মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুদের হার হ্রাস ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে শিল্পখাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশে নেমে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।
শনিবার রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে আয়োজিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ এসব কথা হলেন। ‘২০২৬ অর্থবছরের দ্বি-বার্ষিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, প্রেক্ষিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি এবং বেসরকারিখাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনার আয়োজন করে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)।
সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ও ব্র্যাকের চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তার, বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন রহমান।
বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা তুলে ধরে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ধীরে ধীরে সুদের হার কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে আনতে হবে, যদিও এরই মধ্যে ৫০ বেসিস পয়েন্ট হ্রাস পেয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে শিল্পখাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, ঘোষিত সিএমএসএমই সহায়তা প্যাকেজের ৫ হাজার কোটি টাকার কার্যকর বাস্তবায়ন, স্বচ্ছ তদারকি এবং প্রকৃত উৎপাদনমুখী উদ্যোক্তাদের কাছে সহজে অর্থ পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ হ্রাস এবং আর্থিক খাতের প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। সর্বোপরি, ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে এনে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়াতে হবে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জপূর্ণ। তবে যথাযথ নীতিগত সমন্বয়, কার্যকর সংস্কার, জবাবদিহিমূলক বাস্তবায়ন এবং সরকারি-বেসরকারি খাতের নিবিড় অংশীদারত্বের মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জগুলোকে সুযোগে রূপান্তর করা সম্ভব।
তাসকীন আহমেদ বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের উচ্চ ব্যয় এবং ব্যবসায়িক খরচ বেড়ে যাওয়ায় দেশের বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে চাপ তৈরি হয়েছে। সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ হলেও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৫ শতাংশ। এ পরিস্থিতিকে বিনিয়োগের জন্য উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৩ দশমিক ১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। বাণিজ্য বাধা, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট, সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি এবং পণ্য পরিবহনের খরচ দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও।
ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যবসা সহজ করার লক্ষ্যে বেশ কিছু সংস্কারমূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কোম্পানি নিবন্ধন প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে ৪৮ ঘণ্টায় সম্পন্ন করা, চামড়া, পাদুকা ও হোম টেক্সটাইল খাতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা আরও তিন বছর বাড়ানো এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে ১০টি নতুন খাতকে শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় আনার উদ্যোগ রয়েছে।
এছাড়া কর ব্যবস্থাপনায় অটোমেশন বাড়ানো, কাস্টমস প্রক্রিয়া দ্রুত করা এবং এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি হিসেবে সম্ভাবনাময় দেশগুলোর সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) দ্রুত সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব সংস্কার বাস্তবায়িত হলে দেশে ব্যবসা পরিচালনা আরও সহজ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন ডিসিসিআই সভাপতি।
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তাসকীন আহমেদ বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকনির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে রপ্তানির ক্ষেত্রে লিড টাইম কমাতে শিল্পাঞ্চলগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন সব ধরনের সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি দেশের লজিস্টিক ব্যবস্থার আধুনিকায়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় বড় বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপরও জোর দেন। সিএমএসএমই খাতের পরিস্থিতি তুলে ধরে তাসকীন আহমেদ বলেন, এ খাতে প্রকৃত ঋণ প্রবাহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৫ শতাংশ। কিন্তু বাস্তবে তা মাত্র ১৬ দশমিক ৮ শতাংশে আটকে আছে। ব্যবসার খরচ বেড়ে যাওয়ায় এ খাতে খেলাপি ঋণের হারও বেড়ে ২৪ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রচলিত জামানতনির্ভর ঋণব্যবস্থার পরিবর্তে ডিজিটাল ক্রেডিট স্কোরিংয়ের মাধ্যমে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে সাশ্রয়ী দামে যন্ত্রপাতি কেনার জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করা প্রয়োজন।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ সহজ করতে স্বল্পসুদের ঋণ চালুর প্রস্তাবও দেন ডিসিসিআই সভাপতি।
পাশাপাশি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি পর্যালোচনা করে অপ্রয়োজনীয় ভর্তুকির চাপ কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে ভোক্তাদের জন্য স্থিতিশীল ও সহনীয় বিদ্যুতের দাম নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তাসকীন আহমেদ আরও বলেন, বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির মূল্য অস্থিরতা ও সরবরাহ ঝুঁকি মোকাবিলায় জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখী করা দরকার। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশের অফশোর গ্যাস ও জ্বালানি অনুসন্ধান কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে।
