সরকারের ঘোষণা, পুলিশের ব্যবস্থা, অভিযান কোনো কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার উৎপাদন, বাজারজাত প্রক্রিয়া। অবৈধভাবে স্থাপিত হাজারো চার্জিং পয়েন্ট বা গ্যারেজ চলছে প্রকাশ্যে। উৎপাদন ও চার্জিং এর ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ না থাকায় পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে। প্রতিদিনই সড়কে নামছে শত শত নতুন রিকশা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পাড়া-মহল্লার ওয়ার্কশপ, গ্যারেজেই তৈরি হচ্ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। আবার কোম্পানির নাম দিয়েও তৈরি করা হচ্ছে রিকশা। এসব রিকশা বিক্রির শো-রুমও আছে। ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জের জন্য পাড়ায় পাড়ায় গড়ে উঠেছে গ্যারেজ। এসব গ্যারেজ চলে অবৈধভাবে।
রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, এলাকাটির বেশির ভাগ গ্যারেজেই দেদারছে তৈরি হচ্ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। লেদ মেশিন দিয়ে ঝালাই দিয়ে তৈরি করে আনা হচ্ছে বিশেষ আকৃতির বডি, সিটের নিচের অংশ। এরপর মোটর, বিভন্ন প্রকার ইলেক্ট্রনিক তার, পার্টস সংযুক্ত করে রূপ দেয়া হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ অটোরিকশায়। এরপর রিকশা আকর্ষণীয় করে তুলতে তাতে আঁকা হচ্ছে বিভিন্ন রঙের চিত্র। যার এক একটি বিক্রি করা হচ্ছে ৭৫ থেকে ৮৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। শিকদার মেডিকেল কলেজের অদূরে গাবতলী-সদরঘাট মেইন রাস্তার পাশেই গড়ে উঠেছে সারি সারি অটোরিকশার ওয়ার্কশপ। দিনে-রাতে এসব ওয়ার্কশপে শত শত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা তৈরি করা হচ্ছে। কেউ আবার রিকশা তৈরি করে থরে থরে সাজিয়ে রেখেছে। আর এসব রিকশা তৈরিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একাধিক লেদ মেশিনের দোকান। কেউ আবার খুলেছেন রিকশা তৈরি পার্টসের দোকান।
আর এসব রিকশা তৈরির জন্য বাইরে থেকে লোক ভাড়ায় নিয়ে আসা হচ্ছে। হাজারীবাগ ঝাউচর এলাকার ওয়ার্কশপের মালিক মো. রশিদ মানবজমিনকে বলেন, বর্তমানে এই অটোরিকশার চাহিদা অনেক। আগে যারা মানুষের বাসায় দারোয়ান ছিল, সিকিউরিটি গার্ড ছিল বা দোকানে কর্মচারীর কাজ করতো তারা সকলেই টাকা-পয়সা ধার-দেনা করে, ঋণ নিয়ে অটোরিকশা কিনে নিচ্ছে। প্যাডেলের রিকশার মতো এটা চালাতেও তো বেশি কষ্ট হয় না। চাহিদা এতোটাই বেড়েছে যে, আমাদেরকে আগে থেকেই রেডি করে রাখতে হচ্ছে। তিনি বলেন, সাধারণত তিন ধরনের অটোরিকশা তৈরি করি আমরা। নৌকা, পালকি ও মিশুক। নৌকা মডেলের একটা রিকশা আমরা ৭৫ থেকে ৭৬ হাজার টাকায় বিক্রি করি। পালকি মডেল বিক্রি হয় ৮০ থেকে ৮২ হাজার টাকা। আর ‘মিশুকের’ দাম একটু বেশি। ১ লাখ ৫ হাজার থেকে ১ লাখ ১২ হাজার টাকা। তিনি বলেন, আগে তো এসব রিকশা তৈরির পার্টস স্টেডিয়াম মার্কেটে গিয়ে কিনে আনতে হতো। কিন্তু এখন সবকিছু হাতের নাগালেই পাওয়া যায়। ওই এলাকার প্রায় প্রতিটি ঘরেই একই ভাবে তৈরি করা হচ্ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। রয়েছে অটোরিকশার শোরুমও।
অটোরিকশার শোরুম মালিক মো. মাসুদ বলেন, শুধু ঢাকাতেই নয়, আমাদের তৈরি করা অটোরিকশা বিভিন্ন জেলা শহর ও গ্রামেও যাচ্ছে। মানুষ ট্রাকভরে নিয়ে যায়। সরকারের পক্ষ থেকে বিধি-নিষেধ আছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কিসের নিষেধ। কোনো নিষেধেই এখন আর কাজ হবে না। বর্তমানে লাখ লাখ মানুষ এই পেশার সঙ্গে জড়িত। এটা যদি বন্ধ করে দেয় তাহলে তারা কোথায় যাবে?
এদিকে লাখ লাখ রিকশা প্রতিদিন ঢাকার বিভিন্ন রিকশা গ্যারেজে চার্জ করা হচ্ছে।
রায়েরবাজার এলাকায় এমনই এক গ্যারেজ মালিক রিয়াজ আহমেদ। তিনি বলেন, প্রতিদিন আমার গ্যারেজে ৮০টি রিকশা চার্জ করা হয়। এক একটি রিকশায় ১২ ভোল্টের মোট ৪টি ব্যাটারি থাকে। সব মিলে ৪৮ ভোল্ট চার্জ হতে ৩/৪ ঘণ্টা সময় লাগে। আমার ব্যক্তিগত যেগুলো আছে তাদের কাছ থেকে ৬০টা করে নিই। বাইরেরগুলো চার্জ দিতে ১শ’ টাকা লাগে। শুধু হাজারীবাগ, বেড়িবাঁধ, রায়েরবাজার নয়, রাজধানীর মোহাম্মদপুর, বসিলা, শেখেরটেক, শ্যামলী, খিলগাঁও, তেজগাঁও, বেগুনবাড়ী, মিরপুর, ইসিবি, মান্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে শত শত রিকশার গ্যারেজ ও ওয়ার্কশপ।
কোন এলাকায় কত গ্যারেজ: ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ১০টি অপরাধ বিভাগের ৮টিতে ব্যাটারিচালিত বৈধ চার্জিং স্টেশন থাকলেও প্রায় ৪৮ হাজার ১৩৬টি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট ও ৯৯২টি গ্যারেজ রয়েছে। এর মধ্যে মিরপুর ডিভিশনের ৭ থানায় আছে ৩ হাজার ৯৮৩টি চার্জিং পয়েন্ট ও ২৫৯টি গ্যারেজ। ওয়ারী ডিভিশনে রয়েছে ৩ হাজার ৫১৬ চার্জিং পয়েন্ট ও ১৩৬টি গ্যারেজ। গুলশান ডিভিশনে রয়েছে ২ হাজার ৬৪৩ চার্জিং পয়েন্ট ও ১২৮টি গ্যারেজ। উত্তরা ডিভিশনে ১ হাজার ৩০৫ চার্জিং পয়েন্ট ও ৭২টি গ্যারেজ। মতিঝিল ডিভিশনে ১ হাজার ৩৯০ চার্জিং পয়েন্ট ও ৬০টি গ্যারেজ। লালবাগ ডিভিশনে ১৯৯ চার্জিং পয়েন্ট ও ৭৭টি গ্যারেজ। তেজগাঁও ডিভিশনে মোট ২৩৪ এবং রমনা ডিভিশনে অন্তত ২৬টি অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার গ্যারেজ রয়েছে। এসব গ্যারেজের প্রতিটিতে দিনে অন্তত ৮০ থেকে ১৫০টি রিকশা রাখা হয়। আর এসব গ্যারেজে প্রতিটি রিকশার ব্যাটারি চার্জের জন্য দিনে অন্তত ৬ থেকে ৮ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে। সে হিসাবে প্রতিদিন শুধু ঢাকা শহরেই ১২ থেকে ১৫ লাখ অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ করতে জাতীয় গ্রিড থেকে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হয়ে যাচ্ছে। আর এসব অবৈধ অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ করার জন্য খোদ মন্ত্রণালয় থেকেই ৩ হাজার ৩০০ চার্জিং স্টেশনের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ডিপিডিসি’রই ২ হাজার ২০১টি বৈধ চার্জিং স্টেশন রয়েছে। যেখানে প্রতিদিন গড়ে ডিপিডিসি’র মোট চাহিদার প্রায় ২৬ দশমিক ১৬২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে। তবে মন্ত্রাণলয়ের এই বৈধ চার্জিং স্টেশনের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি রয়েছে অবৈধ রিকশার ব্যাটারি চার্জিং স্টেশন।
খাতা-কলমেই ব্যবস্থা: ব্যাটারিচালিত অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সিটি করপোরেশন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), ঢাকা মহানগর পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন এবং বিদ্যুৎ ও পরিবেশ-সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিভিন্নভাবে আলাদা আলাদা ও যৌথভাবে মাঝে-মধ্যে অভিযান চালালেও আদতে তা কাজে আসছে না। এদিকে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশাকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ না করে নির্দিষ্ট কারিগরি মানের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সহায়তায় নির্ধারিত নকশা ও কারিগরি মান অনুসরণ করে যান তৈরির উদ্যোগের কথাও বিভিন্ন সময়ে জানানো হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও অনুমোদিত নকশা ও নির্ধারিত কারিগরি মান অনুসরণ করে ব্যাটারিচালিত রিকশা তৈরির বিষয়ে উদ্যোগের কথা জানিয়েছিল। একই সঙ্গে অনুমোদনহীন কারখানা ও চার্জিং স্টেশনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে এর কোনো উদ্যোগই চোখে পড়েনি। উপরন্তু সিটি করপোরেশনের ডিজাইনের বিপক্ষে আন্দোলনে নামে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালকরা।
এসব বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. মাসুদ করিম বলেছেন, যন্ত্রচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে কাজ চলছে। এ নিয়ে একটি নীতিমালা তৈরির কাজও চলছে। সমস্যাটির স্থায়ী সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ও গুরুত্ব দিচ্ছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে ডিএমপি’র ট্রাফিক বিভাগ সবসময় চেষ্টা করছে। প্রায় প্রতিদিনই রাজধানীতে অন্তত ৫০০টি অটোরিকশা ডাম্পিং করা হচ্ছিল। এরপরও অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, এখন সরকার একটি পদক্ষেপ নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে আমাদের অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
