সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। এটি হলো, যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক নিরাপত্তা স্বার্থে দায়িত্ব পালনের জন্য একটি ‘মধ্যপ্রাচ্য’, ‘আরব’ বা ‘মুসলিম ন্যাটো’ গঠন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলপন্থী কিছু বিশ্লেষক এই চুক্তিকে তেলআবিবের বিরুদ্ধে একটি জোট হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। অন্যরা মনে করছেন, সৌদি ও তার আরব প্রতিবেশীদের পুরোপুরি সুরক্ষা দিতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতার পর দেশটি নতুন নিরাপত্তা নিশ্চয়তাদাতা খুঁজছে- এই চুক্তি তারই ইঙ্গিত।
তবে বাস্তবে মক্কা চুক্তি শীতল যুদ্ধের শুরুর দিক থেকেই চলে আসা একটি মার্কিন নীতির সর্বশেষ সংস্করণ মাত্র। সেই নীতির লক্ষ্য ছিল পশ্চিমাপন্থী বিদ্যমান শাসনব্যবস্থা, তাদের মার্কিন পৃষ্ঠপোষক এবং তাদের নীরব মিত্র ইসরাইলকে সুরক্ষিত রাখা।
অবাক হওয়ার মতো কিছু নেই- এই ব্যবস্থার প্রকৃত লক্ষ্য মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের শত্রুরাই।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প চুক্তিটিকে তাৎক্ষণিকভাবে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তিন দেশ ‘সম্প্রতি এবং শেষ পর্যন্ত’ চুক্তিতে সই করায় তিনি ‘খুবই খুশি’।
নতুন এই চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৫৫ সালে গঠিত সেন্ট্রাল ট্রিটি অর্গানাইজেশনের (সেন্টো) আদলে তৈরি হয়েছে। সংগঠনটি ‘বাগদাদ প্যাক্ট’ নামেই বেশি পরিচিত ছিল।
মক্কা চুক্তি ঘোষণার মাত্র কয়েক দিন আগে, গত ৩০ জুলাই সৌদি আরব আরও ১৩টি দেশকে নিয়ে একটি নতুন সামরিক জোট গঠন করে। দেশগুলো হলো, বাহরাইন, বাংলাদেশ, কোমোরোস, জিবুতি, মিসর, জর্ডান, কুয়েত, পাকিস্তান, কাতার, সোমালিয়া, সুদান, তুরস্ক এবং সৌদি-সমর্থিত এডেনভিত্তিক ইয়েমেন সরকার।
রিয়াদে গঠিত মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্সের (এমএমডিএ) লক্ষ্য, লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দাব প্রণালি এবং এডেন উপসাগরের নৌ ও জ্বালানি সরবরাহপথ নিরাপদ রাখা।
ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ বা হুতি আন্দোলনের নৌ অবরোধের হুমকি ও হামলার পরিপ্রেক্ষিতে এই জোট গঠন করা হয়। বাস্তবে এমএমডিএ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘অপারেশন প্রসপারিটি গার্ডিয়ান’-এরই উত্তরসূরি।
মক্কা চুক্তিতে মিসর ও জর্ডান নেই কেন?
তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ দুই মিত্র মিসর ও জর্ডান কেন নতুন মক্কা চুক্তিতে যোগ দেয়নি? মিসর এখনো বিষয়টি নিয়ে নিজেদের অবস্থান বিবেচনা করছে বলে জানা গেছে। তবে দুটি দেশের অনুপস্থিতি হয়তো এমন একটি আশঙ্কার ইঙ্গিত দেয়- বর্তমান চুক্তির সদস্যরা ভয় পাচ্ছে যে, মিসর বা জর্ডান ইসরাইলি আগ্রাসনের শিকার হলে তাদের সেখানে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে বলা হতে পারে।
ইসরাইলের অব্যাহত যুদ্ধংদেহী মনোভাব এবং দুই দেশের বিরুদ্ধেই চলমান হুমকির প্রেক্ষাপটে এমন পরিস্থিতির সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না।
বিকল্প নয়, বরং পরিপূরক
অন্যদিকে কিছু ইসরাইলপন্থী বিশ্লেষক মনে করছেন, নতুন চুক্তিটি ইসরাইল এবং সাম্প্রতিক আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের অংশীদারদের দুর্বল করে দিতে পারে। কারণ তাদের এই নতুন জোটে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ফেলো স্টিভেন এ কুক সরলীকৃতভাবে দাবি করেছেন, ট্রাম্পের ‘আপাতদৃষ্টিতে হঠকারী’ কর্মকাণ্ড এখন অঞ্চলটির কিছু দেশকে ভাবতে বাধ্য করেছে যে, শক্তিশালী হয়ে ওঠা ইরানের মুখোমুখি হলে তারা হয়তো একা পড়ে যেতে পারে।
তিনি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সৌদি স্পষ্টতই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে’ এবং তারা ‘অন্য বিকল্প খুঁজছে’। তার মতে, ‘নতুন নিরাপত্তা অংশীদাররা এমন একটি নতুন ব্যবস্থা চাইছে, যেখানে ওয়াশিংটন নয়, তারাই অঞ্চলটির গতিপথ নির্ধারণ করবে।’
তবে এই বিশ্লেষণের মূল সমস্যা হলো, তুরস্ক নিজেই ন্যাটোর সদস্য এবং সৌদি ও পাকিস্তানও দীর্ঘদিনের মার্কিন সামরিক মিত্র। ফলে এই তিন দেশের জোট কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্বের বাইরে স্বাধীনভাবে কাজ করবে, কিংবা ওয়াশিংটনের নির্দেশনা ছাড়াই নিজেদের মতো করে পদক্ষেপ নেবে- এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
কুক শেষ পর্যন্ত দাবি করেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত আঞ্চলিক ব্যবস্থা এখন এমন একটি মধ্যপ্রাচ্যে পরিণত হতে পারে, যেখানে দুটি ব্লক থাকবে- একটি আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ দেশগুলো এবং অন্যটি তার বিকল্প মক্কা চুক্তি।’
কিন্তু মক্কা চুক্তি আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের বিকল্প নয়; বরং এটি তার পরিপূরক। কারণ তুরস্কের সঙ্গে ইসরাইলের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে।
অন্যদিকে সৌদিও বছরের পর বছর ধরে তেল আবিবের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চালিয়ে আসছে। এমনকি ১৯৮১ সাল থেকেই সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইলকে এই অঞ্চলের সঙ্গে একীভূত করার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে।
সৌদিকে ইসরাইলের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। সৌদি আরবও ইসরাইলেকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করে না।
পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। দেশটি ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী হতে পারে, যদি ইসরাইল তার প্রধান শত্রু ভারতের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র না হতো।
অন্যদিকে দোহাভিত্তিক মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স-এর নির্বাহী পরিচালক খালিদ আল-জাবের মনে করেন, নতুন চুক্তি একটি সতর্কবার্তা যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে গেলে অঞ্চলটি এমন একটি ব্যবস্থার মধ্যে পড়ে যেতে পারে, যেখানে নিয়ম নির্ধারণ করবে কেবল দুটি শক্তি ইসরাইল ও ইরান।
জাবেরের মতে, ‘মক্কা চুক্তিকে একটি তৃতীয় শক্তিকেন্দ্র গঠনের প্রাথমিক প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত- এমন একটি জোট, যার কোনো পক্ষের সঙ্গেই যুদ্ধ করার প্রয়োজন নেই, কিন্তু যার যথেষ্ট শক্তি থাকবে যাতে কোনো একটি পক্ষ অঞ্চলটির ওপর একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে না পারে।’
তবে এই ব্যাখ্যাও ভুল।
গত নভেম্বরেই সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ওয়াশিংটনে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেন। ওই সফরে সৌদি আরবকে ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালাই’ বা গুরুত্বপূর্ণ ন্যাটোবহির্ভূত মিত্রের মর্যাদা দেয়া হয় এবং এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান দেয়ার প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়।
তুরস্ক এখনো ন্যাটোর সদস্য। অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও ট্রাম্পের পোস্টের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার ‘সাহসী ও দৃঢ় নেতৃত্বের’ প্রশংসা করেছেন। অর্থাৎ বাস্তবে কোনো ‘তৃতীয় শক্তিকেন্দ্র’ নেই।
মক্কা চুক্তি, এমএমডিএ-এর মতোই, হালনাগাদ বাগদাদ প্যাক্ট-এর একটি অংশ। এটি যুক্তরাষ্ট্রের আয়োজনে গড়ে ওঠা ধারাবাহিক সামরিক জোটগুলোর সর্বশেষ সংযোজন, যেগুলোর লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য সুরক্ষিত রাখা।
এর প্রধান লক্ষ্যও আগের মতোই- যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের স্বার্থের অনুগত থেকে তেলআবিবের সব শত্রুকে মোকাবিলা করা। এতে নতুন কিছু নেই।
তাই তিন দেশের চুক্তি স্বাক্ষরকে ট্রাম্প স্বাগত জানিয়ে বলেছেন- ‘বড়, সাহসী এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ।’ এতেই অনেক কিছু বলা হয়ে গেছে।
