সার্বিক বিবেচনায় বিএনপি'র ভেতর থেকে সর্বোত্তম তথা সবচেয়ে উপযুক্ত মানুষটিই রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন। অভিনন্দন, দেশের ২৩তম প্রেসিডেন্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে। একজন বিদ্বান, স্বজ্জন, নিরহংকার, ত্যাগী, আদর্শবান এবং পরিচ্ছন্ন ইমেজের অধিকারী রাজনীতিবিদকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে পাওয়া দেশবাসীর জন্য গৌরবের বিষয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রটির প্রধান হিসেবে তাঁকে মনোনয়ন দিয়ে এ ব্যাপারে শ্রেষ্ঠ সিদ্ধান্ত প্রদান করেন। দলের ভেতরে রাষ্ট্রপতি পদে যোগ্য আর কেউ ছিলেন না তা কেউ বলছেন না। কিন্তু দলের সাথে সম্পৃক্ততা, দলকে পরিচালনার অভিজ্ঞতা, সংগঠনের জন্য ত্যাগ , শিক্ষা, রুচিবোধ, শিষ্টাচার, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, নিজদলসহ সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতা – এসব কিছুই তারেক রহমানের কাছে প্রাধান্য পেয়েছে।
কেউ কেউ দলের বাইরে থেকে সর্বজনগ্রাহ্য একজনকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কথা বলেছিলেন এবং এখনও বলেন। প্রথম কথা হচ্ছে, দলের ভেতর যোগ্য প্রার্থী থাকলে বাইরে থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে কেন। এটা তো জাতীয় সরকার নয়। রাজনীতিবিদদের নিয়ে জাতীয় সরকার হতে পারতো স্বৈরাচারী রেজিমের পতনের সঙ্গে সঙ্গেই। সেটি তো হয়নি। এখন যেহেতু সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে দলীয় সরকার গঠিত হয়েছে, অতএব এই পদ্বতি যাতে সঠিকভাবে গড়ে উঠতে পারে তার সুযোগ দিতে হবে। বিএনপি ব্যর্থ হলে, জনগণের আস্থা হারালে নতুন দল ক্ষমতায় আসবে। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বিরোধী দল হঠকারিতার পথে যাবে না এবং আগামী নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখলে ক্ষমতাসীন সরকার বিভিন্নরকম ষড়যন্ত্রের পথে হাঁটবেন না, এই নিশ্চয়তাটা দেশবাসী চান। গণতন্ত্রও ট্রায়াল এন্ড এরর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। আগামী কয়েকটা নির্বাচনকে সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ দিলে গণতন্ত্র এখানে শক্ত ভিত্তি পাবে। দ্বিতীয়ত, দলের বাইরে থেকে একজন সর্বজনগ্রাহ্য ব্যক্তি বের করা আর যেখানেই হোক, বাংলাদেশে অন্তত নিকট ভবিষ্যতেও সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতো একজন বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্বকে নিয়েও যেখানে দেশের একজন আকণ্ঠ দুর্নীতিগ্রস্থ তৃতীয় শ্রেণীর রাজনীতিবিদও অকল্পনীয় হীন মন্তব্য করেন সেখানে এ আশা দুরাশা মাত্র।
দলের কঠিন সময়ে যখন চেয়ারপার্সন গুরুতর অসুস্থ কিংবা কারান্তরালে এবং দ্বিতীয় নেতা বাধ্য হয়ে লন্ডনে অবস্থান করছেন এবং কেবল অনলাইনে যোগাযোগ রাখতে পারছেন, তখন দেশের ভেতরে দলটাকে ঐক্যবদ্ধ রাখা, শত প্রতিকুলতার মধ্যেও বার বার কারাবরণ করেও সংগ্রাম চালিয়ে নেওয়ার মূল দায়িত্বটা অন্য সহকর্মীদের সহযোগিতায় মির্জা ফখরুলই পালন করেছেন। এই মনোনয়নে বিএনপির সৎ ও নিবেদিত নেতাকর্মীরা এই বার্তা পেয়েছেন যে দলের জন্য ত্যাগ করলে প্রতিদান পাওয়া যায়। অবশ্য তারা সবখানেই এর প্রতিফলন দেখতে চান।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর উঠে এসেছেন একটি ঐতিহ্যবাহী এবং প্রখ্যাত রাজনৈতিক পরিবার থেকে। সেই পরিবারের কারো ভারতপন্থী রাজনীতি করার তকমা নেই। অথচ তিনি ভারতের লোক বলেও প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বিএনপিতে যোগদানের আগে তিনি ন্যাপ-ভাসানীর রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। এরা কস্মিনকালেও ভারতপন্থী রাজনীতি করেননি। তার রাজনৈতিক গুরু ছিলেন মশিউর রহমান যাদু মিয়া, এস এ বারী এ টি, মির্জা গোলাম হাফিজ প্রমুখ যারা বরং ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধেই রাজনীতি করে গেছেন। অন্যদিকে অপর পক্ষটি বলেন, তার বাবা-চাচারা একসময় মুসলিম লীগের রাজনীতি করেছেন। তো তাতে কী হয়েছে? এক সময় তো শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরোওয়ার্দী,শেখ মুজিবুর রহমানও মুসলিম লীগ করেছেন। তাকে ভারতপন্থী বা পাকিস্তানপন্থী বানানোর কোশেশ কাজে লাগবে না। বিএনপির প্রধান পরিচয় হচ্ছে, এটি একটি বাংলাদেশপন্থী দল। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অন্তর্গতভাবেই এর ধারক এবং বাহক বলে তার ঘনিষ্ঠজনেরা মনে করেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রেসিডেন্ট পদে মনোনীত হওয়ার পরে দল থেকে বিদায় নেয়ার অনুষ্ঠানে একাধিকবার অঝোরে কেঁদেছেন। এর আগেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি আবেগ আপ্লুত হয়ে প্রকাশ্যে কেঁদেছেন। এটাকে অনেকে ব্যক্তিত্বের দুর্বলতা বলে অভিহিত করেছেন, কেউ কেউ এতে মজাও খুঁজে পেয়েছেন। কিন্তু সাইকোলজির ভাষায় এ ধরণের আবেগ বা Emotion আসে সহমর্মিতা বা Empathy থেকে যা একটি মস্ত বড় গুণ। এ ধরনের মানুষের পক্ষে অন্যের ক্ষতি করা সম্ভব নয়। তাঁরা ন্যায়ের পক্ষে, অন্যের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়েন। আমরা আশা করব, প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করায় তিনি কিছুটা জনসমক্ষের আড়ালে চলে গেলেও বিভিন্ন উপলক্ষ্যে এই সহমর্মিতা প্রদর্শন অব্যাহত রেখে আলোচ্য ঘটনার প্রতি আমাদের নজর নিবদ্ধ করতে সাহায্য করবেন।
আমরা যদি তাঁর অব্যবহিত দুই পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্টের সাথে মির্জা ফখরুল ইসলামের তুলনা করি তাহলে একটা বিরাট স্বস্তি বা রিলিফ অনুভব করি। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ তো তার বিভিন্ন চটুল এবং জোকার মার্কা বক্তব্যের মাধ্যমে এই পদটারই অবমাননা করে গেছেন। সাহাবুদ্দিন চুপ্পু কথায় শালীনতা বজায় রাখলেও তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মারাত্মক অভিযোগ আছে। যিনি নিজে দুর্নীতি দমন কমিশনের সদস্য তিনি বা তারা কি করে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হন? অবশ্য এই অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত নয়। কিন্তু এখন যেহেতু তিনি আর প্রেসিডেন্ট পদে আসীন নন তাই এই অভিযোগের তদন্ত হওয়া উচিত যাতে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেয়ার আগে সবকিছু যাচাই করা হয়। অবশ্য এজন্য সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। কারণ চুপ্পুকে যিনি মনোনয়ন দেন সেই শেখ হাসিনার গোটা গোষ্ঠীই তো আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত ছিলেন বলে সর্ব মহলে ধারণা রয়েছে।
দেশবাসী মোহাম্মদ উল্লার মতো মেরুদণ্ডবিহীন প্রেসিডেন্ট কিংবা বদরুদ্দোজা চৌধুরীর মতো অতি উচ্চাভিলাষী রাষ্ট্রপতি দেখতে চায় না। তারা চায় এমন একজন রাষ্ট্রপতি যিনি শপত অনুযায়ী সংবিধানকে রক্ষা করবেন সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবেন।
সংসদীয় গণতন্ত্রে সব দেশেই প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বেশ সীমিত। এটা অনেকটা আলংকরিক পদ। কিন্তু ”মিলাদ পরানো এবং কবর জিয়ারত” জাতীয় কাজ ছাড়া তার একবারেই কোন ক্ষমতা নেই, এই কথাটাও ঠিক নয়। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদের দফা ৩-এ বলা হয়েছে কেবল প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ”ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তাহাঁর অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করিবেন।” একই অনুচ্ছেদের দফা ৫-এ বলা হয়েছে রাষ্ট্রপতি অনুরোধ করিলে প্রধানমন্ত্রী ”যে কোন বিষয় মন্ত্রিসভায় বিবেচনার জন্য পেশ করিবেন।” সংবিধানের এই দফার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিকে বড় ধরণের প্রভাব রাখার নৈতিক সুযোগ দেয়া হয়েছে। তাছাড়া সাংবিধানিকভাবে উল্লেখ না থাকলেও অনানুষ্ঠানিকভাবেও প্রেসিডেন্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিতে পারেন – এমন সম্পর্ক তাদের মধ্যে আছে। এছাড়া প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক ক্ষমতা কিছুটা বাড়ানোর একটি আলোচনাও বর্তমানে রাজনৈতিক মহলে আছে। দেশবাসী আশা করেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একেবারে ঠুঁটো জগন্নাথ প্রেসিডেন্ট হবেন না এবং তারেক রহমানও পতিত হাসিনার মতো সর্বেসর্বা হয়ে উঠবেন না।
আনিসুর রহমান সুইডেনে অবস্থানরত একজন সিনিয়র বাংলাদেশী সাংবাদিক।
লেখক
নতুন প্রেসিডেন্টের কাছে প্রত্যাশা
আনিসুর রহমান
মত-মতান্তর
২ ঘন্টা আগে
২২ আগস্ট (শনিবার), ২০২৬, ১০ঃ৩৯ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
