পোশাক কারখানার ছাদে ১৭৬৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব: সিপিডি

ফন্ট সাইজ:

দেশের ৩ হাজার ৩২০টি পোশাক কারখানার ছাদে প্রায় ১ হাজার ৭৬৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব বলে মনে করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রয়োজন হবে প্রায় ১২ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা বা ১.০৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ। যা দিয়ে পোশাক খাতের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৪ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব। অথচ অর্থায়ন সংকট ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে বর্তমানে এ সম্ভাবনার মাত্র ৩ শতাংশ কাজে লাগানো যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে সিপিডি আয়োজিত এক সেমিনারে এই সমীক্ষার তথ্য জানানো হয়। ‘পোশাক কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা’- শীর্ষক এ সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন- সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। এতে সৌরবিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন অংশীজনেরা অংশ নেন। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন- সিপিডি’র গবেষণা সহযোগী আবরার আহাম্মেদ ভূঁইয়া। মূল প্রবন্ধে বলা হয়, দেশের পোশাক কারখানায় চাহিদার মাত্র ৩ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে আসছে। এটি ১৪ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব। গবেষণায় দেশের ৩ হাজার ৩২০টি পোশাক কারখানার তথ্য বিশ্লেষণের মধ্যে ৩৫০টি কারখানায় সরাসরি সমীক্ষা চালানো হয়, যা দেশের মোট পোশাক কারখানার প্রায় ১০.৫ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। সিপিডি’র গবেষণায় বলা হয়, তৈরি পোশাক খাত থেকে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে। অথচ তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেক কারখানা তাদের উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে। এ পরিস্থিতিতে শিল্পের বিদ্যুৎ চাহিদার একটি অংশ সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে পূরণের সুযোগ রয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সম্ভাবনা ২ হাজার ৮১৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের ৮৭৮টি কারখানার ওপর চালানো সমীক্ষায় নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ব্যবহার খুবই সীমিত। এ ছাড়া গবেষণায় আরও বলা হয়, রুফটপ সোলারের মাধ্যমে তৈরি পোশাক খাতের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৪ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন হবে প্রায় ১২ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা বিনিয়োগ। ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিটের গড় খরচ মাত্র ৩ টাকা ৪ পয়সা। যা জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের দামের অর্ধেকেরও কম। সিপিডি’র গবেষণায় ৩০০ কিলোওয়াট বা তার বেশি সক্ষমতার ২ হাজার ৩০৩টি কারখানাকে রুফটপ সোলারের জন্য সম্ভাবনাময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কারখানায় সৌর প্যানেল স্থাপনে প্রায় ১৮৮.২ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। সভায় সিপিডি’র গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্প খাত ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের মধ্যে রয়েছে। অনেক আগে থেকেই শিল্প কারখানায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সমপ্রসারণ করা গেলে বর্তমান সংকট আরও কমানো সম্ভব হতো। পোশাক খাত ধীরে ধীরে রুফটপ সোলারের দিকে যাচ্ছে, যা অত্যন্ত ইতিবাচক উদ্যোগ।

পোশাক খাতে সব মিলিয়ে প্রায় ৯.৭ মিলিয়ন বর্গমিটার জায়গা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখান থেকে প্রায় ১ হাজার ৭৬৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। মাত্র ১৮৮ মিলিয়ন ডলার হলেই চলবে। খুব বেশি টাকা দরকার নেই।
সিপিডি’র গবেষণায় আরও বলা হয়, বাণিজ্যিক ঋণের সুদহার সাড়ে ১০ শতাংশের বেশি হলে শিল্পের রুফটপ সোলার প্রকল্পগুলো ব্যাংকের কাছে বিনিয়োগযোগ্যতা হারায়। ফলে এ খাতে সবুজ অর্থায়ন বা রেয়াতি ঋণের ধারাবাহিকতা জরুরি। বিনিয়োগের শর্তগুলো পরিবর্তন করা গেলে সৌর বিদ্যুতে যেতে প্রস্তুত কারখানার সংখ্যা আরও বাড়বে। বিশেষ করে সাড়ে ৬ শতাংশের কাছাকাছি সুদে গ্রিন ফাইন্যান্স পাওয়া গেলে তা সবচেয়ে ভালো হবে। খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ৫০০ কারখানা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত অবস্থায় আছে। নানা সুবিধা দিয়ে আরও শিগগিরই ১ হাজার ৩০০ কারখানায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। বাকি ১ হাজার ৫০০-এর মতো কারখানায় নীতিসহায়তাসহ অন্যান্য সহায়তা দিয়ে ভবিষ্যতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন উপযোগী করা যাবে। তিনি মনে করেন, সৌরবিদ্যুতের অবকাঠামো স্থাপনের খরচ কমানো প্রয়োজন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে শুল্কসুবিধা দেয়া হলেও এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমিতির সহসভাপতি জাহিদুল আলম বলেন, বাণিজ্যিকভাবে প্যানেল আমদানির ক্ষেত্রে সাড়ে ১৩ শতাংশ শুল্কের কথা বলা হলেও প্রতি কেজিতে তিন ডলার করে শুল্কায়ন করা হচ্ছে। এতে শুল্ক ভার ২৭ শতাংশের বেশি পড়ে। এতে ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি ব্যবহারকারীদের ওপর খরচের বোঝা বাড়ে।

সুদের হার ও চ্যালেঞ্জ: গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হলো সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যাংকযোগ্যতার ওপর সুদের হারের ব্যাপক প্রভাব। ৬.৫ শতাংশ সবুজ অর্থায়নে ৬১৩টি কারখানা ‘বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত’ ছিল। কিন্তু বাণিজ্যিক সুদের হার ১০.৫ শতাংশে পৌঁছালে ‘বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত’ কারখানার সংখ্যা শূন্যে নেমে আসে। ফলে কম সুদের সবুজ অর্থায়ন অনেক প্রকল্পকে বাস্তবে বিনিয়োগযোগ্য করে তোলার প্রধান শর্ত।

এ ছাড়া পুরনো অনেক কারখানা ভবনের ছাদের কাঠামোগত সক্ষমতার নথি না থাকা, উচ্চ জামানতের চাহিদা এবং টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করছে।
অনুষ্ঠানে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল রুফটপ সোলার ইন আরএমজি সেক্টর’- শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিপিডি’র রিসার্চ এসোসিয়েট আবরার আহমেদ ভূঁইয়া ও প্রোগ্রাম এসোসিয়েট নূর ইয়ানা জান্নাত।