সিটিটিসি’র ‘অন্ধকার’ থেকে তুলশীখালী নদীতে ফেলা হয় আল আমিনের লাশ

সিটিটিসি’র ‘অন্ধকার’ থেকে তুলশীখালী নদীতে ফেলা হয় আল আমিনের লাশ

ফন্ট সাইজ:

সিটিটিসি (কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম) হেফাজতে মাদ্রাসা শিক্ষক মাওলানা আবুল হোসেন আল-আমিনের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজীপুর থেকে গ্রেপ্তারের পর প্রায় ১৮ দিন সিটিটিসি’র হেফাজতে থাকা আল-আমিনকে ব্যাপক নির্যাতন করা হয়। পরে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানে তার মৃত্যু হয়। দায় এড়াতে তার মরদেহ তুলশীখালী সেতু থেকে ধলেশ্বরী নদীতে ফেলে দেয়া হয়। এ ঘটনায় তৎকালীন সিটিটিসি প্রধান ডিআইজি মো. আসাদুজ্জামান, তৎকালীন এডিসি ইশতিয়াক আহমেদ পিপিএম, পুলিশ পরিদর্শক (নি:) মো. আসাদুজ্জামান মিয়া, পুলিশ পরিদর্শক (নি:) মো. মেজবাহ উদ্দিন আহাম্মেদ এবং এসআই (নি:) তৌহিদুল ইসলাম সুমনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে তদন্ত সংস্থা। এই মামলার তদন্তে প্রত্যক্ষদর্শীসহ ৩০ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়েছে। এতে ৫ জন ভুক্তভোগীর ওপর নির্যাতনের তথ্য পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজনকে হত্যা, পাঁচজনকে মারধর এবং চারজনকে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। আগামী সপ্তাহে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ মামলার আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার কথা রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালের ৩০শে জানুয়ারি রাতে গাজীপুর মহানগরের চতর বাজারসংলগ্ন মাদ্রাসা আব্দুল্লাহ ইব্‌নে মাসুদ (রহ.) এতিমখানার প্রিন্সিপাল মাওলানা আবুল হোসাইন আল-আমিনকে গ্রেপ্তার করে সিটিটিসি’র একটি দল। এরপর তাকে মাইক্রোবাসে করে ঢাকার মিন্টো রোডে সিটিটিসি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ভবনের সপ্তম তলায় অবস্থিত একটি গোপন হাজতখানায় তাকে রাখা হয়। হেফাজতে থাকা অবস্থায় আল-আমিনের কাছ থেকে তথ্য আদায়ের নামে তাকে বারবার জিজ্ঞাসাবাদ এবং শারীরিক নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের একপর্যায়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে সিটিটিসি’র মেডিকেল ইউনিটে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। পরে গুরুতর অসুস্থ হলে পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়।

ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় সাক্ষ্য দেয়া পুলিশের এক কর্মকর্তার জবানবন্দিতে উঠে আসে লাশ গুমের ভয়াবহ তথ্য। জবানবন্দিতে বাবুল মিয়া নামের এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ১৭ই ফেব্রুয়ারি রাত ১২টার দিকে আল-আমিন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেয়া হয়। রাত ২টা ৫০ মিনিটের দিকে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় সকাল আনুমানিক ৬টার দিকে তিনি মারা যান। মৃত্যুর পরও মরদেহ হাসপাতাল থেকে স্বাভাবিক নিয়মে হস্তান্তর করা হয়নি। বরং স্ট্রেচারে করে মরদেহ মাইক্রোবাসে তুলে রাখা হয়। এরপর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মরদেহটি নিয়ে গাড়ি সারাদিন বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করে। ১৮ই ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ১১টার দিকে মরদেহ বহনকারী গাড়িটি সিটিটিসি কার্যালয়ে আনা হয়। সেখানে প্রবেশের কিছুক্ষণ পর বিদ্যুৎ চলে যায়। এডিসি ইশতিয়াক আহমেদের নির্দেশে মরদেহ গাড়ি থেকে নামিয়ে নিচতলার মূল প্রবেশপথের সামনের একটি কক্ষে নেয়া হয়। প্রায় ৩০ থেকে ৪০ মিনিট পর মরদেহটি নীল-আকাশি রঙের পলিথিনে মুড়িয়ে আবার গাড়িতে তোলা হয়।

এরপর দু’টি মাইক্রোবাসে করে মরদেহ নিয়ে সিটিটিসি কার্যালয় থেকে বের হন সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরা। প্রথম গাড়িতে এডিসি ইশতিয়াক আহমেদসহ কয়েকজন কর্মকর্তা এবং পেছনের গাড়িতে অস্ত্রধারী দলের সদস্যরা ছিলেন। রাত আনুমানিক ১টা ৩০ মিনিটে ঢাকা-নবাবগঞ্জ সড়কের তুলশীখালী সেতুর ওপর দু’টি গাড়ি থামানো হয়। এডিসি ইশতিয়াক আহমেদের নির্দেশে কর্মকর্তারা গাড়ি থেকে নেমে আশপাশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। পরে পলিথিনে মোড়ানো মরদেহটি সেতুর ওপর থেকে নিচের প্রবাহমান নদীতে ফেলে দেয়া হয়। মরদেহ নদীতে ফেলার পরপরই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা গাড়িতে উঠে সেতু এলাকা ত্যাগ করেন। রাত আনুমানিক ২টা ২৫ মিনিটে তারা সিটিটিসি কার্যালয়ে ফিরে আসেন। সেখানে এডিসি ইশতিয়াক আহমেদ সবাইকে এ বিষয়ে মুখ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন বলেও জবানবন্দিতে দাবি করা হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, আল-আমিনকে গ্রেপ্তারের আগে আদালতের মাধ্যমে রিমান্ড নেয়ার জন্য তথ্য সংগ্রহের একটি প্রক্রিয়া দেখানো হলেও সিটিটিসি হেফাজতে তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। একই প্রক্রিয়ায় আরও কয়েকজনকে আটক, নির্যাতন এবং বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর অভিযোগও তদন্তে এসেছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা মতামতে বলেছেন, সাক্ষ্য, পারিপার্শ্বিকতা এবং অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণে পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, কয়েকটি ধারায় মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ অপরাধের সঙ্গে নির্দেশ, প্ররোচনা, উসকানি, সহায়তা, সম্পৃক্ততা ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগও আনা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে এসব কর্মকাণ্ডকে ‘ব্যাপক’, ‘লক্ষ্যভিত্তিক’ ও ‘পদ্ধতিগত’ নিপীড়নের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্ত সংস্থার ভাষ্য, ভুক্তভোগীকে বলপূর্বক অপহরণ করে অবৈধভাবে আটক, নির্যাতন ও হত্যার পর মরদেহ গুমের ঘটনা মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় পড়ে।