মিডা আইনের কয়েকটি ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ, হাইকোর্টের রুল

মিডা আইনের কয়েকটি ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ, হাইকোর্টের রুল

ফন্ট সাইজ:

পরিবেশ সংরক্ষণ, ভূমি ও জীবিকার অধিকার এবং স্থানীয় সরকারের ওপর ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের অভিযোগে মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (মিডা) আইন, ২০২৬-এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারার সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করা হয়েছে। এ রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো কেন অবৈধ, অসাংবিধানিক ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। মঙ্গলবার বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি এস এম ইফতেখার উদ্দিন মাহমুদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল জারি করেন।

মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (মিডা) আইন, ২০২৬-এর ৭, ৮, ১০, ১১, ১৩, ১৪, ১৫, ২০ ও ২৪ ধারা চ্যালেঞ্জ করে রিটটি দায়ের করেন লইয়ার্স ফর এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (লিড) এবং উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন)। রিটের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ আল নোমান। শুনানিতে আবেদনকারীদের পক্ষে অংশ নেন অ্যাডভোকেট মনিরা হক মনি।

রিট আবেদনে বলা হয়, আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোর মাধ্যমে মহেশখালীর উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা, ভূমি ব্যবহার, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণের বিস্তৃত ক্ষমতা একটি বিশেষায়িত নির্বাহী কর্তৃপক্ষের হাতে কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে। এতে সংবিধানের ১৮(ক), ২৭, ৩১, ৩২, ৩৬, ৪০, ৪২, ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত মৌলিক অধিকার ও স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের সাংবিধানিক নিশ্চয়তা ক্ষুন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আবেদনে আরও বলা হয়, মহেশখালী উপকূলীয়, জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ একটি পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল অঞ্চল। অথচ মিডার ১২ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের কোনো প্রতিনিধিত্ব রাখা হয়নি। ফলে পরিবেশ, প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় রাষ্ট্রের সাংবিধানিক অঙ্গীকার যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।

রিটকারীদের ভাষ্য, মিডার কার্যক্রম অবশ্যই সংবিধান, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫, পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭ এবং প্রচলিত ভূমি ও পরিবেশ আইনের অধীন হতে হবে। কোনো শিল্প বা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিবেশগত ছাড়পত্রের বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ রাখা যাবে না।

রিটে বলা হয়, মিডার কাঠামোতে স্থানীয় জনগণ ও ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায়ের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ভূমি, জীবিকা, পরিবেশ ও বসবাসের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে জনপরামর্শ, জনশুনানি ও আপত্তি জানানোর পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকা গণতান্ত্রিক ও অংশগ্রহণমূলক শাসনের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

আবেদনে আরও বলা হয়েছে, ১০, ১১, ১৩, ১৪ ও ১৫ ধারার মাধ্যমে মিডাকে উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা, ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা, ভূমির ওপর বিধিনিষেধ এবং বিভিন্ন বিধি-নিয়ন্ত্রণ আরোপের ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব ক্ষমতা প্রয়োগের আগে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিমালিকদের শুনানি, তথ্য প্রকাশ, জনশুনানি কিংবা আপত্তি জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা রাখা হয়নি।

এতে ভূমি, সম্পত্তি, বসতি, জীবিকা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নির্বাহী সিদ্ধান্তের বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন রিটকারীরা।
রিটে বলা হয়, মহেশখালীর অর্থনীতি ও সামাজিক জীবন লবণ চাষ, মাছ ধরা, চিংড়ি চাষসহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী পেশার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। লবণ মাঠ ও জীবিকানির্ভর জমি শিল্প ও উন্নয়ন এলাকায় রূপান্তর করা হলে এসব পেশার ওপর নির্ভরশীল মানুষ তাদের দীর্ঘদিনের জীবিকা হারাতে পারেন। পর্যাপ্ত সুরক্ষা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ ছাড়া এ ধরনের হস্তক্ষেপ সংবিধানের ৪০ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত পেশা ও জীবিকার স্বাধীনতার অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

আবেদনকারীদের আরও দাবি, মিডার ক্ষমতা প্রয়োগের ফলে স্থানীয় জনগণের উচ্ছেদ, ঐতিহ্যবাহী পেশায় ব্যাঘাত, বসতিতে হস্তক্ষেপ এবং ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদে প্রবেশাধিকার হারানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এতে মানুষের জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মর্যাদার অধিকারও প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রিটকারীরা বলেন, উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো সম্প্রসারণ প্রয়োজনীয় হলেও তা সংবিধান, মৌলিক অধিকার, গণতান্ত্রিক শাসন, পরিবেশগত নীতি ও আইনের শাসনের সীমার মধ্যে হতে হবে। কোনো উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে এমন ক্ষমতা দেওয়া যায় না, যার মাধ্যমে সাংবিধানিক অধিকার খর্ব কিংবা নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সাংবিধানিক ভূমিকা দুর্বল হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

তাদের ভাষ্য, মিডার মাধ্যমে উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা, ভূমি ব্যবহার, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা একটি নির্বাহী কর্তৃপক্ষের হাতে কেন্দ্রীভূত হলেও এর বিপরীতে কার্যকর গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা, জনঅংশগ্রহণ ও প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়নি। এ কারণেই সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোর সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।