তখনও রাত ২টো বাজেনি। ঘুমাচ্ছিলেন। পাশের বিছানায় ছিলেন তাঁর ভাই। হঠাৎ চিৎকার-চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙে। জানলা খুলে দেখেন, নীচ থেকে সকলে চিৎকার করে বলছেন, ‘‘আগুন লেগেছে।’’ শোনামাত্রই ভাইকে নিয়ে বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু দরজা খুলতেই চাপ চাপ ধোঁয়া ঢুকে পড়ে ঘরে। তার মধ্যেই কোনওক্রমে ছাদে ওঠেন তাঁরা। দমকলবাহিনী আসার আগে পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন বাংলাদেশের ঢাকার বাসিন্দা মহম্মদ আসাফুল জামাল এবং তাঁর ভাই। ছিলেন আরও অনেকেই। অগ্নিকাণ্ডের পর নিউ মার্কেটের হোটেল থেকে বেরিয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা শোনাচ্ছেন আবাসিকেরা।
শনিবার থেকে মির্জা গালিব স্ট্রিটের ওই ভবনের চারতলায় থাকছিলেন জামাল। কলকাতায় এসেছেন ব্যবসার কাজে। সঙ্গে রয়েছেন তাঁর ভাই। মুকুন্দপুরের এক হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা চলছিল। মঙ্গলবার খাওয়াদাওয়ার পর ঘুমোতে যান তাঁরা। তখনও বুঝতে পারেননি ঘণ্টাকয়েক পরে কী অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে চলেছেন তাঁরা। ঢাকার গাজিপুরের বাসিন্দা আসাফুলের কথায়, ‘‘নীচে নামতে পারছিলাম না। কোনওক্রমে ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে ওই তলার সকলে ছাদে উঠি। ২০-২৫ জন ছিলাম। সকলে চলে যাই জলের ট্যাঙ্কের কাছে। বুঝতে পারছিলাম না কোন দিক থেকে আগুন আসতে পারে। তবে আমরা ঠিক করেছিলাম, আগুনের শিখা দেখতে পেলেই ট্যাঙ্ক থেকে জল নিয়ে নেবানোর চেষ্টা করব।’’
একই অভিজ্ঞতা ঢাকার আর এক বাসিন্দা মহম্মদ নাজমুল সরকারের। হৃদ্রোগের চিকিৎসা করাতে তাঁর কলকাতায় আসা। ছিলেন চারতলার ওই হোটেলে। তাঁর কথায়, ‘‘একটা সময় মনে হয়েছিল মরেই যাব। অক্সিজেনের অভাব ছিল। শ্বাস নিতে পারছিলাম না।’’ রাতের অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে বার বার তাঁর গলা কেঁপে যাচ্ছিল।
নাজমুলের কথায়, ‘‘হোটেলের কর্মচারীরা বার বার বলছিলেন উপরে উঠুন। কিন্তু উপরে ওঠার রাস্তা এতটাই সরু যে একজন করেই উঠতে পারেন। লোহার সিঁড়ি। কোথা দিয়ে পালাব, সেটাই বুঝতে পারছিলাম। নীচে নামার কোনও পরিস্থিতি ছিল না। ধোঁয়ায় ঢেকে গিয়েছিল। এক হাত দূরে কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না। গেট খোলার সঙ্গে সঙ্গে ধোঁয়া ঢুকে পড়ে। চারপাশ অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে কোনও রকমে উপরে উঠি।’’ আবাসিকদের অভিযোগ, আগুন লাগার পরেও উদাসীন ছিলেন হোটেলের কর্মীরা। অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র ছিল না। বাংলাদেশ থেকে সন্তানকে নিয়ে সপরিবার ওই ভবনের একতলার অন্য একটি হোটেলে উঠেছিলেন কৌসর হোসেন। তাঁর কথায়, ‘‘আগুন লেগেছে প্রথমে জানতেই পারিনি। আমরা ঘুমাচ্ছিলাম। হোটেলের কর্মীরা এসে দরজা ধাক্কা দিয়ে ডাকেন আমাদের। তার পরে হুড়োহুড়ি করে হোটেলের বাইরে আসি।’’ তবে বাইরে আসার পর তাঁর মনে পড়ে, হোটেলের ঘরেই রয়ে গিয়েছে তাঁদের পাসপোর্ট। সেগুলি আনতে আবার হোটেলে ঢুকেছিলেন বলে জানান কৌসর।
নিউ মার্কেটের হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে এখনও পর্যন্ত ন’জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। তাঁদের মধ্যে ছ’জন পুরুষ, দু’জন মহিলা এবং একটি শিশু রয়েছে। তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই বাংলাদেশি।
সূত্র- আনন্দবাজার
