‘বাবা হয়েও বাবা হওয়ার স্বাদ পেলাম না’ নুসরাত হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়ে খালাস পাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেয়া এক আবেগঘন স্ট্যাটাসে দীর্ঘ কারাবাসের সময়ে এমন কষ্টের কথা তুলে ধরেছেন আসামি কামরুন নাহার মণির স্বামী রাশেদুল আলম খান। সাত বছর বয়সী মেয়েকে কাছে না পাওয়ার যন্ত্রণা, কারাগারের জানালার ফাঁক দিয়ে তাকে ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা, দূরত্বের কারণে মেয়ের কাছে অপরিচিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এবং দীর্ঘদিন পর মেয়ের সামনে দাঁড়ানোর উৎকণ্ঠার কথা জানিয়েছেন তিনি। গত সোমবার নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার রায় ঘোষণার পর নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক আইডিতে এ স্ট্যাটাস দেন তিনি। রাশেদুল আলম লিখেন, বাবা হয়েও বাবা হওয়ার স্বাদ পেলাম না আজও আমি! খুব ইচ্ছা করতো মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরার জন্য, সুযোগ ছিল না কড়া নিরাপত্তার জন্য। জানালার ফাঁক দিয়ে ছোট্ট পায়ের আঙ্গুল ছুঁয়ে দিতাম।
মুখে হাত লাগিয়ে আদর করতাম, তাও দূর থেকে। কাশিমপুর চলে যাওয়ার পরে মাঝখানে ২ ফুট গ্যাপের খাঁচা, ঠিকমতো মেয়েটা দেখতেই পারে না আমাকে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতো সেই নয়নজুড়ানো কালো দু’টি চোখে। আমাকে চিনতো না সে, চিনবেই বা কেমনে, দেখাই তো যায় না খাঁচার ভেতর দিয়ে। এভাবেই সময় অতিবাহিত হচ্ছিল। তিনি আরও লিখেন, আজ প্রায় অনেকদিন মেয়েটার সঙ্গে দেখা হয় না, শুক্রবারে একটু কথাও হয় না মোবাইলে। বুকের ভেতর চাপা কষ্ট কোনোদিন কাউকে বুঝতে দিইনি।
আমি মাঝে মাঝে ভাবতাম, যে ক্ষতি নিজের আমি করেছি, কোনোদিন আমাকে আমি যদি ক্ষমা করতে চাই, পারবো? ১৯ সালে প্রশাসন দ্বারা মারা গেলে কিংবা আমাকে গুম করে ফেললে কী হতো? শুধু মেয়েটাকে কোলে নেবো, ইচ্ছামতো আদর করব-এই আশায় বুক বেঁধে ছিলাম। ঝড় থেকে যাদের রক্ষা করতে ছাতা নিয়ে ঝড়ের মধ্যে দৌড়েছি, তারাও দরজা বন্ধ করে আমাকে ঝড়ের মধ্যে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। কষ্ট একদিক থেকে পাইনি, এমন অবস্থা হয়েছে, এখন সব সয়ে গেছে আমার। মেয়েটা ফিরে আসুক, বাবা হওয়ার প্রথম স্পর্শ, প্রথম আলিঙ্গন বুকটা ভরিয়ে দিক। আর কিছুই চাওয়ার নেই আমার। মেয়েকে নিয়ে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে রাশেদুল আলম খান লেখেন, এই সেপ্টেম্বরের ২১শে তারিখ রাথির ৭ বছর পূর্ণ হবে। তাকে ছাড়া ১৪টা ঈদ, ৭টা জন্মদিন আমি পার করেছি। কী নিষ্ঠুর বাবা আমি। মেয়েটার জন্য কিছুই করতে পারিনি আমি। আমার প্রতিটা মুহূর্তের এক আল্লাহ্ সাক্ষী আছেন।
জানি না আমাকে চিনবে কিনা রাথী, জানি না আমি কীভাবে তার সামনে দাঁড়াবো। অস্থির অস্থির লাগছে আমার। এর আগে, ২০১৯ সালের ৬ই এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার সাইক্লোন সেন্টারের ছাদে নুসরাত জাহান রাফির গায়ে আগুন দেয়া হয়। ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তার বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। পরে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়। পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় নুসরাত হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর কারাগারেই ঠাঁই হয়েছিল অন্তঃসত্ত্বা মণির। ওই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর মণির প্রসববেদনা উঠলে কারা কর্তৃপক্ষের সহায়তায় ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে কন্যাসন্তানের মা হন মণি। হাসপাতালে দুইদিন বাবা-মাসহ পরিবারের সান্নিধ্য পায় শিশুটি। এরপর থেকে মায়ের সঙ্গে কারাগারের অন্ধ কুঠুরিতে দিন কাটে শিশুটির। পরবর্তীতে নিম্ন আদালতে শুধু নিজেই এই রায় শোনেননি, রায় শুনেছেন তার এক মাস বয়সী নবজাতকও।
শিশুটির নাম রাখা হয় মোবাশ্বিরা খানম রাথী। মণির স্বামীর দাবি, নুসরাত জাহান রাফির নামানুসারে তার নাম রাখা হয়েছিল। যদিও মণি তার মেয়েকে ‘রোজা’ নামে ডাকেন বলে জানা গেছে। ২০১৯ সালের ২৪শে অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এ মামলার ১৬ আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড দেন। এরপর আসামিরা হাইকোর্টে আপিল ও জেল আপিল করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে সোমবার দুপুরে নুসরাত হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের ওপর রায় ঘোষণা করেন হাইকোর্টের বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কেএম রাশেদুজ্জামান রাজার বেঞ্চ। রায়ে তৎকালীন মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। চার আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১০ আসামিকে খালাস দেয়া হয়েছে। খালাস পাওয়া ১০ আসামির একজন কামরুন নাহার মণি।
