[একটি বিয়ের আসর থেকে একটি জেলার সংঘর্ষ—তুচ্ছ ঘটনাকে ‘ইজ্জতের’ প্রশ্ন বানানোর সংস্কৃতি কি আমরা স্বাভাবিক করে ফেলছি?]
একটি আস্ত খাসি। বিয়ের আয়োজন। একজন বর। আর তারপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোড়ন।ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় বিয়ের অনুষ্ঠানে বরের জন্য ‘খদর’-এ আস্ত খাসি না থাকায় জাপানপ্রবাসী জুনায়েদ মিয়ার বিয়ে না করে চলে যাওয়ার খবর ১৮ আগস্ট ছড়িয়ে পড়ে। পরদিনই খবর আসে, তিনি অন্যত্র বিয়ে করেছেন এবং নতুন বিয়েতে আস্ত খাসির আয়োজনও ছিল। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটি নতুন মাত্রা পায়।
দৃশ্যটি নিঃসন্দেহে অস্বাভাবিক। কিন্তু এই ঘটনাকে শুধু হাসির গল্প বানিয়ে ফেললে আমরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি এড়িয়ে যাব।
খাসি এখানে আসল বিষয় নয়, আসল বিষয় আমাদের সামাজিক সংস্কৃতি। কারণ একই জেলার আরেক প্রান্তে এমন বহু ঘটনা ঘটেছে, যেখানে সূচনা ছিল সামান্য কোনো বিষয় নিয়ে; কিন্তু শেষ হয়েছে সংঘর্ষ, রক্তপাত, ঘরবাড়ি ভাঙচুর কিংবা মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। ১ আগস্ট বিজয়নগরে শিশুদের লুডু খেলা নিয়ে বিরোধের জেরে দুই গোষ্ঠীর সংঘর্ষে একজন নিহত এবং অন্তত ১০ জন আহত হন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর পেছনে আগে থেকেই দুই গোষ্ঠীর আধিপত্যের বিরোধ ছিল। ৮ আগস্ট নবীনগরে আধিপত্য বিস্তার ও পুরোনো বিরোধের জেরে দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হয়; বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটে। একই সময়ের আরেক ঘটনায় মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে সংঘর্ষের পর অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
আর ১৯ আগস্ট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইন্সেও উচ্চশব্দে গান বাজানোকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হওয়ার খবর এসেছে। এই ঘটনাগুলো একে অপরের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। কিন্তু এগুলোর মধ্যে একটি অস্বস্তিকর মিল আছে, মতবিরোধ দ্রুত সংঘাতে রূপ নেওয়া।
খাসির গল্পে যে প্রশ্নটি জরুরি - জুনায়েদ মিয়ার বিয়ের ঘটনাটি নিয়ে ইতোমধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধিত বয়ানও সামনে এসেছে। প্রথম দিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, খদরে আস্ত খাসি না থাকায় তিনি বিয়ে না করে চলে যান। পরে জুনায়েদ নিজে দাবি করেছেন, শুধু খাসির বিষয় নয়, পূর্বনির্ধারিত কাবিনের চেয়ে ১০ গুণ বেশি কাবিন দাবি এবং তাকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।
এই দাবি সত্য কি না, তা স্বাধীনভাবে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত সিদ্ধান্তে যাওয়া উচিত নয়। এই জায়গাটিই সাংবাদিকতা ও সামাজিক প্রতিক্রিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
একটি ঘটনা ভাইরাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা একটি গল্প বানিয়ে ফেলি। তারপর সেই গল্পের ওপর ভিত্তি করে রায় দিয়ে দিই। মানুষকে নাম দিই, অপমান করি, ঘৃণা ছড়াই। অথচ পরে যদি ঘটনার আরেকটি দিক সামনে আসে? তখন আমাদের আগের রায় কোথায় দাঁড়াবে?
তাই জুনায়েদ মিয়ার আচরণ অস্বাভাবিক মনে হলেও, তাকে ‘খাসি জোনায়েদ’ নামে দেশ-বিদেশে অপমান করার আহ্বান কোনোভাবেই দায়িত্বশীল সামাজিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে না। সমালোচনা হোক আচরণের; ব্যক্তিকে গণহয়রানি নয়।একইভাবে, বিয়ের দিন কনের পরিবারের জন্য যে মানসিক আঘাত তৈরি হয়েছে, সেটিও হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। একটি বিয়ে ভেঙে যাওয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একজন নারী, তার পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং ভবিষ্যৎ জীবন।
আমরা কেন ছোট বিষয়কে বড় করে ফেলি? সমাজবিজ্ঞানের একটি মৌলিক শিক্ষা হলো, কোনো সামাজিক ঘটনা শুধু তার দৃশ্যমান কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। একটি টিস্যু হয়তো সংঘর্ষের কারণ বলে সংবাদে আসে। কিন্তু এটি আসল কারণ নয়। একটি টর্চের আলো হয়তো ঝগড়ার সূচনা করে। কিন্তু টর্চ আসল কারণ নয়। একটি লুডু খেলাও আসল কারণ নয়।
নাসিরনগরে মার্চে টর্চের আলো চোখে পড়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে এক যুবক নিহত হওয়ার ঘটনাও সংবাদে এসেছে। স্থানীয় সূত্রের বর্ণনায় দুই গোষ্ঠীর মধ্যে আগে থেকেই প্রভাব বিস্তারের সম্পর্ক ছিল। অর্থাৎ ছোট ঘটনাগুলো অনেক সময় স্ফুলিঙ্গ। দাহ্য পদার্থ আগে থেকেই জমে থাকে।
সেই দাহ্য পদার্থের নাম, গোষ্ঠীগত আনুগত্য, আধিপত্যের লড়াই, পুরোনো বিরোধ, রাজনৈতিক প্রভাব, জমি ও অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং সবচেয়ে বড় কথা, ‘আমাদের ইজ্জত’-এর ধারণা।
ইজ্জত যখন যুক্তির চেয়ে বড়! একজন মানুষ যখন মনে করেন, ‘আমাকে ছাড় দিলে আমি হেরে যাব’, তখন আপস কঠিন হয়ে যায়। একটি গোষ্ঠী যখন মনে করে, ‘ওদের একজন আমাদের একজনকে মারলে আমরা বসে থাকব কেন’, তখন ব্যক্তিগত বিরোধ গোষ্ঠীগত সংঘাতে পরিণত হয়। একজন বর যখন মনে করেন, ‘আমার জন্য নির্ধারিত খাবার নেই, এটা আমার সম্মানের প্রশ্ন’, তখন খাবার আর খাবার থাকে না; তা হয়ে ওঠে মর্যাদার প্রতীক। এই মানসিকতার বিপদ এখানেই।
যে সমাজে সবকিছু ইজ্জতের প্রশ্ন, সেখানে কেউ সহজে ক্ষমা চাইতে পারে না। আর যে সমাজে ক্ষমা চাওয়া দুর্বলতা, আপস পরাজয় এবং পিছিয়ে আসা অপমান, সেখানে সংঘর্ষের সম্ভাবনা সবসময় বেশি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বদনাম নয়, সমস্যার স্বীকারোক্তি দরকার।
ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে ‘ঝগড়াটে মানুষের জেলা’ বলে চিহ্নিত করা খুব সহজ। কিন্তু সেটি সমাধান নয়, বরং একটি জেলার কোটি মানুষের ওপর অন্যায় সাধারণীকরণ। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শিক্ষা, সংস্কৃতি, ব্যবসা, প্রবাসী আয় ও নানা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা একটি জেলা। সংঘর্ষের খবর তার সম্পূর্ণ সামাজিক পরিচয় নয়। কিন্তু সংঘর্ষের ধারাবাহিকতা অস্বীকার করাও সমাধান নয়। ২০২৬ সালের মার্চে নাসিরনগরে রাজনৈতিক বিরোধের জেরে দুইজন নিহত হওয়ার খবর এসেছে। জুলাইয়ে কসবায় তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মাইকে ঘোষণা দিয়ে তিন গ্রামের সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। আগস্টে আবার লুডু, আধিপত্যের বিরোধ এবং অন্য নানা ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। অর্থাৎ সমস্যাটি কৌতুকের নয়। আবার ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ এমনই’ বলেও সমস্যার সমাধান হবে না।
প্রশ্ন হলো কেন স্থানীয় বিরোধ এত দ্রুত সমষ্টিগত সহিংসতায় রূপ নেয়? আইন আছে, কিন্তু সামাজিক নিয়ন্ত্রণ কোথায়?
প্রতিটি বিরোধের সমাধান পুলিশ দিয়ে করা সম্ভব নয়। পুলিশের দায়িত্ব আইন প্রয়োগ করা। কিন্তু সমাজের দায়িত্ব সংঘর্ষের আগেই মানুষকে থামানো। ইউনিয়ন পরিষদ, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সবাইকে এই জায়গায় দায়িত্ব নিতে হবে।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যারা গোষ্ঠীগত সংঘর্ষকে নিজেদের ক্ষমতা ও প্রভাব ধরে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন, তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কারণ সংঘর্ষে আহত হয় সাধারণ মানুষ। মামলা হয় সাধারণ মানুষের নামে। দোকান ভাঙে সাধারণ মানুষের। ঘর পুড়ে সাধারণ মানুষের। সন্তান হারায় সাধারণ পরিবার।
যারা দূর থেকে গোষ্ঠীর ‘ইজ্জত’ রক্ষার কথা বলেন, তাদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে থাকেন না, মামলা চালান না, আহত পরিবারের সংসার চালান না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও দায় এড়াতে পারে না! ‘খাসি জোনায়েদ’ বানিয়ে ফেলা যত সহজ, তার সামাজিক ক্ষতি বোঝা তত কঠিন। ভাইরাল সংস্কৃতি মানুষকে খুব দ্রুত বিচারক বানিয়ে দিয়েছে। একটি ভিডিও, একটি ছবি, একটি পোস্ট—ব্যস, রায় হয়ে গেল। অথচ সত্যের সবচেয়ে বড় শত্রু কখনো কখনো মিথ্যা নয়; অসম্পূর্ণ সত্য।
জুনায়েদের ঘটনায় প্রথমে যে বয়ান সামনে এসেছিল, পরে তার নিজের বক্তব্যে নতুন অভিযোগ যুক্ত হয়েছে। সেই অভিযোগ সত্য কি না, সেটি যাচাইয়ের বিষয়। কিন্তু এটুকুই দেখায়, একটি ভাইরাল ঘটনার সব দিক প্রথম কয়েক ঘণ্টায় জানা যায় না।তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ দরকার, কিন্তু দায়িত্বশীল প্রতিবাদ।
খাসি আমাদের কী শেখায়? একটি বিয়েতে খাসি থাকবে কি থাকবে না? এটি শেষ পর্যন্ত একটি পারিবারিক আয়োজনের বিষয়। কিন্তু খাসি যদি ‘সম্মান’-এর প্রতীক হয়ে যায়, টিস্যু যদি ‘অপমান’-এর প্রতীক হয়ে যায়, টর্চলাইট যদি ‘প্রতিপক্ষের চ্যালেঞ্জ’ হয়ে যায়, লুডু যদি গোষ্ঠীর মর্যাদার প্রশ্ন হয়ে যায়, তাহলে সমস্যা আর খাসিতে নেই। সমস্যা আমাদের সামাজিক মনস্তত্ত্বে।
আমাদের সন্তানদের শেখাতে হবে, সব কথার উত্তর দিতে হয় না। সব অপমানের প্রতিশোধ নিতে হয় না। সব বিরোধে দল বাঁধতে হয় না। আর নিজের সম্মান রক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় সবসময় প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা নয়; অনেক সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারাও সম্মান।
একটি বিয়ের আসরে খাসি না থাকার গল্প তাই আমাদের সামনে বড় একটি প্রশ্ন রেখে গেছে। আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে খাবার নিয়ে বিয়ে ভাঙবে, টিস্যু নিয়ে সংঘর্ষ হবে, টর্চের আলোয় মানুষ মরবে, লুডু নিয়ে রক্ত ঝরবে? নাকি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে মতভেদ থাকবে, কিন্তু সহিংসতা থাকবে না; অপমান হবে না, কিন্তু ক্ষমা থাকবে; গোষ্ঠী থাকবে, কিন্তু আইনের ওপরে কেউ থাকবে না?
খাসির গল্পটি হাসির হতে পারে। কিন্তু এর আয়নাটা মোটেই হাসির নয়। কারণ খাসি কখনো সমাজ ভাঙে না। সমাজ ভাঙে তখনই, যখন মানুষ ছোট বিষয়কে বড় অহমিকার যুদ্ধে পরিণত করে। এখন সিদ্ধান্ত আমাদের। খাসিকে নিয়ে হাসব, নাকি খাসির আড়ালে নিজেদের সমাজটাকে একবার গভীরভাবে দেখব?
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]
