ম্যাডোনা-কাইলি মিনোগ সম্পর্কের রসায়ন

ম্যাডোনা-কাইলি মিনোগ সম্পর্কের রসায়ন

ফন্ট সাইজ:

‘কুইন অব পপ’ ম্যাডোনা। তার সিংহাসনের তেমন কোনো দাবিদার নেই। পক্ষান্তরে অন্য নারী পপ তারকারা প্রায়ই তার তীক্ষ্ণ মন্তব্যের নিশানা হয়েছেন। তবে ব্যতিক্রম একজন। তিনি অস্ট্রেলিয়ান পপ তারকা কাইলি মিনোগ। বরং দীর্ঘদিনের এই বন্ধুর প্রতি ম্যাডোনা বরাবরই প্রকাশ করেছেন প্রকাশ্য শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। আর এখন মনে হচ্ছে, কাইলিও যেন ধীরে ধীরে ম্যাডোনার স্টাইলেই নিজেকে নতুন করে উপস্থাপন করছেন। এ খবর দিয়েছে বৃটিশ একটি ট্যাবলয়েড পত্রিকা।

সম্প্রতি নতুন গান ‘লাভ সেনসেশন’-এর প্রচারে এই দু’জনকে একই ধরনের খোলামেলা বেগুনি পোশাকে দেখা গেছে। দু’জনেরই লম্বা স্বর্ণালি চুল খোলা। তাদের এই যুগল উপস্থিতি ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে। একটি সূত্রের দাবি, কাইলি ও ম্যাডোনার পরিচয় প্রায় দুই দশকের। তবে কয়েক বছরে তাদের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। সূত্রটি বলেছে, দু’জনের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা রয়েছে। শিল্পজগতে শক্তিশালী নারী হিসেবে তারা দু’জনই দীর্ঘ সময় ধরে নিজেদের জায়গা ধরে রেখেছেন। তারা সবসময়ই একসঙ্গে কাজ করার ধারণা নিয়ে আলোচনা করেছেন।

কাইলির বয়স ৫৮ এবং ম্যাডোনার ৬৮। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ভালোবাসা, আনন্দ ও বিচ্ছেদের অসংখ্য গানের মাধ্যমে দু’জনই ভক্তদের জীবনের সাউন্ডট্র্যাক হয়ে আছেন। দু’জন মিলে এ পর্যন্ত মোট ১০২টি টপ-টেন হিট উপহার দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তাদের যৌথ গান ‘লাভ সেনসেশন’, যা ম্যাডোনার সর্বশেষ অ্যালবাম ‘কনফেশন্স টু’-এর একটি গানের রিমিক্স।

সঙ্গীতশিল্পের অভ্যন্তরীণ মহল এই সহযোগিতাকে অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। কারণ এতে দুই তারকার বিশাল ও অনুগত ভক্তগোষ্ঠী একত্রিত হয়ে নতুন একটি শক্তিশালী শ্রোতাগোষ্ঠী তৈরি করেছে। এর আগে দু’জনই একসঙ্গে কাজ করার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। গত মাসে, আমস্টারডামে ওয়ার্ল্ডপ্রাইড উপলক্ষে ম্যাডোনার ‘ক্লাব কনফেশন্স’ কনসার্টে হঠাৎ হাজির হয়ে কাইলি তাদের নতুন দ্বৈত গানটি পরিবেশন করেন। দর্শকরা উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন। পরে গানটি বৃটেনের চার্টে ৮ নম্বরে উঠে আসে এবং যুক্তরাষ্ট্রে শীর্ষস্থান দখল করে।
আশির দশকে ক্যারিয়ার শুরু করার পর থেকেই দু’জনেই নিজেদের অসাধারণ সফল ক্যারিয়ার ধরে রেখেছেন। আধুনিক পপ ও ডান্স মিউজিকের বিকাশে তাদের বড় ভূমিকা রয়েছে। ম্যাডোনা ‘হাং আপ’-এর মতো গান দিয়ে নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের জয় করেছেন। অন্যদিকে কাইলি ‘স্পিনিং অ্যারাউন্ড’-এর মতো গানের মাধ্যমে নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছেন। দু’জনের একটি বড় মিল হলো- তারা কখনো একই চেহারা বা একই ধরনের সংগীতধারায় আটকে থাকেননি। সময়ের সঙ্গে নিজেদের ইমেজ, সংগীত ও উপস্থাপনা বদলে বারবার নতুন করে আবিষ্কার করেছেন। তবে যেখানে তাদের একে অপরের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখানো হয়েছে, সেখানে দু’জন বরং প্রকাশ্যেই একে অপরকে সমর্থন করেছেন।
শোবিজ পিআর ও মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ মার্ক বোরকোভস্কি বলেন, এই সহযোগিতা দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত। কারণ এতে দুই শক্তিশালী তারকা একত্রিত হয়েছেন এবং বিশাল নতুন শ্রোতাগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। তার মতে, দু’জনের সৃজনশীল চিন্তা কয়েক দশক ধরে তাদের সফল হতে সাহায্য করেছে। তবে তিনি মনে করেন, এটি একই সঙ্গে একটি বাণিজ্যিক কৌশলও। তিনি বলেন, এটি অ্যালগরিদমে নিজেদের উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য একটি প্রচারণামূলক পদক্ষেপ। এটি পুরোপুরি সাজানো প্রেমের গল্প নয়, তবে খুব বেশি দূরও নয়। তার ভাষায়, দু’জন সবসময় একজনের চেয়ে ভালো। আর এই দু’জন একসঙ্গে নিঃসন্দেহে আরও শক্তিশালী।

অন্য অনেক নারী পপ তারকা ম্যাডোনার মতো সফল হওয়ার চেষ্টা করলেও তাদের প্রতি ‘কুইন অব পপ’-এর মনোভাব সবসময় বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল না। ২০১২ সালে লেডি গাগা’কে ম্যাডোনা ‘অ্যামিউজিং’ এবং ‘রিডাকটিভ’ বলে মন্তব্য করেন। তার অভিযোগ ছিল, গাগা তার সংগীতের ধরন অনুসরণ করছেন। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে হুইটনি হিউস্টনকে তিনি ‘হরিবলি মিডিওকার’ বলে কটাক্ষ করেন। ১৯৯৬ সালে জ্যানেট জ্যাকসন ও মারিয়া কেরি সম্পর্কেও তার মন্তব্য ছিল যথেষ্ট তীক্ষè। ম্যাডোনা বলেছিলেন, তারা তার মতো করতে পারবেন না। ১৯৮৯ সালে এক সাক্ষাৎকারে লাতোয়া জ্যাকসনের প্লেবয় ম্যাগাজিনের ছবি দেখানো হলে ম্যাডোনা মন্তব্য করেন, এটি ছিল ‘হতাশার প্রকাশ’। এমনকি এটি লাতোয়ার জন্য কোনো চাকরি পাওয়ার পথ খুলে দিতে পারে বলেও কটাক্ষ করে।

সাম্প্রতিক প্রজন্মের শিল্পীরাও তার তীক্ষè মন্তব্য থেকে রেহাই পাননি। চার্লি এক্সসিএক্স একটি নতুন গানে নাচের ফ্লোরকে মৃত বলে উল্লেখ করার পর ম্যাডোনা পাল্টা মন্তব্য করেন- নাচের ফ্লোর যদি মৃত মনে হয়, তাহলে হয়তো ভুল গান বাজানো হচ্ছে। ম্যাডোনার এই তীব্র মনোভাবের কারণে শের-এর সঙ্গেও তার সম্পর্ক খারাপ হয়। শের একসময় ম্যাডোনাকে ‘মিন’ বা ছোট মনের মানুষ বলে মন্তব্য করে জানিয়েছিলেন, তার মধ্যে এমন কিছু আছে যা তিনি পছন্দ করেন না।
কিন্তু কাইলির ক্ষেত্রে ম্যাডোনা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কাইলির প্রতি ম্যাডোনার আলাদা টান কেন? দু’জনের পারস্পরিক শ্রদ্ধার অন্যতম স্মরণীয় উদাহরণ ২০০০ সালের এমটিভি ইউরোপ মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস। স্টকহোমের ওই অনুষ্ঠানে ম্যাডোনা মঞ্চে উঠেছিলেন একটি কালো স্লিভলেস টি-শার্ট পরে, যার বুকে সোনালি অক্ষরে লেখা ছিল- ‘কাইলি মিনোগ’। পরে ম্যাডোনা বলেন, তিনি তখন পশ্চিমা ধাঁচের সাজপোশাক নিয়ে মেতে ছিলেন এবং এমন কয়েকজন গায়িকার কথা ভাবছিলেন যাদের তিনি খানিকটা ভালোবাসেন। সেখান থেকেই কাইলির নাম মাথায় আসে এবং তার নামে টি-শার্ট বানানোর সিদ্ধান্ত নেন।

ঘটনাটি কাইলিকেও ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল। পরে তিনি বলেন, আগে থেকে কোনো সতর্কতা বা খবর দেয়া হয়নি। তিনি কী করেছিলেন তা-ও ঠিক মনে নেই- সম্ভবত বিস্ময়ে প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল। ২০১৫ সালে ব্রিসবেনে মঞ্চে ম্যাডোনা কাইলির বিখ্যাত গান ‘কান্ট গেট ইউ আউট অব মাই হেড’-এর অংশবিশেষ গেয়েছিলেন। একই বছর অস্ট্রেলিয়ার একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে ম্যাডোনা বলেন, ‘কাইলি! আমি তাকে ভালোবাসি। আমি তার বড় ভক্ত।’
দীর্ঘদিন যাদের একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখানো হয়েছিল, সেই দু’জন অবশেষে ২০২৪ সালে এক মঞ্চে একসঙ্গে গান করেন। ম্যাডোনা তার সেলিব্রেশন ট্যুর-এর লস অ্যানজেলেসের অনুষ্ঠানে কাইলিকে দ্বৈত গান গাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান। কাইলি সেদিন ম্যাডোনার নাম লেখা কালো টপ পরে মঞ্চে হাজির হন। পরে গ্রাহাম নর্টনের অনুষ্ঠানে ম্যাডোনা কাইলিকে বলেন, ‘আমি আসলে তোমাকে নিয়ে একটু ঈর্ষান্বিত ছিলাম।’

গ্রাহাম নর্টন যখন জানতে চান, পুরোনো একটি ক্ষতিগ্রস্ত কাইলির অ্যালবাম ম্যাডোনা কেন এতদিন ধরে রেখে দিয়েছেন, তখন তিনি জানান, তার সাবেক স্বামী গাই রিচি কাইলিকে পছন্দ করতেন। ম্যাডোনা বলেন, কাইলি ছিলেন অত্যন্ত সুন্দর। তার সাবেক স্বামীর কাইলির প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ ছিল। এরপর রসিকতা করে ম্যাডোনা বলেন, আমি কখনোই কাইলির মতো সুন্দর হতে পারব না।

অন্যদিকে কাইলিও ম্যাডোনাকে তার জীবনের অন্যতম বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখেন। তিনি জানান, মেলবোর্নে ১৪ বা ১৫ বছর বয়সে নিজের ঘরে নাচতে নাচতে ম্যাডোনার গান শুনতেন। ম্যাডোনা তখন তার কাছে ‘একটি রকেটের মতো’ ছিলেন। কাইলি বলেন, তিনি ও তার বোন ম্যাডোনার ১৯৮৩ সালের স্বনামধন্য প্রথম অ্যালবামটি অসংখ্যবার শুনেছেন। ম্যাডোনার প্রতি নিজের সেই পুরোনো ভালোবাসার প্রতিদান হিসেবে কাইলি তাকে উপহার দেন ম্যাডোনার নিজের নামে প্রকাশিত ১৯৮৩ সালের প্রথম অ্যালবামের একটি মূল্যবান ভিনাইল কপি। চার দশকের পপ ইতিহাসে তাই কাইলি-ম্যাডোনা সম্পর্কটি নিছক দুই তারকার সহযোগিতা নয়। এটি একই সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অনুপ্রেরণা, বন্ধুত্ব এবং দীর্ঘদিনের পপ-সংস্কৃতির দুই আইকনের একসঙ্গে পথচলার গল্প।