আলোচনায় মক্কা চুক্তি। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে হওয়া এই চুক্তি কূটনৈতিক দুনিয়ায় আগ্রহ তৈরি
হয়েছে। প্রতিরক্ষা এই জোটে বাংলাদেশ যাবে কিনা তা নিয়েও উৎসুক কয়েকটি দেশ। প্রতিরক্ষা এই জোটে যোগ দেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ইতিবাচক। সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক ব্রিফিংয়ে এ বিষয়ে প্রশ্নের মুখে প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ।
গত ৭ই আগস্ট মক্কায় অবস্থিত মসজিদুল হারাম প্রাঙ্গণে এই যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ এবং তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান। ধর্মীয় দিক থেকে এই চুক্তির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এই চুক্তিকে মুসলিম দেশগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলে ধরতে বার হিসেবে শুক্রবার এবং স্থান হিসেবে মক্কাকে বাছাই করা হয়েছে। এদিকে চুক্তিটিকে ঐতিহাসিক বলে বর্ণনা করেছে জোটভুক্ত দেশগুলো।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের ভাষ্য, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আমরা আগ্রহ প্রকাশ করেছি। মক্কার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের সম্পর্ক আবেগের। মক্কা বাংলাদেশের হৃদয়ে, মানুষের হৃদয়ে। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন বাংলাদেশের নেতৃত্বের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বকে বিভিন্ন জায়গা থেকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। হুমায়ুন কবির বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যদি ইসলামিক দেশগুলোর মধ্যে কোনো নিরাপত্তা চুক্তি হয়, তাহলে সেখানে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ অস্বাভাবিক হবে না। সুতরাং, দেখা যাক। বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে।
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা জোটের দেশগুলো মুসলিম বিশ্বে প্রভাবশালী হিসেবে বিবেচিত। মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম দেশগুলোর কাছে সৌদি আরবের বিশেষ অবস্থান রয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তান মুসলিম বিশ্বে একমাত্র দেশ যাদের পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানকে নিয়ে কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করে সৌদি আরব। মক্কা চুক্তিকে সেই চুক্তিরই পরবর্তী সংস্করণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তৃতীয় দেশ হিসেবে এই জোটে যুক্ত হয়েছে তুরস্ক। আঙ্কারার এই যোগদান মক্কা চুক্তিতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, যেহেতু তুরস্ক বিশ্বের সর্ববৃহৎ সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য তাই মক্কা চুক্তিতে দেশটির উপস্থিতি অন্যদের বাড়তি সাহস যোগাচ্ছে।
ভারত কি উদ্বিগ্ন- এমন প্রশ্নে সরাসরি উত্তর এড়িয়ে গেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তাকে প্রশ্ন করা হয়, সামরিক চুক্তি হিসেবে মক্কা চুক্তি নিয়ে ভারত উদ্বিগ্ন কিনা। জবাবে জয়শঙ্কর বলেন, চুক্তিটিকে প্রতিরক্ষা চুক্তি বলা হলেও এর স্বাক্ষরকারী দেশগুলো ইতিমধ্যে বিভিন্ন সক্রিয় সামরিক পরিস্থিতির মুখোমুখি। এসব পরিস্থিতিতে চুক্তিটি এখন পর্যন্ত কী করেছে, সে প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার ভাষায়, সব স্বাক্ষরকারী দেশ যে সবসময় একে অপরের সহায়তায় এগিয়ে এসেছে, তা নয়। সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ব্রিফিংয়ে মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানের বিষয় নিয়ে জানতে চান সাংবাদিকরা। সেখানে মন্ত্রণালয়টির মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালও সরাসরি মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন। তিনি বলেন, ভারত পশ্চিম এশিয়ার ঘটনাপ্রবাহ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
এদিকে ঢাকার কূটনৈতিক মহলের খবর, বাংলাদেশ যেন মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ না দেয় সে বার্তা দিতেই গত ৯ই আগস্ট ঢাকায় আসেন ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং)-এর প্রধান পরাগ জৈন। তার চারদিন আগে দিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন ঘিরে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে টানাপড়েন শুরু হয়। ছেদ ঘটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের আলোচনায়। সফরের বিষয়টি এখন পুরোপুরি থমকে আছে। ভারতের তরফে তোড়জোড় থাকলেও নিজের সিদ্ধান্তে অটল ঢাকা। কূটনৈতিক সূত্রের খবর, প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরে নিতে দিল্লির তোড়জোড়ের পেছনে মক্কা চুক্তিতে ঢাকার যোগ দেয়ার সম্ভাব্যতার প্রচ্ছন্ন ছাপ রয়েছে। ঢাকা যেন ওই চুক্তিতে না যায়- সফরের মাধ্যমে এ বিষয়টি নিশ্চিত হতে চায় দিল্লি। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, ঢাকার এই চুক্তিতে যাওয়া উচিত। কেননা, চির শত্রু পাকিস্তানের পাশাপাশি বাংলাদেশও যদি এই জোটে যোগ দেয় তাহলে ভারতের প্রতিরক্ষার হিসাবনিকাশ পুরোপুরি পাল্টে যাবে।
চুক্তিতে কি আছে: এতে বলা হয়েছে, জোটভুক্ত কোনো একটি দেশ সামরিক হামলার শিকার হলে তা সকল দেশের ওপর হামলা বলে বিবেচিত হবে। নির্দিষ্ট কোনো দেশ বা সরকারকে লক্ষ্য করে এই চুক্তি হয়নি। এর মাধ্যমে কোনো একটি দেশের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য আগ্রাসন ঠেকাতে সম্মিলিত প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নেয়া হয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বলেছে, চুক্তিটি জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত আত্মরক্ষার অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। চুক্তিতে তিন দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সব ক্ষেত্র আরও জোরদার করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে তিন দেশের সম্মিলিত নিরাপত্তা শক্তিশালী করা এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ অঞ্চল ও তার বাইরের শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রকাশ্য সরকারি ঘোষণায় কোনো দেশের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক সেনা, যুদ্ধবিমান বা অস্ত্র মোতায়েনের বাধ্যবাধকতা কিংবা আক্রান্ত হলে কী ধরনের সামরিক প্রতিক্রিয়া দিতে হবে- তা নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে চুক্তিটির রাজনৈতিক ধারণাগত মিল থাকলেও, প্রকাশিত নথিতে ন্যাটোর মতো বিস্তারিত সামরিক প্রতিশ্রুতির কাঠামো দেখা যায় না। চুক্তিটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর প্রতিরক্ষামূলক চরিত্র। পাকিস্তান বলেছে, চুক্তিটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয়। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানও জানিয়েছেন, চুক্তিতে ইরান বা অন্য কোনো দেশকে অভিন্ন হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।
