ট্রাম্পকে ঘিরে নতুন রহস্যের কেন্দ্রে সুন্দরী নারী, কে এই নাটালি?

ট্রাম্পকে ঘিরে নতুন রহস্যের কেন্দ্রে সুন্দরী নারী, কে এই নাটালি?

ফন্ট সাইজ:

কাঁধ ছোঁয়া স্বর্ণালি চুল, কানে সোনার দুল আর লাল পোশাকে ২০২০ সালের রিপাবলিকান ন্যাশনাল কনভেনশনে হাজির হয়েছিলেন নাটালি হার্প। নিজেকে তিনি পরিচয় দিয়েছিলেন, ক্যালিফোর্নিয়ার এক সময়ের বিস্মৃত আমেরিকান হিসেবে। সেই মঞ্চেই তিনি ডনাল্ড ট্রাম্পকে তুলনা করেছিলেন হলিউডের বিখ্যাত চরিত্র জর্জ বেইলির- ইটস অ্যা ওয়ান্ডারফুল লাইফ সিনেমায় জেমস স্টুয়ার্ট অভিনীত সেই সাধারণ মানুষের নায়কের সঙ্গে।

সেদিন হাসিমুখে হার্প বলেছিলেন, জর্জ বেইলির বাবা ঠিকই বলেছিলেন- মানুষ সঙ্গে করে শুধু সেটাই নিয়ে যেতে পারে, যা সে অন্যদের দিয়ে গেছে। মিস্টার প্রেসিডেন্ট, সে হিসেবে আপনিই বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মানুষ।
ছয় বছর পর সেই নাটালি হার্প এখন ডনাল্ড ট্রাম্পের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও অনুগত সহযোগীদের একজন। তার সরকারি পদ প্রেসিডেন্টের বিশেষ সহকারী এবং প্রেসিডেন্টের নির্বাহী সহকারী। এই পদে তার বার্ষিক বেতন ১ লাখ ৫০ হাজার ডলার।
তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে তার আরেকটি পরিচিতি রয়েছে- ‘হিউম্যান প্রিন্টার’ বা ‘মানব প্রিন্টার’। কারণ ট্রাম্পের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন তথ্য প্রিন্ট করে হাতে তুলে দেয়াই তার অন্যতম কাজ।

এতদিন ট্রাম্পকে ঘিরে বিশাল রাজনৈতিক নাটকের জগতে হার্প ছিলেন অনেকটা পার্শ্বচরিত্র। কিন্তু চলতি সপ্তাহে পরিস্থিতি বদলে যায়।
ডেমোক্র্যাট সিনেটর এবং ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী জন অসফ ট্রাম্পকে আক্রমণ করে এক নির্বাচনী বক্তৃতায় বলেন, ট্রাম্প নিজের দায়িত্ব পালনের বদলে “বলরুম বানাতে এবং নাটালির সঙ্গে ভ্রমণ করতে” বেশি আগ্রহী।
এই মন্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় ব্যাপক জল্পনা, ট্রাম্প ও হার্পের সম্পর্ক আসলে ঠিক কী ধরনের? বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় হোয়াইট হাউস।

এনিয়ে গত সোমবার সিএনএনের সাংবাদিক ক্রিস্টেন হোমস অসফের মন্তব্য নিয়ে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করলে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। হোয়াইট হাউসের বেনামি ‘র‌্যাপিড রেসপন্স’ টিমও হোমসকে আক্রমণ করে সামাজিক মাধ্যমে লিখে, একদিন আপনার সন্তানরা আপনার এই জঘন্য ও অমানবিক প্রশ্নের কথা জানতে পারবে।
কিন্তু এই প্রতিক্রিয়া জল্পনা থামানোর বদলে যেন আরও উসকে দিয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে অসফের জাতীয় পরিচিতিও বেড়েছে। একই সঙ্গে লাখো মানুষ এখন একই প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন- নাটালি হার্প আসলে কে?

কে এই নাটালি হার্প?
৩৫ বছর বয়সী ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা হার্প ২০১২ সালে সান দিয়েগোর খ্রিস্টান লিবারেল আর্টস কলেজ পয়েন্ট লোমা নাজারিন ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক হন। ২০১৫ সালে তিনি ভার্জিনিয়ার লিঞ্চবার্গের ইভানজেলিক্যাল প্রতিষ্ঠান লিবার্টি ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ করেন।

ট্রাম্প যখন ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পুনর্র্নিবাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ২০১৯ সালে হার্প লিংকডইনে একটি পোস্ট লেখেন, আমি জীবন্ত প্রমাণ, হেলথকেয়ারের দলই ট্রাম্পের দল। সেখানে তিনি নিজের হাড়ের ক্যানসারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
হার্পের দাবি, ২০১৫ সালের ৯ নভেম্বর একজন নার্স ভুল করে তার আইভিতে জীবাণুমুক্ত পানি ব্যবহার করেছিলেন, যা তাকে দীর্ঘদিন ঘরবন্দি করে ফেলে এবং চিকিৎসার জন্য নতুন পথ খুঁজতে বাধ্য করে।

তার অভিযোগ ছিল, তার উপসর্গ বিশ্লেষণ করে রোগ নির্ণয়ের বদলে ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত অঙ্গরাজ্য ও দেশ তাকে ওপিওয়েড, বারবিচুরেট, মেডিকেল মারিজুয়ানা, প্রতিবন্ধী ভাতা, ‘ডু নট রিসাসিটেট’ নির্দেশনা এবং এমনকি ‘ডেথ উইথ ডিগনিটি’র মতো বিকল্পের কথা জানিয়েছিল। একবার তাকে স্বেচ্ছায় খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করার পদ্ধতি সম্পর্কেও নির্দেশ দেয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
এ ছাড়া হার্প ট্রাম্পের স্বাক্ষরিত ২০১৮ সালের ‘রাইট টু ট্রাই’ আইনকে তার চিকিৎসাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে তুলে ধরেন। তার দাবি, এই আইনের মাধ্যমে তিনি পরীক্ষামূলক চিকিৎসা নেয়ার সুযোগ পান এবং সেই চিকিৎসা সফল হয়।

তিনি সেই সময় আরও লিখেছিলেন, আমার অনকোলজিস্ট আমাকে বলেননি যে আমার অন্য বিকল্প আছে। ডনাল্ড ট্রাম্প আমাকে সেই বিকল্পের কথা জানিয়েছেন।
এরপর তার লিংকডইন পোস্টটি নজরে আসে রুপার্ট মারডকের রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের। তাকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ট্রাম্পও সামাজিক মাধ্যমে হার্পের প্রশংসা করেন এবং লিখেন, ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করা হার্প ফক্সের অনুষ্ঠানে “দারুণ” অতিথি ছিলেন এবং ‘রাইট টু ট্রাই’ আইন অসাধারণ ফল দিচ্ছে।
এরপরই আসে ২০২০ সালের রিপাবলিকান ন্যাশনাল কনভেনশনের সেই আলোচিত বক্তৃতা। তার বাবা মারা যাওয়ার মাত্র এক মাস পর মঞ্চে উঠে হার্প ট্রাম্পের ভূয়সী প্রশংসা করেন। এমনকি বৃটেনের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসকেও খোঁচা দিয়ে ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনি না থাকলে আমি আজ বেঁচে থাকতাম না।

‘হিউম্যান প্রিন্টার’ হয়ে ট্রাম্পের পাশে
এরপর হার্প ও তার মা ক্যালিফোর্নিয়া ছেড়ে ফ্লোরিডায় চলে যান। তারা ওয়েস্ট পাম বিচের একটি ১৮ তলা অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন, ট্রাম্পের মার-এ-লাগো এস্টেট থেকে যার দূরত্ব মাত্র প্রায় তিন মাইল। ২০২০ সালে হার্প যোগ দেন ডানপন্থী সংবাদমাধ্যম ওয়ান আমেরিকা নিউজ নেটওয়ার্কে (ওএএনএন)। সেখানে উপস্থাপক হিসেবে তিনি ট্রাম্পের সেই অভিযোগ প্রচার করেন যে, ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন জো বাইডেনের কাছে চুরি হয়ে গেছে।
২০২২ সালে ওএএনএন ছাড়েন হার্প। এরপর তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। তখন ট্রাম্প ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট, তার বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারি মামলা চলছিল এবং আবার হোয়াইট হাউসে ফেরার প্রচেষ্টাকে অনেকেই অসম্ভব বলে মনে করছিলেন।

নির্বাচনী প্রচারে হার্প ট্রাম্পের কাছে মূলত ইতিবাচক খবর ও তথ্য পৌঁছে দিতেন। নিউ ইয়র্ক টাইমস ২০২৪ সালে তাকে ‘হিউম্যান প্রিন্টার’ হিসেবে উল্লেখ করে জানায়, তার কোনো আনুষ্ঠানিক পদ ছিল না। তবে প্রচারাভিযানে সহকর্মীরা তাকে এই নামে ডাকতেন। কারণ তিনি ট্রাম্পের পেছনে পেছনে একটি বহনযোগ্য প্রিন্টার ও সেটি চালানোর ব্যাটারি নিয়ে ঘুরতেন, যাতে ট্রাম্পের পছন্দ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তথ্য কাগজে প্রিন্ট করে দিতে পারেন।
ট্রাম্প আবার হোয়াইট হাউসে ফেরার পর হার্পকে প্রায়ই তার পাশে দেখা যায়। তিনি এখন প্রেসিডেন্টের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সহযোগীদের একজন।
গত মাসে কথিত ইরানি হত্যাচেষ্টার হুমকির কারণে তুরস্কে ট্রাম্পকে গোপনে বিমান বদল করতে হয়েছিল বলে জানা যায়। সেই সময় অন্য কর্মকর্তারা ও সাংবাদিকেরা ডিকয় এয়ার ফোর্স ওয়ানে থেকে গেলেও সামরিক বিমানে ট্রাম্পের সঙ্গে যাওয়া অল্প কয়েকজনের মধ্যে হার্পও ছিলেন।

হার্পের এক পরিচিত ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ট্রাম্পের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ ড্যান স্ক্যাভিনো সামরিক বিমানে থাকায় কেউ প্রশ্ন তোলেনি। কিন্তু তার মতে, অনেক ক্ষেত্রেই হার্প স্ক্যাভিনোর চেয়েও বেশি দক্ষ।
ওই ব্যক্তি আরও বলেন, হার্প সুন্দরী হওয়ার কারণে অনেকে তার বুদ্ধিমত্তা, স্পষ্টভাষিতা, আনুগত্য, বিশ্বস্ততা এবং রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা বুঝতে পারেন না।

‘অভিভাবক ও রক্ষাকর্তা’
হার্প শুধু ট্রাম্পের তথ্য সরবরাহকারী নন। তার চিন্তাভাবনা এবং সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্পের বক্তব্য তৈরিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হার্প ট্রাম্পকে প্রস্তাবিত ট্রুথ সোশ্যাল পোস্ট দেখান। অনেক সময় এসব পোস্টে পুরোনো বা পুনর্ব্যবহৃত কনটেন্ট থাকে। এরপর তিনি ট্রাম্পের অ্যাকাউন্টে লগইন করে সেগুলো প্রকাশ করেন।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, এসব পোস্টের মধ্যে এমন একটি বর্ণবাদী ভিডিওও ছিল যেখানে বারাক ও মিশেল ওবামাকে বানরের মতো দেখানো হয়েছিল। আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি এমন একটি ছবিও ছিল, যেখানে ট্রাম্পকে যিশু খ্রিস্টের রূপে দেখানো হয়।
এ বছরের প্রকাশিত ‘রেজিম চেঞ্জ’ বইয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক ম্যাগি হ্যাবারম্যান ও জনাথন সোয়ান লিখেন, ট্রাম্পের প্রতি হার্পের আনুগত্য এতটাই গভীর ছিল যে তিনি তাকে ভালোবাসা ও প্রশংসায় ভরা চিঠিও লিখতেন।
এক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, আমার কাছে আপনিই সবকিছু। অন্য এক চিঠিতে লিখেছিলেন, আমি আপনাকে আনন্দ দিতে চাই, যেন এমন একটি দিন পার করতে পারি যেদিন আমাদের কখনোই কাজ নিয়ে কথা বলতে হবে না।

আরেকটিতে লিখেছিলেন, আমি কখনোই আপনাকে হতাশ করতে চাই না এবং ট্রাম্পকে নিজের এই জীবনের অভিভাবক ও রক্ষাকর্তা বলে উল্লেখ করেছিলেন।
হ্যাবারম্যান ও সোয়ান তাদের বইয়ে হার্পের কাজের ধরনও বর্ণনা করেছেন। তাদের মতে, ট্রাম্প যখন অন্যদের সঙ্গে কথা বলতেন, হার্প সাধারণত পাশে একটি চেয়ারে বসে ল্যাপটপ খুলে মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। ট্রাম্প নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত তিনি সাধারণত কথায় অংশ নিতেন না।
এদিকে জন অসফের মন্তব্যের পর হোয়াইট হাউসের অস্বাভাবিক তীব্র প্রতিক্রিয়া নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে- ট্রাম্পের জীবনে নাটালি হার্পের ভূমিকা আসলে কতটা গভীর?

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক কংগ্রেসনাল সহযোগী কার্ট বারডেলা বলেন, পরিস্থিতি তাকে বিখ্যাত একটি ইংরেজি প্রবাদ মনে করিয়ে দিচ্ছে- “প্রতিবাদ যত বেশি, সন্দেহ তত বেশি।”
তার ভাষায়, আপনারা বিষয়টিকে আরও বড় করে তুলেছেন। জীবনে ‘অনুপাতিক প্রতিক্রিয়া’ বলে একটা বিষয় আছে। কিন্তু হোয়াইট হাউস থেকে আমরা যে প্রতিক্রিয়া দেখলাম, তা ছিল বিশাল- যা বরং আরও প্রশ্ন ও কৌতূহল তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ভাবছে যে এত তীব্র প্রতিক্রিয়ার পেছনে নিশ্চয়ই কিছু একটা আছে। বারডেলার মতে, হোয়াইট হাউস যদি ভেবে থাকে তাদের প্রতিক্রিয়ায় জল্পনা ও গুজব থেমে যাবে, তাহলে সেই পরিকল্পনা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। বরং নাটালি হার্প এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আলোচনায়।