও জানিয়েছিল পুলিশ। প্রাথমিকভাবে সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, গৃহপরিচারিকা তাহমিনার সঙ্গে ১৫-২০ দিনের একটি সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল বাবুল মিয়ার। সম্পর্কে মনোমালিন্যের জেরে বাবলু মিয়া প্রথমে তাহমিনা এবং পরে দম্পতিকে খুন করেন। তবে পুলিশের এমন দাবি মানতে নারাজ ছিলেন নিহত দম্পতির স্বজনেরা।

হত্যাকাণ্ডের দুদিন পর নিহত দম্পতির যুক্তরাজ্যপ্রবাসী মেয়ে সেলিনা সুলতানা সিলেটের কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় আটক বাবুলের নাম উল্লেখ করেননি। এজাহারে তিনি জমি নিয়ে বিরোধ এবং সে কারণে হত্যার অভিযোগ তুলেছিলেন। যদিও পুলিশ বলছে, ২০ আগস্ট ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন বাবুল মিয়া।

গত ছয় মাসে আত্রাইয়ে স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রী-সন্তান হত্যা, দিনাজপুরে ছেলেদের বিরুদ্ধে বাবা-সৎভাই হত্যা, মানিকগঞ্জে দেবরের বিরুদ্ধে ভাবি-ভাতিজা হত্যা, রাজধানীর কলাবাগানে স্বামীর হাতে স্ত্রী-শাশুড়ি হত্যা এবং সুনামগঞ্জে বাবার বিরুদ্ধে দুই শিশুসন্তান হত্যার অভিযোগ এসেছে। গাজীপুরের কাপাসিয়ার পাঁচ খুনের এক আলোচিত ঘটনায় নিহত এক নারীর স্বামীকে প্রধান আসামি করা হয়েছে।

প্রথম আলো যে ১৮টি ঘটনা বিশ্লেষণ করেছে, তার মধ্যে ১২টি ঘটনায় একই পরিবারের দুজন করে নিহত হয়েছেন। একই পরিবারের তিনজন নিহত হয়েছেন দুই ঘটনায়, চারজন করে তিন ঘটনায় এবং পাঁচজন নিহত হয়েছেন এক ঘটনায়।

ছয় মাসের ১৮টি ঘটনার মধ্যে মে মাসেই ঘটেছে পাঁচটি। আগস্টের প্রথম ২৪ দিনেও স্বজনের সঙ্গে হত্যার শিকার হওয়ার পাঁচটি ঘটনা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ শুধু মে ও আগস্টেই ১০ ঘটনায় একই পরিবারের ২৭ জন নিহত হয়েছেন। ১৮টি ঘটনার মধ্যে অন্তত সাতটি হুমকি ও বিরোধের তথ্য পাওয়া গেছে।

১৮টি ঘটনার মধ্যে অন্তত ১৪টি ঘটনা বাড়ি, ভাড়া বাসা, বসতঘর বা আবাসস্থলে ঘটেছে। প্রশ্ন উঠেছে, ঘরেও কি মানুষ নিরাপদ নন।

পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, নিরাপত্তাবোধ আসলে রাষ্ট্র ও নাগরিকের পারস্পরিক আস্থার প্রশ্ন। নিরাপত্তা শুধু রাস্তায় পুলিশের উপস্থিতির বিষয় নয়; একজন মানুষ যখন নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করেও নিরাপদ বোধ করেন, তখনই প্রকৃত অর্থে আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি বলেন, ঘরের ভেতরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তাই পুলিশ খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখে। আর এই অপরাধের একটি অংশ এখন ব্যক্তিগত বিরোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সম্পত্তি বা আর্থিক বিরোধ এবং পূর্বশত্রুতার মতো বিষয় থেকে সংঘটিত হচ্ছে, যেগুলো অনেক সময় পুলিশের দৃশ্যমান উপস্থিতির বাইরে ঘটে।

শাহাদাত হোসাইন বলেন, শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর আসামি গ্রেপ্তার করা নয়; অপরাধের কারণ ও ঝুঁকি চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধ করা নিয়েও কাজ করছে পুলিশ।

অবশ্য মানুষ কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইন হাতে তুলে নিচ্ছে। যেমন গত ১৬ এপ্রিল মানিকগঞ্জে ৭ বছরের এক শিশু হত্যার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সন্দেহভাজন কিশোরের পরিবারের ওপর হামলা চালান বিক্ষুব্ধ লোকজন। গণপিটুনিতে ওই কিশোরের বাবা ও চাচা নিহত হন।

অপরাধবিষয়ক বিশ্লেষকদের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হলে মানুষ আইন হাতে তুলে নেন। ‘হত্যা মামলার সাজার হার কম হওয়ার কারণ অনুসন্ধান’ শীর্ষক এক গবেষণায় ২৩৮টি মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) গত বছরের মে মাসে জানিয়েছিল, ৫২ শতাংশ মামলায় সব আসামি খালাস পেয়েছেন।

খুনের মামলা বেড়েছে

পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব বলছে, দেশে খুনের ঘটনাও বেড়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়ে হত্যা মামলা হয়েছে ২ হাজার ৭৬টি। ২০২৫ সালের একই সময়ে ছিল ১ হাজার ৯৪৭টি। অর্থাৎ এ বছরের প্রথম সাত মাসে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বেড়েছে ১২৯টি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, শুধু মামলার সংখ্যা দিয়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি বোঝা যায় না। রাষ্ট্রকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে মানুষ পরিবার, প্রতিবেশী ও সমাজ—সব জায়গায় নিরাপদ বোধ করতে পারেন।

যুগান্তর

দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম জ্যেষ্ঠতার তালিকায় ২৫৭ ‘অনিয়মিত’ প্রকৌশলী!। খবরে বলা হয়, নিয়ম নেই। সুপারিশ নেই। তবু জ্যেষ্ঠতার তালিকায় নাম! আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) নিয়োগ পাওয়া ২৫৭ প্রকৌশলীকে ঘিরে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তর। নিয়মিতকরণ নিয়ে প্রশ্ন। পিএসসির সুপারিশও নেই। অথচ মিলেছে প্রথম শ্রেণির প্রকৌশলীর জ্যেষ্ঠতার সুবিধা। আবার কারও চাকরির ধারাবাহিকতাও নেই। আছে শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন। কেউ আবার এক শাখার প্রকৌশলী হয়েও পেয়েছেন অন্য শাখার পদ। এসব অনিয়ম উঠে এসেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তদন্তে। মন্ত্রণালয়ের লিখিত মতামতেও রয়েছে আপত্তি। তারপরও সেই ২৫৭ জনকে রেখেই তৈরি হয়েছে জ্যেষ্ঠতার তালিকা। যুগান্তরের অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় আগেই মত দিয়েছিল, এসব প্রকৌশলীর চাকরি নিয়মিতকরণ যথাযথ হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার পরই জ্যেষ্ঠতার তালিকা করা উচিত। কিন্তু সেই মতামত উপেক্ষা করেই ২১ এপ্রিল খসড়া তালিকা প্রকাশ করে স্থানীয় সরকার বিভাগ। আপত্তি জানানোর জন্য দেওয়া হয় ৩০ কর্মদিবস। এর মাত্র চার দিনের মাথায় ২৬ এপ্রিল খসড়া তালিকা চূড়ান্ত ও হালনাগাদের জন্য ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের উন্নয়ন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহকে আহ্বায়ক এবং এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনকে সমন্বয়ক করা হয়। কমিটি শুনানি করেছে। ১৭ আগস্ট তালিকা চূড়ান্ত করার বিষয়ে সভাও করেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাছাই কমিটির আহ্বায়ক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উন্নয়ন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সোমবার যুগান্তরকে বলেন, শুনানি করা ছাড়াও সব বিধিবিধান মেনে বিষয়টি সুরাহ করা হচ্ছে। এখনো চূড়ান্ত হয়নি। মন্ত্রণালয় সব পক্ষের মতামত নিয়েছে। মন্ত্রণালয় কনভিন্স। তিনি মনে করেন, কোনো অনিয়ম বা কারও প্রতি কোনো অন্যায় করা হচ্ছে না।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, সর্বশেষ ২০০৮ সালে এলজিইডির প্রথম শ্রেণির প্রকৌশলীদের অনুমোদিত জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল। দীর্ঘ ১৮ বছর পর নতুন খসড়া তালিকা প্রকাশের পর বিষয়টি ফের সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়মিতকরণ না হওয়া ২৫৭ প্রকৌশলীকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে জ্যেষ্ঠতার সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে নিয়ম মেনে চাকরি করা প্রকৌশলীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১০ সালে ১৩১ জন, ২০১১ সালে ১০৯ জন এবং ২০১৩ সালে ১৭ জন প্রকৌশলীকে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে সহকারী প্রকৌশলী পদে রাজস্ব খাতে পদায়ন করা হয়। এসব স্থানান্তরের ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মতামত নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। নথিতে বলা হয়েছে, ‘পিএসসির সুপারিশ ছাড়াই তাদের প্রথম শ্রেণির পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।’

নিয়মিতকরণ ছাড়াই জ্যেষ্ঠতার তালিকায় ২১২ জন: জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় অনুমোদিত ২০০৫ সালের নিয়মিতকরণ ও জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ বিধিমালায় বলা হয়েছে, নিয়মিতকৃত কর্মকর্তা বা কর্মচারীর জ্যেষ্ঠতা নিয়মিতকরণের তারিখ থেকে গণনা করতে হবে। পিএসসির আওতাভুক্ত পদে আত্তীকরণের ক্ষেত্রেও কমিশনের সুপারিশের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু নথিতে অভিযোগ করা হয়েছে, রাজস্ব খাতে এখনো নিয়মিতকরণ হয়নি-এমন ২১২ জনকেও জ্যেষ্ঠতার খসড়া তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নিয়মিতকরণের আগে তাদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের সুযোগ আছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। এছাড়া রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের আগের চাকরির ধারাবাহিকতার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। জনপ্রশাসনের মতে, অনিয়মিত ২৫৭ জনের মধ্যে অন্তত ৪২ জনের প্রকল্পের চাকরিতে ধারাবাহিকতা ছিল না। অথচ তাদের মধ্যে অন্তত ২০ জনকে জ্যেষ্ঠতার খসড়া তালিকায় রাখা হয়েছে।

তদন্ত কমিটির চোখে গুরুতর অনিয়ম: জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও এসব বিষয়ে গুরুতর পর্যবেক্ষণ রয়েছে। কমিটির সমন্বয়ক ছিলেন বর্তমান যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম এবং এলজিইডির বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন। কমিটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ভূতাপেক্ষ তারিখ থেকে নিয়মিত করার সুযোগ না থাকায় প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে ২৫৭ প্রকৌশলীর নিয়মিতকরণের আদেশ জারি প্রয়োজন। নিয়মিতকরণ যথাযথ না হওয়ায় তাদের জ্যেষ্ঠতা গণনারও সুযোগ নেই। এমনকি সপ্তম গ্রেডে সিলেকশন গ্রেড এবং ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি দেওয়ার আইনগত সুযোগ ছিল না বলেও মত দিয়েছে কমিটি।

কালের কণ্ঠ

‘বাংলাদেশের সুযোগ না ঝুঁকি’-এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, বিশ্ব এক নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। পরাশক্তিগুলো যেমন নিজ নিজ বলয়ের শক্তিগুলোকে নিয়ে জোট করছে; তেমনি ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণে ঘনিষ্ঠ দেশগুলোও নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় জোটবদ্ধ হচ্ছে।

কেউ কারো থেকে পিছিয়ে থাকতে রাজি নয়। তারই ধারাবাহিকতায় এখন নতুন করে আলোচনায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিটি। এই জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগ দেওয়ার বিষয়ে এরই মধ্যে শোরগোল শুরু হয়েছে। তিন দেশের এই নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামোতে বাংলাদেশের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।

তবে বিশেষজ্ঞ ও সাবেক কূটনীতিকরা বলছেন, এই চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার নতুন সুযোগ যেমন তৈরি হতে পারে, তেমনি কোনো সংঘাতে জড়িয়ে পড়া, আঞ্চলিক মেরুকরণের অংশ হয়ে যাওয়া এবং প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েনের ঝুঁকিও রয়েছে। গত ৭ আগস্ট মক্কায় ত্রিপক্ষীয় সম্মেলনে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেন। চুক্তিতে তিন দেশ সম্মিলিত প্রতিরোধ সক্ষমতা জোরদার, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গভীর করা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছে। চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিন দেশের যেকোনো একটি দেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপরই হামলা হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে।

এরই মধ্যে এই জোটে আরো সদস্য রাষ্ট্র নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বলেও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর এসেছে। সৌদি আরবের বিপুল অর্থনৈতিক শক্তি ও মধ্যপ্রাচ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান, তুরস্কের শক্তিশালী প্রতিরক্ষাশিল্প ও সামরিক প্রযুক্তি এবং পাকিস্তানের বড় সামরিক বাহিনী ও পারমাণবিক সক্ষমতা—এই তিন দেশের সক্ষমতার সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে চুক্তিটি। তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য হওয়ায় তার সামরিক অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও এই কাঠামোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এরই মধ্যে অনেকেই নতুন এই কাঠামোকে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবে অভিহিত করছেন। তবে সৌদি আরব বলেছে, চুক্তিটি কোনো সামরিক অক্ষ বা ধর্মীয় জোট গঠনের উদ্যোগ নয় এবং কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে এখনো কথা বলার সময় আসেনি। বাংলাদেশের এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করার আছে, পর্যালোচনা করার আছে। তারা বিবেচনা করুক, তারপর কথা বলা যাবে।’

কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে এখনই পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান নিজেদের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা করছে। সময়ের সঙ্গে এই কাঠামো কতটা প্রাতিষ্ঠানিক ও কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) নির্বাহী পরিচালক ও ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক পারভেজ করিম আব্বাসীর মতে, মক্কা চুক্তির মূল দর্শন হলো সম্মিলিত প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ানো। একটি সদস্য দেশের ওপর হামলাকে অন্য সদস্যদের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনার মধ্য দিয়ে তিন দেশ নিজেদের নিরাপত্তাকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছে। তবে কোনো সদস্য দেশ বাস্তবে সংঘাতে জড়ালে অন্যরা কিভাবে এবং কতটা সামরিকভাবে পাশে দাঁড়াবে, সেই বিষয়গুলো এখনো পুরোপুরি পরীক্ষিত নয়।

আব্বাসী আরো বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান নিজেদের মধ্যে নতুন নিরাপত্তা সমন্বয়ের প্রয়োজন অনুভব করছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতা ও প্রচলিত নিরাপত্তা কাঠামো থাকা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সংঘাতগুলো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও বিকল্প নিরাপত্তাব্যবস্থার বিষয়টি নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

সমকাল

দৈনিক সমকালের প্রথম পাতার খবর ‘২০ চীনা যুদ্ধবিমান, ব্যয় ২৬ হাজার কোটি টাকা’। প্রতিবেদনে বলা হয়, চীন থেকে চতুর্থ প্রজন্মের ২০টি জে-১০সিই মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনার জন্য চুক্তির খসড়া তৈরি করেছে বাংলাদেশ। অন্তর্বর্তী সরকারের এই উদ্যোগ এগিয়ে নিচ্ছে বিএনপি সরকার। ২ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ২৬ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা ব্যয় হবে এতে। আট অর্থবছরে দাম পরিশোধ করা হবে। ১০টি বিমান ঘাটতি পূরণে (টিওঅ্যান্ডই) কেনা হবে। বাকি ১০টি বিমান কেনা হবে বিমানবাহিনীর নতুন স্কোয়াড্রন গঠনে।

সরকারের বিভিন্ন সূত্র এই তথ্য জানিয়েছে সমকালকে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, চীন থেকে জে-১০ যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে সরকার।

নথি সূত্রে জানা গেছে, ৪ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিমানবাহিনীর চিঠিতে যুদ্ধবিমানগুলোর ব্যয় এবং প্রশিক্ষণ-পরিবহন সরঞ্জামের খরচ সম্পর্কে জানানো হয়। প্রতিটি যুদ্ধবিমানের দাম ৬ কোটি ২৭ লাখ ডলার।

প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসেবে প্রতিটি বিমানের দাম পড়বে ৭৭১ কোটি টাকা। ২০টি বিমানের জন্য খরচ হবে ১২৫ কোটি ৬২ লাখ ডলার বা সাড়ে ১৫ হাজার কোটি টাকা। ২০টি বিমান পরিচালনার প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় অপারেশন সরঞ্জামের জন্য খরচ হবে ৮৮ লাখ ৮৩ হাজার ডলার। ছয়টি খাতে এই ব্যয় হবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বলা হয়েছিল, ২০২৫-২৬ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই চুক্তিটি বাস্তবায়ন হবে। তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাম্প্রতিক নথি সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শুরু হয়ে ২০৩৪-৩৫ অর্থবছর পর্যন্ত এই ক্রয় প্রক্রিয়া চলবে। অর্থাৎ, এই সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধ করতে হবে। প্রতিরক্ষা সূত্র জানিয়েছে, ২০২৭ সালের মধ্যে ছয়টি জে-১০ চায় বাংলাদেশ। বাকি ১৪টি পরবর্তী সময় ধাপে ধাপে আসবে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, বিমান ক্রয়ের কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাবনা মূল্যায়ন করছে বিমানবাহিনী। যুদ্ধবিমান ছাড়াও অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম, দূরপাল্লার রাডার, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম ও প্যাসিভ ডিফেন্স সিস্টেম কেনার কারিগরি মূল্যায়ন চলছে।

নথি সূত্রে জানা গেছে, জে-১০ এবং অ্যাটাক হেলিকপ্টার ক্রয়ে গঠিত কমিটি নেগোসিয়েশন বৈঠকের মাধ্যমে খসড়া চুক্তিপত্র তৈরি করে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে পাঠিয়েছে। চুক্তি সাপেক্ষে বিমানবাহিনীর নতুন মাল্টিরোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট ইউনিট গঠন করা হবে। এয়ার ওয়ারফেয়ার সেন্টার, ফিল্ড ইউনিট, বিমানবাহিনী ঘাঁটি পুনর্গঠন করা হবে। অ্যারোস্পেস গবেষণা ও উন্নয়ন কমপ্লেক্স স্থাপনের কিছু কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

নথি অনুযায়ী, বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বিমানবাহিনীর উড্ডয়ন ও পরিচালন কার্যক্রম সম্প্রসারণে বগুড়ায় পূর্ণাঙ্গ বিমানঘাঁটি স্থাপনে ভূমি অধিগ্রহণের কাজ চলমান রয়েছে।

নথিতে বলা হয়েছে, চীন থেকে সরকার টু সরকার (জিটুজি) পদ্ধতি অথবা চীনের যুদ্ধবিমান প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল অ্যারো-টেকনোলজি ইম্পোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্টের (সিএটিআইসি) সঙ্গে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে ২০টি যুদ্ধবিমান কেনা হবে। গত বছরের ৫ এপ্রিল অন্তর্বর্তী সরকার এই ক্রয় প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছিল।

গত বছরের অক্টোবরে তৎকালীন সরকার চীন থেকে যুদ্ধবিমান কেনার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়। তবে তখন স্পষ্ট করা হয়নি সরাসরি নাকি জিটুজি পদ্ধতিতে কেনা হবে। সাম্প্রতিক নথিতে জানা গেছে, জিটুজি পদ্ধতিতে কিনবে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করতে যুদ্ধবিমান কেনার কথা জানিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তাদের যুক্তি ছিল, বাংলাদেশের যুদ্ধবিমানগুলো পুরোনো। আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় কার্যকর কি না, সন্দেহ রয়েছে।

ইত্তেফাক

‘তিন শতাধিক কলেজে একাদশে শিক্ষার্থী নেই’—এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতার খবর। প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষার্থীর জন্য যেন হাহাকার চলছে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, তিন শতাধিক কলেজের একদশ শ্রেণিতে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ন্যূনতম একজন শিক্ষার্থীও নেই। এই তালিকায় রাজধানীর কয়েকটি কলেজও রয়েছে। বছরের পর বছর শিক্ষার্থী না পাওয়ায় নতুন শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য মরিয়া এসব কলেজ। এদের কারো কারো বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের অজান্তে আবেদন করিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী পাশ করেছে। এর বিপরীতে একাদশ শ্রেণিতে কলেজ ও মাদ্রাসা মিলিয়ে আসন রয়েছে প্রায় ২৫ লাখ ৬৩ হাজার ৬৩টি। ফলে সব পাশ করা শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হলেও ১৪ লাখের বেশি আসন খালি থাকবে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, প্রতি বছর এসএসসিতে অংশগ্রহণ এবং পাশের সংখ্যা দুটোই কমছে। আর শিক্ষার্থীর তুলনায় কলেজের সংখ্যা অনেক বেশি হয়ে গেছে।

এদিকে, সারা দেশের ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের কলেজ ভর্তির নীতিমালা প্রকাশ করা হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী, আগামী ২ সেপ্টেম্বর এই ভর্তির আবেদন গ্রহণ শুরু হবে। চলবে ১০ সেপ্টেম্বর রাত ৮টা পর্যন্ত। ক্লাস শুরু হবে ২৩ সেপ্টেম্বর। এদিকে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আসনের ৭ শতাংশ কোটায় রাখা হয়েছে। কলেজগুলোর মোট আসনের বাকি ৯৩ শতাংশ সবার জন্য মেধার ভিত্তিতে উন্মুক্ত থাকবে। এসব আসনে এসএসসি ও সমমানের ফলের ভিত্তিতে মেধাক্রম তৈরি করে শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হবে। অবশিষ্ট ৭ শতাংশ আসনের মধ্যে ৫ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের পুত্র-কন্যাদের জন্য এবং ২ শতাংশ শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এর অধীন দপ্তর-সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য সংরক্ষণ থাকবে। তবে এই কোটা পদ্ধতি শুধু ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রযোজ্য হবে।

জিপিএ সমান হলে যেভাবে মেধাক্রম : সমান জিপিএ প্রাপ্তদের ক্ষেত্রে সর্বমোট প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে মেধাক্রম নির্ধারণ করা হবে। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এর ক্ষেত্রে গ্রেড পয়েন্ট ও প্রাপ্ত নম্বর সমতুল্য করে হিসাব করতে হবে। তাছাড়া বিভিন্ন সালের গ্রেড পয়েন্ট ও প্রাপ্ত নম্বর সমতুল্য করে হিসাব করতে হবে। প্রথম দফায় নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের ফল ১৭ সেপ্টেম্বর রাত ৮টায় প্রকাশ করা হবে। নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের ভর্তি কার্যক্রম চলবে ২০ থেকে ২২ সেপ্টেম্বর। ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে নিয়মিত ক্লাস শুরু হবে।

শিক্ষার্থী সংকটে যেসব কলেজ : রাজধানীর মগবাজার এলাকার ন্যাশনাল ব্যাংক পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ বেশ কয়েক বছর ধরে তীব্র শিক্ষার্থী সংকটে ভুগছে। ১৯৮৯ সালে ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানটি একসময় নামকরা হলেও বর্তমানে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী আকর্ষণ করতে পারছে না। একাদশ শ্রেণিতে শূন্য শিক্ষার্থী থাকা কলেজগুলোর মধ্যে আছে খিলগাঁও এলাকার প্রাইম সিটি ইন্টারন্যাশনাল কলেজ, মোহাম্মদপুরে ট্রিনিটি কলেজ, মতিঝিলের ওয়েস্টার্ন কলেজ, উত্তরার স্টামফোর্ড কলেজ, পদ্মকানন রোডের সেন্ট্রাল আইডিয়াল কলেজ, উত্তরার হলি চাইল্ড কলেজ, সাতমসজিদ রোডের ঢাকা পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, গ্রীন রোডের আনোয়ার আইডিয়াল কলেজ, কেরানীগঞ্জের লাইসাম কলেজ, টঙ্গীর পূবাইল কমার্স কলেজ, ঢাকার নবাবগঞ্জের উপজেলার নবাবগঞ্জ পাইলট হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মিরপুর এলাকার খান ইন্টারন্যাশনাল কলেজ, মোহাম্মদপুরের সানওয়ে স্কুল অ্যান্ড কলেজ, নর্দান ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি কলেজ, মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার বালিয়াটি কলেজ, মিরপুরের সরোজ ইন্টারন্যাশনাল কলেজ, নিকুঞ্জ এলাকার রেসিডেন্সিয়াল ল্যাবরেটরি কলেজ, পাকুন্দিয়া উপজেলার চরটেকী গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার মেদিনীমন্ডল গার্লস কলেজ, মানিকগঞ্জের ডা. আব্দুর রহমান খান মহিলা কলেজ এবং রাজবাড়ীর জঙ্গল সম্মিলনী আদর্শ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এর বাইরে রাজধানী এবং মফস্সল এলাকায় আরো অনেক কলেজে একাদশে নেই শিক্ষার্থী।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) কলেজ শাখা সূত্রে জানা গেছে, সাধারণত দেখা যায় প্রতি বছর এসএসসি পাশ করা শিক্ষার্থীর মধ্যে অন্তত ১০ শতাংশ একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয় না। এ বছরও যদি সেটা হয়, তাহলে খালি আসনের সংখ্যা আরো বাড়বে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, একাদশ শ্রেণিতে বিপুলসংখ্যক আসন খালি থাকার অর্থ হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিদ্যমান সক্ষমতার বড় একটি অংশ অব্যবহূত থাকছে। এ অবস্থায় নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নতুন বিভাগ বা অতিরিক্ত আসন তৈরির পরিবর্তে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা, শিক্ষার মান ও বিষয়ভিত্তিক চাহিদা পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন।

নয়া দিগন্ত

দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম ‘হাসিনাকে ঘিরে ঢাকা-দিল্লির অচলাবস্থা কাটবে কোন পথে’। প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের শুরুতে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফরের জন্য নয়াদিল্লি ও ঢাকা নীরবে পরিকল্পনা করছিল, কিন্তু দিল্লিতে শেখ হাসিনার সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলন সেই চেষ্টা ভেস্তে দেয়। দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বরফ গলানোর প্রক্রিয়া মূলত ভারতের মাটিতে হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং দেশটিতে অবস্থানকে কেন্দ্র করে স্থবির হয়ে পড়েছে। ভারতে আশ্রিত হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য এবং ভিডিও কনফারেন্স ঢাকায় তীব্র অসন্তোষ তৈরি করে।

বাংলাদেশের সাবেক ও বর্তমান কূটনীতিক এবং বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের সম্পর্কের মূল বাধা শুধু হাসিনাকে ফিরিয়ে দেয়া বা প্রত্যর্পণের প্রশ্ন নয়, বরং ভারতের মাটি থেকে তার রাজনৈতিক বিবৃতি এবং উসকানিমূলক বক্তব্য দেয়ার সুযোগ করে দেয়া। ঢাকা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, এ ধরনের তৎপরতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ঢাকা হাসিনাকে ফেরত চাইলেও দিল্লি বিষয়টিকে দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল আইনি প্রক্রিয়ায় ঠেলে দিয়ে নিজস্ব আইনি ও বিচারিক পদ্ধতি অনুসরণ করছে। তবে রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, নিরাপত্তা এবং উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়নি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফরের আলোচনা এবং দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চলমান রয়েছে। ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে উভয় দেশই দীর্ঘস্থায়ী বিচ্ছিন্নতা এড়াতে আগ্রহী। এই কূটনৈতিক অচলাবস্থা কাটাতে এবং একটি ইতিবাচক ধারায় সম্পর্ক ফিরিয়ে আনতে দুই দেশের নেতৃত্বকে পারস্পরিক স্বার্থ ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার বিশ্লেষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

হাসিনা ও তার ছেলে জয় ও আওয়ামী লীগের সহকর্মীরা দিল্লিতে ওই সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থানের সমালোচনা করেন। বাংলাদেশ দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, হাসিনাকে ভারতীয় মাটি থেকে প্রকাশ্যে কথা বলার অনুমতি দেয়ায় তারা “ক্ষুব্ধ”, যেখানে তিনি ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে নির্বাসনে রয়েছেন। ঢাকা বিশেষভাবে নয়াদিল্লিকে এমন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অনুমতি না দেয়ার জন্য সতর্ক করে বলেছিল বিষয়টি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে। কিন্তু ভারত তাতে সাড়া দেয়নি। এখন বাংলাদেশ বলছে, ভারতে তারেক রহমানের সফরের আগে একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ প্রয়োজেন এবং একই সাথে হাসিনা ও অন্যা পলাতকদের প্রত্যর্পণের অনুরোধগুলোর বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে বলেছে। ভারত বলছে, প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতির মাধ্যমে অনুরোধগুলো ‘পর্যালোচনার অধীনে’ রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশী কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের সাথে সাক্ষাৎকারে ইঙ্গিত দিচ্ছেন, এই তাৎক্ষণিক বিরোধটি একটি সাধারণ প্রত্যর্পণ অচলাবস্থার চেয়েও বেশি সূক্ষ্ম হতে পারে।

নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সাবেক প্রেস মিনিস্টার ফয়সাল মাহমুদ বলেছেন, প্রত্যর্পণ এবং হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে পৃথক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। দুই দেশের মধ্যে অচলাবস্থার মূল কারণ হলো, নয়াদিল্লি শেখ হাসিনাকে নির্বাসনে থাকাকালীন আক্ষরিক অর্থেই একটি মেগাফোন দিয়েছে- যা ঢাকা ভারতকে বিশেষভাবে দিতে নিষেধ করেছিল। তার প্রত্যর্পণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয় এবং এটি তারেক রহমান সরকারের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও দীর্ঘ প্রক্রিয়া।

মাহমুদ বলেন, এই মুহূর্তে, তারেকের প্রস্তাবিত ভারত সফর এবং শীতল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের যেকোনো বৃহত্তর পুনর্গঠন নিয়ে যে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, তা হাসিনার প্রত্যর্পণকে কেন্দ্র করে নয় বরং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অনুমতি দেওয়ায়। এই উদ্বেগ বিএনপির সরকার গঠনেরও আগের। মোদির সাথে বৈঠকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস দিল্লিকে অনুরোধ করেছিলেন, হাসিনাকে ভারতের মাটি থেকে ‘উসকানিমূলক বক্তব্য’ দেয়া থেকে যেন বিরত রাখা হয়।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির আলজাজিরাকে বলেন, ঢাকা ‘বিশ্বাস ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে ভারতের সাথে একটি ভালো ও কার্যকর সম্পর্ক চায়। কিন্তু শেখ হাসিনার মতো সন্ত্রাসীদের ভারত থেকে আমাদের দেশকে অস্থিতিশীল করতে দেয়া গ্রহণযোগ্য নয়। উভয় দেশের নেতৃত্ব চাইলে সম্পর্ক ‘একটি নতুন পর্যায়ে’ প্রবেশ করতে পারে, কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা নয়াদিল্লিকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। কোনো সার্বভৌম ভূমি থেকে কেউ কোনো সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালাতে পারে না।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ঢাকা চায় ভারত যেন অপরাধে অভিযুক্ত অন্যান্য বাংলাদেশীকে ফেরত পাঠায়, যার মধ্যে রয়েছে শরিফ ওসমান হাদি হত্যার সন্দেহভাজনরা। তবে কবিরের মন্তব্য থেকে এটাও বোঝা যায় যে, ঢাকা চায় না হাসিনা বিরোধ অনির্দিষ্টকালের জন্য উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় বাধা হয়ে দাঁড়াক। তিনি বলেন, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর একটি বৈঠক আবশ্যক। তবে কেবল তখনই, যখন তা আমাদের জাতীয় স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। এটি আগামী সপ্তাহে, দুই সপ্তাহ পরে বা দুই মাস পরেও হতে পারে।

ভারত কি হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করবে?

হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত এবং তাকে প্রত্যর্পণ নয়াদিল্লির জন্য দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্ন চ্যালেঞ্জ। ঢাকা বেশ কয়েকবার হাসিনাকে ফেরত চেয়ে চিঠি পাঠালেও ভারত বলছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং এ বিষয়ে অগ্রগতি হলে হালনাগাদ তথ্য জানাবে। এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত জানতে আলজাজিরার অনুরোধে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো সাড়া দেয়নি। ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, বিষয়টি অবশ্যই চুক্তির বিধান এবং ভারতের আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে এগোতে হবে। তিনি বলেন, চুক্তিতে এমন কিছু ভিত্তিও রয়েছে যার অধীনে প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে।

বণিক বার্তা

‘ন্যূনতম নিরাপদ সীমার নিচে সব সারের মজুদ’—এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, আমন ধানের মৌসুমকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন জেলায় সারের কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ উঠেছে। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ঘাটতি নেই বলে আশ্বস্ত করা হলেও মাঠপর্যায়ে ভিন্ন চিত্রের কথা বলছেন কৃষক।

প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহে ভোগান্তির পাশাপাশি কোথাও কোথাও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দিয়ে কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের। কৃষি মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব হিসাবেও দেখা যাচ্ছে, দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত চার ধরনের সার ইউরিয়া, ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি), ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) ও মিউরেট অব পটাশ (এমওপি)—সবক’টির মজুদই নির্ধারিত নিরাপদ সীমার নিচে। যদিও মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, সারের সরবরাহ ব্যবস্থাপনা স্বাভাবিক রয়েছে। আমদানির মাধ্যমে নিয়মিতই সার আসছে, বিভিন্ন এলাকায় বরাদ্দ ও বিতরণ করা হচ্ছে এবং আরো কিছু সারবাহী জাহাজ পথে রয়েছে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের সংকট তৈরির আশঙ্কা নেই বলে তাদের দাবি।

কৃষি বিশ্লেষকদের মতে, আমন মৌসুমের বাড়তি চাহিদা, আন্তর্জাতিক বাজার ও আমদানি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং স্থানীয় উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে দেশের সার সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও পর্যাপ্ত নিরাপদ মজুদ নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরো জটিল হতে পারে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার মজুদ পরিস্থিতির (২৪ আগস্ট পর্যন্ত) নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে ইউরিয়ার মজুদ রয়েছে ৪ লাখ ৮২ হাজার ২০০ টন। অথচ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত এ সারের ন্যূনতম নিরাপদ মজুদ ধরা হয় পাঁচ লাখ টন। অর্থাৎ নিরাপদ সীমার চেয়ে বর্তমানে প্রায় ১৭ হাজার ৮০০ টন কম মজুদ ইউরিয়ার। টিএসপির ক্ষেত্রেও একই চিত্র। বর্তমানে দেশে এ সারের মজুদ রয়েছে ৩ লাখ ৬৯ হাজার টন। অথচ নিরাপদ মজুদের ক্ষেত্রে চার লাখ টন প্রয়োজন। সে হিসাবে নির্ধারিত নিরাপদ সীমার তুলনায় টিএসপির মজুদ কম রয়েছে প্রায় ৩০ হাজার ৭০০ টন।

সবচেয়ে বেশি ঘাটতি দেখা যাচ্ছে ডিএপি ও এমওপির ক্ষেত্রে। ডিএপির নিরাপদ মজুদসীমা পাঁচ লাখ টন হলেও বর্তমানে মজুদ রয়েছে মাত্র ৩ লাখ ৬৮ হাজার ১০০ টন। অর্থাৎ নিরাপদ সীমার তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার টন মজুদ কম ডিএপির। এর আগে গত মাসে কৃষি মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে মরক্কো থেকে ডিএপি আমদানি বাড়ানোর অনুরোধ জানায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। চিঠিতে সংস্থাটি জানায়, আগামী চার মাসে নির্ধারিত দুটি লটের পাশাপাশি অতিরিক্ত আরো দুটি করে লট ডিএপি আমদানি করতে হবে। অন্যথায় আগামী শীতকালীন ও বোরো মৌসুমে এ সারের স্বাভাবিক সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব হবে না।

এদিকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত দেশে এমওপির মজুদ ছিল ১ লাখ ৪৬ হাজার টন। অথচ এ সারের নিরাপদ মজুদ হিসেবে ধরা হয় তিন লাখ টনকে। সে অনুযায়ী, নিরাপদ সীমার তুলনায় এমওপির মজুদ প্রায় অর্ধেকেরও কম।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ইউরিয়া ও তিন ধরনের নন-ইউরিয়া সার মিলিয়ে বর্তমানে দেশে মোট মজুদ রয়েছে ১৩ লাখ ৬৫ হাজার ৬০০ টন। অথচ সামগ্রিকভাবে নিরাপদ মজুদ থাকার কথা ১৭ লাখ টন। অর্থাৎ চার ধরনের সার মিলিয়ে নিরাপদ সীমার তুলনায় দেশের মজুদ প্রায় ৩ লাখ ৩৪ হাজার টন কম রয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বরে দেশে ইউরিয়া, ডিএপি, এমওপি ও টিএসপি মিলিয়ে মোট চাহিদা চার লাখ টনের বেশি হবে বলে মন্ত্রণালয়ের হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই মাসের জন্য মন্ত্রণালয় সার বরাদ্দ রেখেছে ৪ লাখ ৪৩ হাজার টন। ফলে বর্তমান মজুদ, নতুন আমদানি এবং মাঠপর্যায়ে সঠিকভাবে বিতরণ—এ তিনটি বিষয়ের ওপর সরবরাহ পরিস্থিতি অনেকাংশে নির্ভর করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দেশে কৃষিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত সার ইউরিয়া। এর পরই রয়েছে ডিএপির অবস্থান। চলতি অর্থবছরে দেশে ইউরিয়ার মোট চাহিদা ধরা হয়েছে ২৬ লাখ ২২ হাজার টন। ডিএপির চাহিদা ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ৭০০ টন। এছাড়া চলতি অর্থবছরে এমওপির চাহিদা ৯ লাখ ৭০ হাজার টন এবং টিএসপির চাহিদা ৯ লাখ ১ হাজার ৫০০ টন নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ কৃষি উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে বছরে বিপুল পরিমাণ সার সরবরাহ ও বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে।

আজকের পত্রিকা

দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রথম পাতার খবর ‘রংপুরে চার খুন: এজাহার থেকে আলামত কিছু অসংগতি, কিছু প্রশ্ন’। প্রতিবেদনে বলা হয়, রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের দেওয়া বয়ানের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের তথ্য, বাদীর বক্তব্য এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় কিছু অসংগতি দেখা দিয়েছে। এজাহারের সময় নিয়েও রয়েছে গরমিল। আর বাদী বলছেন, এজাহারে কী আছে, তিনি জানেন না। আবার লাশগুলো উদ্ধারের রাতে বাড়িটির বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। কিন্তু কে তা বিচ্ছিন্ন করল, তার উত্তর নেই। স্বর্ণ উদ্ধারের স্থান ও প্রক্রিয়া নিয়েও পুলিশের বর্ণনার সঙ্গে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য মিলছে না।

এসব প্রশ্নের মধ্যেই মামলার তদন্ত থানা-পুলিশের হাত থেকে পুলিশের গোয়েন্দা (ডিবি) শাখায় হস্তান্তর করা হয়েছে। এখন তদন্ত করছেন মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক জিন্নাত আলী। তদন্তের সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে গতকাল মঙ্গলবার তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘কালকের (আজ) মধ্যে ভালো কিছু পাবেন।’

রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়া এলাকায় নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে গতকাল দেখা যায় স্বজন, প্রতিবেশী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভিড়। কড়া পুলিশি নিরাপত্তায় সেখানে নিহতদের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। পরে আত্মার শান্তি কামনা করে ধর্মীয় আচার শেষে তাঁদের স্মরণে প্রার্থনা করা হয়।

মাছুয়াপাড়া এলাকার ওই বাড়ির ছাদ, চিলেকোঠা ও ঘর থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে পার্থী চক্রবর্তী আগামী (২৫) ও ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী আয়ুশের (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। গণপতি গত ডিসেম্বরে রংপুর জিলা স্কুল থেকে অবসর নেন। এরপর তিনি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাসেবা দিতেন।

এ ঘটনার পরদিন রোববার রংপুর কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন গণপতির বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী। ওই দিন দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে পুলিশ জানায়, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় ওই পরিবারের চারজনকে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে আটক করার কথা জানায় পুলিশ।

এজাহার নিয়ে বাদীর দাবি ও প্রশ্ন

মামলার এজাহারে কী লেখা আছে, তা জানেন না বলে দাবি করেছেন মামলার বাদী গোপীনাথ চক্রবর্তী। তিনি গতকাল আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘মামলা পুলিশেরা লিখছে, থানায়। লেখার পর সই নিছে। পড়ে দেখি নাই। লেখার সময় বসে ছিলাম। লেখা শেষে বলল, বাবু এখানে সই দাও।’

রোববার বেলা আড়াইটা থেকে তিনটার দিকে এজাহারে স্বাক্ষর করেছিলেন বলে জানান গোপীনাথ চক্রবর্তী। অথচ এজাহারে সময় লেখা আছে সকাল ১০টা ৩০ মিনিট।

মহানগর পুলিশ কমিশনার সংবাদ সম্মেলন করে হত্যারহস্য উদ্‌ঘাটন এবং দুজনকে আটকের কথা জানান রোববার বেলা পৌনে ১টার দিকে।

এজাহারে বাদীর স্বাক্ষরের আগেই পুলিশ হত্যারহস্য উদ্‌ঘাটন এবং দুজনকে আটকের কথা বললেও এজাহারে আটক দুজনের নাম নেই। এ বিষয়ে মামলার বাদী বলেন, ‘গ্রেপ্তার দুজনের নাম এজাহারে নেই কেন, সেটা পুলিশ ভালো জানে।’

এজাহারে অসংগতির বিষয়ে জানতে চাইলে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল কাদের আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি কাগজ-কলমে যখন পেয়েছি, সেটাই দিছি, মামলা নিয়ে অসংগতির কী আছে। সাড়ে ১০টায় এজাহার প্রাপ্তি সাপেক্ষে লেখায় আছে। বাদী কী বলে? কাগজে কলমে তো সাড়ে ১০টাই আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আর স্যারেরা সংবাদ সম্মেলন করে যেটা বলেছে, সেটাই। এর বেশি কিছু আমরা বলতে পারব না।’

হত্যায় শুধু দুজন জড়িত এবং ইয়াবা সেবনে বাধা পাওয়ায় তাঁরা হত্যার ঘটনা ঘটিয়েছেন বলে পুলিশ যে বক্তব্য দিয়েছে, তা গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন না বাদী গোপীনাথ চক্রবর্তী। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘পুলিশের এই বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। এর পেছনে বড় কোনো চক্র আছে। পুলিশ যদি বলে, এই দুজনে জড়িত আর কেউ নয়; তাহলে কার বিচার কে করবে। ওইটা যদি পুলিশের শেষ কথা হয়, তাহলে বিচার কীভাবে সুষ্ঠু হবে। ডিবি, সিআইডি, পিআইবি—তাহলে এরা কী করে।’

রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব আইনজীবী পলাশ কান্তি নাগ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘প্রতিটি মামলার এজাহার অভিযোগকারীর কথা অনুযায়ী লিখিত হওয়ার কথা। এ ক্ষেত্রে অভিযোগকারী জানেই না, সেখানে কী লেখা আছে। এজাহারের বক্তব্য, ঘটনাস্থলসহ পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। কাজেই সার্বিকভাবে অনেক প্রশ্ন সামনে আসছে। তাই এ ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রয়োজন।’

দেশ রূপান্তর

‘আর্দ্রতার ফাঁদে কৃষক’—এটি দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার দোড়া ইউনিয়নের ধোপাবিলা গ্রামের কৃষক রুহুল আমিন। এবার সাড়ে ৩ বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন তিনি। ধানও পেয়েছেন প্রায় ৬০ মণ। বাজারে সেই ধান বিক্রি করেছেন ১ হাজার ১২০ টাকা মণ দরে। অথচ তারই ভোটার আইডি কার্ড ব্যবহার করে একটি চক্র ১ হাজার ৪৪০ টাকা কেজি দরে সরকারের কাছে দুই টন ধান বিক্রি করেছেন।

তার আগে সোনালী ব্যাংকের কোটচাঁদপুর উপজেলা শাখায় গত ২৪ মে একটি নতুন হিসাব খোলেন রুহুল আমিন। এদিনই ব্যাংক থেকে একটি এক পাতার চেক ইস্যু করে দেওয়া হয় এই কৃষকের হাতে। তাতে স্বাক্ষর করার পর সঙ্গী প্রতিবেশী চাচা আব্দুর রহমান চেকটি নিয়ে নেন। এ সময় আব্দুর রহমানের সঙ্গে ছিলেন কোটচাঁদপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত আলীর ভাতিজাসহ আরও তিন দলীয় কর্মী। তারা ব্যাংক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথে সিঁড়িতে এক হাজার টাকার একটি নোট রুহুল আমিনের হাতে দিয়ে চেকটি নিয়ে নেন। রহস্যময় এই ঘটনার সূত্র ধরে অনুসন্ধানে নামে দেশ রূপান্তর। কথা বলে বোঝা যায়, কৃষক রুহুল আমিন শুধু জানতেন, সরকারের একটি লটারিতে এক হাজার টাকা পেয়েছেন, যা তোলার জন্য ব্যাংক হিসাব খুলতে হবে। তার আগে এই কৃষকের ভোটার আইডি কার্ড নিয়ে কৃষি অফিসে জমা দিয়েছিলেন আব্দুর রহমান। সরকারি গুদামে ধান বিক্রির জন্য কৃষি অফিসের লটারিতে ১৬০১ নাম্বার সিরিয়ালে নিবন্ধিত কৃষক রুহুল আমিনের নাম আসে। কিন্তু এসবের কিছুই জানতেন না এই কৃষক। আব্দুর রহমান তাকে শুধু জানান, সরকারের একটি লটারিতে তার নাম উঠেছে এক হাজার টাকা পাওয়ার। সে কারণেই সোনালী ব্যাংকে হিসাব খুলে সেদিন এক হাজার টাকা নিয়ে ফিরে আসেন তিনি।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে উঠে আছে, সোনালী ব্যাংকের উল্লিখিত শাখায় শুধু রুহুল আমিনই নন, গত মে মাসের ২০ তারিখের পর থেকে জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত ৩০০ জনেরও বেশি কৃষক ১০ টাকার একটি করে নতুন হিসাব খুলেছেন। কেউ কেউ না জেনে এবং কেউ জেনেই এই ফাঁদে পড়েছেন। এদের বেশিরভাগই এক-দুই হাজার টাকা করে নগদ পেয়েই সন্তুষ্ট; কিন্তু তারা জানতে পারেননি, তাদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খেয়েছে একটি সুবিধাভোগী চক্র। কৃষকদের নাম ব্যবহার করে সরকারের কাছে ধান বিক্রি করে লাভবান হয়েছে প্রভাবশালী চক্রটি।

অনুসন্ধান বলছে, সরকারের ঘরে ধান বিক্রির সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে কৃষক ঠকানোর এই কাজ চলে আসছে বছরের পর বছর। আর এই প্রতারণার সুযোগ করে দিয়েছে সরকারেরই বেঁধে দেওয়া এক মাপকাঠি ধানের ময়েশ্চার বা আর্দ্রতার মানদ-। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, প্রভাবশালী দালালগোষ্ঠী ও খাদ্য অধিদপ্তরের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই প্রতারণার কৌশলটি জিইয়ে রেখেছেন মিলেমিশে।

এই কারণে রুহুল আমিনের নামে বিএনপি নেতা লিয়াকত আলীর লোকজন কোটচাঁদপুর খাদ্যগুদামে ধান বিক্রি করেছেন ১ হাজার ৪৪০ টাকায়, যখন রুহুল আমিন নিজের জমির ধান স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেছেন ১ হাজার ১২০ টাকা মণ দরে।

জানতে চাইলে আব্দুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোটচাঁদপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত আলীর জন্য এই কাজ করে দিয়েছি। একই দলের লোক হওয়ায় কাজটি করেছি; এখানে আমার কোনো স্বার্থ ছিল না। কৃষক রুহুলের অ্যাকাউন্ট খোলার দিনেই ব্যাংকের চেকটি লিয়াকত আলীর কর্মী যারা সেখানে ছিলেন, তারা নিয়ে গেছেন।’

প্রতিবেদকের অনুসন্ধানের খবর খাদ্যগুদামের কর্মকর্তা ও লিয়াকত আলীর কানে যাওয়ার পর থেকেই রুহুল আমিনের বাড়িতে পরপর তিনদিন ৫ থেকে ৬ জন করে ব্যক্তি হাজির হয়েছিলেন কিছু কাগজে তার স্বাক্ষর নেওয়ার জন্য। রুহুল আমিন এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘বাড়িতে খাদ্যগুদামের লোকজন ও নেতাকর্মী মিলিয়ে ৬ জনের একটি দল এসেছিল। সরকারি কিছু কাগজপত্র দেখিয়ে তাতে একটি সই দিতে বলেন। বারবার বলেছেন ঝামেলা মিটিয়ে ফেল কিছু টাকা নাও। কিন্তু আমি রাজি হইনি।’

বাংলাদেশ প্রতিদিন

দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরোনাম ‘সংকটের নেপথ্যে স্যাবোটাজ’। খবরে বলা হয়, হঠাৎ করেই দেশজুড়ে ব্যাপক বিদ্যুৎ ও গ্যাসসংকট কেন? ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কেন এত সংকট হয়নি? বিদায়ি দুই সরকারের আমলের মতো স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় না থাকার কারণ কী? এর পেছনে ‘অন্য কিছু’ আছে কি না সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে জনমনে। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অনুসন্ধানে নামে বাংলাদেশ প্রতিদিন। অনুসন্ধানে জানা গেছে পর্দার আড়ালে গভীর রাজনৈতিক ‘স্যাবোটাজ’-এর তথ্য। দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে আবার মাঠে আসার সুযোগ তৈরি করতে চায়। পর্দার আড়ালে মুখ্য ভূমিকা রাখছেন সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহে স্বল্পতার বাইরেও বিদ্যুৎসংকটের পেছনে রয়েছে পতিত আওয়ামী লীগসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের স্যাবোটাজ। তেল নিজেদের সংরক্ষণে রেখেও সরকারকে জিম্মি করে টাকা আদায়ের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রেখেছে বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র। তাদের সঙ্গে স্যাবোটাজে ইন্ধন দিচ্ছেন বিগত সরকারের আমলের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও নেতারা। তাঁদের পরামর্শে আওয়ামী লীগ সমর্থক সাবেক ও বর্তমান কতিপয় আমলা, পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করেপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) কর্মকর্তা এবং বিদ্যুৎ-গ্যাস খাতের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা এ স্যাবোটাজের নেপথ্যে ভূমিকা রাখছেন।

বিদ্যু বিভাগের হিসাব অনুসারে, বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট এবং সরবরাহ করা হচ্ছে গড়ে ১৫ হাজার মেগাওয়াট। মাসখানেক ধরে বিদ্যুতের সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে পার্থক্য সর্বোচ্চ ৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত ছাড়িয়ে গেছে; যা গত কয়েক বছরের মধ্যে রেকর্ড। এ বিদ্যুৎসংকটের কারণ হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাস, এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) ও কয়লাসংকটকে কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানান, যুদ্ধ পরিস্থিতির বাইরে প্রতিবেশী দেশের ভূমিকার কারণেও বিদ্যুৎ নিয়ে বড় ধরনের সংকটে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশটি প্রকাশ্যে বিদ্যুৎ দিলেও অন্য সহযোগিতার ক্ষেত্রে নেতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। আগামী ডিসেম্বরে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পর থেকেই বাংলাদেশে জ্বালানিসংকট প্রকট হয়েছে। এ সংকট সৃষ্টির পেছনে জ্বালানি নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করতে ফ্যাসিস্ট সরকারের সমর্থক ও সুবিধাভোগী বিভিন্ন মহল তৎপর রয়েছে। বিগত সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু লীগ সমর্থক বিভিন্ন আমলার কাছে টেলিফোনে যোগাযোগ করে দেশে বিদ্যুৎসংকট সৃষ্টি করায় ইন্ধন দিচ্ছেন।

সূত্র জানান, বাইরে অবস্থান করা নসরুল হামিদ বিপুর দেশের বিদ্যুৎব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগ রয়েছে। বিপুর নির্দেশে বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে তাঁর সঙ্গে থাকা কিছু প্রভাবশালী আমলা এখনো পর্দার আড়ালে এ খাত অস্থির করে তুলতে অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ভিতরের একটি চক্র বিশেষ করে প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে বিগত সরকারের থেকে সুবিধাভোগী একটি গোষ্ঠী, বিপিসি ও পেট্রোবাংলার কিছু কর্মকর্তা এবং বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শেরও একটি মহল এ সরকারকে ব্যর্থ করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিদ্যুৎসংকটের আড়ালে দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার চেষ্টা করছে।

এদিকে বিদ্যুৎসংকট চূড়ান্ত পরিস্থিতিতে যাওয়ার পর সরকারের কাছে বকেয়া দাবি করেছে দেশের বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মালিকরা। এর আগে দুই সরকারের কাছে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকরা বিভিন্ন সময় তাঁদের বকেয়া টাকা দাবি করেও পাননি। কিন্তু বর্তমান সরকার দায়িত্বে আসার ছয় মাসের মধ্যেই তাঁদের এ টাকা দেওয়ার উদ্যোগ নেয়।

সূত্র জানান, এ সংকটময় পরিস্থিতিতে অতীত সরকারের আমলের বকেয়া দাবির পেছনেও আছে সাবেক প্রতিমন্ত্রী বিপুর সৃষ্ট সিন্ডিকেট। বিপুর আমলে সুযোগ পাওয়া এসব বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র নামে-বেনামে তৎকালীন সরকারের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। এরই মধ্যে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কিছু কোম্পানির মালিকরা ক্যাপাসিটি চার্জ শোধ এবং ‘কমিশনের’ ভাগ পেতে সরকারের সঙ্গে দেনদরবার শুরু করেছেন। এ সিন্ডিকেটটি সচিবালয়ে প্রশাসনের ভিতরের আওয়ামী সরকারের লেজুড়বৃত্তি করা একটি অংশ এবং বিরোধী দল মতাদর্শের আরেকটি গোষ্ঠীর একটি জোট নিয়ে গঠিত হয়েছে। তারা সংকটময় পরিস্থিতিতে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এদের চক্রান্তেই বিদ্যুৎসংকট আরও বাড়িয়ে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে জনরোষ গড়ে তোলার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ প্রাইভেট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের বকেয়া টাকা পরিশোধ করলে এখনই আমাদের কাছে যে তেল সংরক্ষণ আছে, সেটিও কাজে লাগাতে বা বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেল বাড়িয়ে দিতে পারব। আমরা সরকারকে ৫ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ দিতে রাজি আছি। আবার সরকার আমাদের টাকা দিলে তেল আনতে সিঙ্গাপুর থেকে তিন সপ্তাহ লাগবে।’

বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় সূত্র জানান, এর আগে সব সরকারের আমলে অনুমোদন পাওয়া বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সরকারকে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে তাদের ৫০টির ওপর বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন চালানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় গ্রিডে সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ সংযুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে আগামী তিন দিনের মধ্যে তাদের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত না হলে দেখা দেবে নতুন প্রশ্ন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থা একটি নির্দিষ্ট নিয়মের গতিতে চলে। ক্ষমতাচ্যুত ও অন্তর্বর্তী সরকারের দুই বছরে লোডশেডিং কম থাকলেও বিএনপি সরকার আসার পর হঠাৎ বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের এ সংকট প্রশ্ন তুলেছে। সেখানে মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে সংকট সৃষ্টি প্রশ্নের উদ্রেক করে। এর পেছনে কারা আছে, তা তদন্তের দাবি রাখে।