গরিব কৃষক মাসুক আহমদ। বাড়ি গোয়াইন ঘাটের আটলিহাই গ্রামে। হঠাৎ তার নামে থানার ওয়ারেন্ট। পুলিশ তাকে হন্য হয়ে খুঁজছে। ঘটনা কি, এমন তো হওয়ার নয়। খোঁজ করতে শুরু করলেন এলাকার মানুষ। জানা গেল, ২০২৪ সালের ২৩শে অক্টোবর জৈন্তাপুর থানার দায়ের করা একটি পশু চোরাচালান মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি তিনি। দিশাহারা হয়ে পড়েন কৃষক মাসুক আহমদ। কী করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। এ মামলায় দু’জন আসামি চোরাচালানের পশুসহ আটক হয়েছিলেন। তাদের বাড়িও একই এলাকায়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা তাদের ডাকলেন। ওরা জানালো আসামি আলটিহাই মাসুক হওয়ার কথা নয়। পাশের গ্রাম কুড়িহাই। ওই গ্রামে একজন মাসুক রয়েছেন। তিনি পশুর ব্যবসা করেন। সীমান্তের ওপার থেকে পশু এনে বিক্রি করেন সীমান্তবর্তী হাটে। মামলার ঠিক আগের দিন ওই বছরের ২২শে অক্টোবর জৈন্তাপুর বাজারে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে একটি ছোটো পিকআপভ্যানসহ গরুর চালান ধরেন এসআই লুৎফুর রহমান। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে।
চোরাই পশুসহ গ্রেপ্তার হওয়া গোয়াইনঘাটের লাফনাউট গ্রামের আকিল উদ্দিন ও উপরকোটাপাড়া গ্রামের মারুফ উদ্দিনসহ ৫ জনকে আসামি করা হয়। মামলার এজাহারে তিন নম্বর আসামি করা হয় আটলিহাই গ্রামের মাসুক আহমদ ও চার নম্বর আসামি করা হয় একই গ্রামের সিরাজুল ইসলামকে। সিরাজুল ইসলাম একজন ফেরিওয়ালা ছিলেন। বাড়িতে ওয়ারেন্ট আসার কিছুদিন পর তিনি হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুবরণ করেন। মামলার তদন্ত কাজ চলার বিষয়ে কৃষক মাসুক কোনো কিছুই জানেননি। এরই মধ্যে কুড়িহাই গ্রামের ব্যবসায়ী মাসুক আহমদ চেষ্টা চালিয়ে গ্রেপ্তার হওয়া দুই আসামিকে আদালত থেকে জামিনে ছাড়িয়ে আনেন। তিনিসহ তার ব্যবসায়িক পার্টনার সিরাজ পুলিশের সঙ্গে আঁতাত করে তদন্তে মামলা ঘুরিয়ে নেন। নামে মিল থাকায় তদন্তকারী কর্মকর্তা জৈন্তাপুর থানার এসআই লিটন চন্দ্র ঘোষ আসামি করে আটলিহাই গ্রামের দরিদ্র কৃষক মাসুক উদ্দিন ও ফেরিওয়ালা সিরাজুল ইসলামকে। এরপর তাদের নামে গোয়াইনঘাট থানায় ওয়ারেন্ট আসে। বিষয়টি নিয়ে সালিশ ডাকেন স্থানীয় পূর্ব আলীরগাঁও ইউনিয়ন বিএনপি’র সভাপতি ও ইউপি সদস্য এবাদুর রহমান।
বিষয়টি নিয়ে যখন সালিশ বসে তখনই বেরিয়ে আসে আসল সত্য। প্রায় আড়াই লাখ টাকা ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে এসআই লিটন মূল আসামিদের বাদ দিয়ে নামে মিল থাকায় দরিদ্র কৃষক মাসুক ও ফেরিওয়ালা সিরাজকে চার্জশিটে আসামি করে আদালতে রিপোর্ট দিয়েছেন বলে জানতে পারেন তারা। ইউপি মেম্বার এবাদুর রহমান জানিয়েছেন- চোরাচালানের মামলার মূল আসামি কুরিহাই গ্রামের মইন উদ্দিনের ছেলে মাসুক আহমদ ও আব্দুল লতিফের ছেলে সিরাজ উদ্দিন। অথচ পুলিশ চার্জশিটে অপরাধীদের অসহায় কৃষক ও ফেরিওয়ালাকে আসামি হিসেবে উল্লেখ করে আদালতে চার্জশিট দিয়ে হয়রানি করছে। সালিশ বৈঠকে উপস্থিত থাকা স্থানীয় হেলাল আহমদ, কয়ছর আহমদ, দিলাল আহমদ ও বাবুল আহমদও জানিয়েছে একই কথা। তারা এত বড় জালিয়াতির ঘটনায় এসআই লিটনের শাস্তি দাবি করেন। এদিকে পরোয়ানাভুক্ত আসামি হওয়ায় কয়েক দিন আগে আদালতে গিয়ে সত্য উপস্থাপন করে জামিন নিয়েছেন দরিদ্র কৃষক মাসুক আহমদ। তিনি মানবজমিনকে জানিয়েছেন, আদালতের আইনজীবীর মাধ্যমে আমি সত্য বিষয়টি উপস্থাপন করায় এবং এ নিয়ে সালিশ বৈঠকের বিষয়টি জানানোর পর আদালত সন্তুষ্ট হয়ে তাকে জামিন দিয়েছেন। এখন তিনি বিষয়টি নিয়ে জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে নালিশ করবেন বলে জানান। এ ব্যাপারে ‘মূল অভিযুক্ত’ কুড়িহাই গ্রামের পশু ব্যবসায়ী মাসুক উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি জানিয়েছেন, আগে তিনি পশু ব্যবসা করতেন। বর্তমানে ছেড়ে দিয়েছেন।
আর ওই ব্যবসার সঙ্গে তিনি জড়িত নন। জৈন্তাপুরে যে পশু আটক করা হয়েছিল সেটি তার নয় বলে দাবি করেন। উল্টো দরিদ্র কৃষক মাসুক আহমদকে আসামি করায় তিনি নিজেও আফসোস করেন। জৈন্তাপুর থানার সাব-ইন্সপেক্টর লিটন চন্দ্রের ঘোষণা বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, জৈন্তাপুর থানায় তিনি ২০২৪ সালে যোগদান করেন। এরই মধ্যে ২শ’ মামলার চার্জশিট দিয়েছেন। এ মামলার বিষয়টি তার নলেজে নেই বলে দাবি করেন। এ ব্যাপারে কথা বলতে থানায় যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। এদিকে সিলেটের জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কানাইঘাটের সীমান্তবর্তী এলাকা চোরাই রাজ্য হিসেবে পরিচিত। প্রতিদিন ওই তিন উপজেলার সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে শ’ শ’ চোরাই পশু আসে। যারা পশু চোরাচালানি করেন তাদেরকে স্থানীয় ভাষায় ‘বুঙারি’ বলা হয়। আর এই পশু চোরাচালান নিয়ে পুলিশের মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তারা অবাধ বাণিজ্যে মেতে উঠেন বলে অভিযোগ রয়েছে। চোরাচালানিদের সঙ্গে পুলিশের সংখ্যতার অভিযোগটিও অনেক পুরনো।
