বনানী গোরস্থানে চিরশায়িত হলেন আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী দীপু মনির স্বামী তৌফীক নাওয়াজ। বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ৩টায় বাবা আমিনুর রহমানের কবরে তাকে দাফন করা হয়। পাশেই তার মা খায়রন নেছার কবর। প্যারোলে মুক্তি পাওয়া দীপু মনি এ সময় কবরস্থানে উপস্থিত ছিলেন। তাদের মেয়ে দ্বীপান্বিতা নাওয়াজ কবরে মাটি ছড়িয়ে দেন। দাফনের পর মোনাজাতে অংশ নেন দীপুমনি সহ উপস্থিত সবাই। বনানী গোরস্থান মসজিদের ইমাম মাওলানা ওমর ফারুক মোনাজাত পরিচালনা করেন। মোনাজাতের পর স্বামীর জন্য দোয়া কামনা করেন দীপু মনি। ঢাকা মহানগর পুলিশ ও কারাগারের নিরাপত্তাকর্মীদের কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে দাফনের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। স্বামীকে দাফনের পর বনানী কবরস্থানে নিজের বাবা এম এ ওয়াদুদের কবর জিয়ারত করেন দীপু মনি। ওয়াদুদ ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। কবর জিয়ারত শেষে বৃষ্টির মধ্যেই দীপু মনিকে প্রিজন ভ্যানে তোলা হয়। সন্ধ্যা ৬টায় তার প্যারোলের মেয়াদ শেষ হয়।
তার মধ্যেই তাকে মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারে ফিরিয়ে নেয়া হয়। আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী দীপু মনি চব্বিশের আন্দোলনের পরে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ কারাগারে আটক আছেন। স্বামীর শেষকৃত্যে অংশ নেয়ার সুযোগ দিতে তাকে ১২ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি দেয়া হয়। তার স্বামী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তৌফীক নাওয়াজ মঙ্গলবার রাতে ঢাকার কন্টিনেন্টাল হাসপাতালে (সাবেক ইউনাইটেড হাসপাতাল) মারা যান। ৭৬ বছর বছর বয়সী তৌফীক নাওয়াজ দীর্ঘদিন ধরে কিডনি ও লিভারের নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। পেশায় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তৌফীক নাওয়াজ ধ্রুপদি সংগীতেরও চর্চা করতেন। ২০১৯ সালে তিনি স্ট্রোক করেছিলেন। সর্বশেষ গত ২৭শে মে হুইলচেয়ারে করে কারাবন্দি স্ত্রীকে দেখতে তাকে আদালতে নিয়ে গিয়েছিলেন স্বজনরা। স্বামীর জানাজা ও দাফনে অংশ নিতে বৃহস্পতিবার সকালে প্যারোলে মুক্তি পান দীপু মনি। সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে তাকে মুন্সীগঞ্জ কারাগার থেকে প্রিজন ভ্যানে করে কঠোর পুলিশি পাহারায় ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। সকাল সোয়া ৮টায় তিনি কলাবাগানের বাসায় পৌঁছান। প্রয়াত তৌফীক নাওয়াজের মরদেহও সকালে কলাবাগানের বাসায় নেয়া হয়। বাসার নিচে গ্যারেজে ফ্রিজার ভ্যানে রাখা হয় তার মরদেহ। গাড়ির পাশেই ফ্লোরে কাপড় পেতে স্থানীয় বশির উদ্দিন রোড মসজিদের মুয়াজ্জিনসহ পাঁচজনকে কোরআন তেলাওয়াত করতে দেখা যায়।
পুলিশকে ওই বাড়ি ঘিরে সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা যায়। ওই বাড়িতে যারা যাচ্ছিলেন, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছিল পুলিশ। বেলা ১১টার কিছু আগে চাঁদপুর থেকে আসা দীপু মনির একজন আত্মীয়ের সঙ্গে কথা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই নারী বলেন, দীপু মনি খুব ভেঙে পড়েছেন। মানসিকভাবে তিনি খুব বিপর্যস্ত। কিছু খেতে চাচ্ছেন না। দীপু মনিকে সান্ত্বনা দিতে এসেছিলেন চাঁদপুর আওয়ামী লীগের জাকিয়া সুলতানা শেফালী। তিনি বলেন, উনি ভালো নেই। এ সময় তার কী অবস্থা, সেটা তো বোঝা যায়। জাকিয়া সুলতানা জানান, তার সঙ্গে আরও কয়েকজন কর্মী দীপু মনির সঙ্গে দেখা করেছেন। বেলা সোয়া ১২টার পর তৌফীক নাওয়াজের মরদেহ নিয়ে ফ্রিজার ভ্যান রওয়ানা হয় গুলশানের আজাদ মসজিদের দিকে। এর পরপরই দীপু মনিকে প্রিজন ভ্যানে করে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। বাদ জোহর আজাদ মসজিদে যখন জানাজার নামাজ চলছিল, দীপু মনি বাইরে প্রিজন ভ্যানে ছিলেন। জানাজা শেষে ভ্যান থেকে নেমে শেষবারের মতো স্বামীকে দেখেন তিনি। এ সময় আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। জানাজার নামাজ পরিচালনা করেন মসজিদের প্রধান ইমাম মাওলানা আবদুর রহিম।
এরপর তৌফীক নাওয়াজের ছোট ভাই তাইমুর নাওয়াজ ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী পরিবারের পক্ষ থেকে কথা বলেন। পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের পাশাপাশি তৌফীক নাওয়াজের বন্ধু, সহকর্মী এবং তার এক সময়ের সহপাঠীরাও জানাজায় অংশ নেন। আইনজীবী মহসীন রশিদ, মনিরুল আলম, সৈয়দ আশরাফুল হকও ছিলেন তাদের মধ্যে। জানাজায় আওয়ামী লীগের তুলনামূলক কম পরিচিত নেতাকর্মীদের উপস্থিতি দেখা যায়। জানাজার পর আজাদ মসজিদের সামনের সড়কে স্লোগান দিলে একজনকে আটক করে পুলিশ। শেষ দেখার পর বেলা ২টার আগে দীপু মনিকে আবার প্রিজন ভ্যানে করে বনানী কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। দাফন শেষে সেই ভ্যান তাকে নিয়ে রওনা হয় মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারের উদ্দেশ্যে।
