প্রথম আলো
‘আইনশৃঙ্খলায় স্বস্তি আসেনি, পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ায়নি পুলিশ’-এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রথম পাতার খবর। প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পরও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে প্রত্যাশিত স্বস্তি আসেনি। খুন, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং পুলিশের ওপর হামলার মামলা বেড়েছে। ব্যস্ত সড়ক, বাজার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্যে গুলি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই এবং আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও মানুষের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর মাঠের পুলিশ এখনো পুরো মনোবল নিয়ে কাজে ফিরতে পারেনি।
সারা দেশে দায়ের হওয়া সাত শ্রেণির মামলার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে ২১ হাজার ৭৫৬টি মামলা হয়েছে। এর আগের ছয় মাসে, অর্থাৎ গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত একই সাত শ্রেণিতে মামলা হয়েছিল ২১ হাজার ২২৮টি। সে হিসাবে মামলার সংখ্যা বেড়েছে ৫২৮টি বা প্রায় আড়াই শতাংশ।
সাত শ্রেণি হলো খুন, নারী ও শিশু নির্যাতন, পুলিশের ওপর হামলা, ডাকাতি ও দস্যুতা, ছিনতাই, অপহরণ এবং চুরি। এর মধ্যে প্রথম তিন শ্রেণিতে মামলা বেড়েছে। কমেছে অন্য চার শ্রেণিতে। তবে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাওয়া এই হিসাব মূলত মামলার, সংশ্লিষ্ট সময়ে সংঘটিত সব অপরাধের নয়। কারণ, অনেক ভুক্তভোগী থানায় যান না বা অভিযোগ মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয় না। ফলে শুধু মামলার সংখ্যা দিয়ে অপরাধের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া কঠিন।
সরকার গঠনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত মে মাসে পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানে তিনি মব সহিংসতা, কিশোর গ্যাং ও মাদকের বিস্তার রোধে পুলিশকে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার নির্দেশ দেন। কিন্তু সরকারের প্রথম ছয় মাসের কাছাকাছি সময়ের অপরাধ পরিস্থিতি ও মাঠপর্যায়ের চিত্রে এখনো প্রত্যাশিত উন্নতি দেখা যাচ্ছে না।
তবে সরকারের মূল্যায়ন ভিন্ন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমান সরকারের বিগত ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। তবে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী এটিকে আরও সুসংহত করতে কিছুটা সময় প্রয়োজন।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সদর দপ্তরে একাধিক বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকে ছিনতাই, খুন, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সব মহানগর পুলিশের কমিশনার, রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক এবং জেলার পুলিশ সুপারদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বেড়েছে তিন শ্রেণির মামলা
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি-জুলাইয়ে সারা দেশে খুনের ঘটনায় ১ হাজার ৭৮৯টি মামলা হয়েছে। আগের ছয় মাসে হয়েছিল ১ হাজার ৭৮০টি। সে হিসাবে খুনের মামলা বেড়েছে ৯টি।
নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় গত ছয় মাসে মামলা হয়েছে ১১ হাজার ১৬৫টি। আগের ছয় মাসে হয়েছিল ১০ হাজার ৯০টি। এই শ্রেণিতে মামলা বেড়েছে ১ হাজার ৭৫টি।
পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় ফেব্রুয়ারি-জুলাইয়ে মামলা হয়েছে ৩১৭টি। আগের ছয় মাসে হয়েছিল ২৭৫টি। অর্থাৎ বেড়েছে ৪২টি।
প্রথম তিন শ্রেণিতে মামলা বেড়েছে মোট ১ হাজার ১২৬টি। অন্যদিকে ডাকাতি ও দস্যুতা, ছিনতাই, অপহরণ এবং চুরির মামলা আগের ছয় মাসের তুলনায় সম্মিলিতভাবে ৫৯৮টি কমেছে। এই চার শ্রেণিতে গত ছয় মাসে মামলা হয়েছে ৮ হাজার ৪৮৫টি, আগের ছয় মাসে হয়েছিল ৯ হাজার ৮৩টি। সব মিলিয়ে সাত শ্রেণিতে নিট বৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৫২৮টি।
মামলা কমলেও মাঠে উদ্বেগ
সরকারি হিসাবে ডাকাতি ও দস্যুতা, ছিনতাই, অপহরণ ও চুরির মামলা কমেছে। কিন্তু ভুক্তভোগীসহ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রমতে, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইয়ের সব ঘটনায় মামলা না হওয়ায় পরিসংখ্যানে মাঠের পুরো চিত্র প্রতিফলিত হচ্ছে না। ঝামেলা মনে করে বা হয়রানির আশঙ্কায় অনেক ভুক্তভোগী থানায় যান না। আবার কোনো কোনো থানা মামলা না নিয়ে সাধারণ ডায়েরি গ্রহণ করে অথবা তদন্তের কথা বলে ‘লিখিত অভিযোগ’ রেখে দেয়। এসব অভিযোগের অনেকগুলো পরে মামলায় রূপান্তরিত হয় না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো দেখানোর প্রবণতা থেকেও কোনো কোনো থানা মামলা নিতে নিরুৎসাহিত করে। তাঁরা মনে করেন, অপরাধের ঘটনা যথাযথভাবে নথিভুক্ত না হলে অপরাধী আরও উৎসাহিত হয় এবং ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম ও অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, কোনো ঘটনায় মামলা না নিলে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে শাস্তির মুখে পড়তে হবে।
প্রকাশ্যে অপরাধ, মানুষের মধ্যে ভয়
পরিসংখ্যানের পাশাপাশি অপরাধের ধরনও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ব্যস্ত সড়ক, বাজার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাড়িতে ঢুকে গুলি করে হত্যা, অস্ত্র দেখিয়ে চাঁদাবাজি, অপহরণের পর হত্যা এবং সংঘবদ্ধভাবে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে।
গত ২৮ এপ্রিল রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় একসময়ের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটনকে। তদন্তে পুরোনো অপরাধী গোষ্ঠীর বিরোধের তথ্য সামনে এলেও হত্যার নির্দেশদাতাকে এখনো শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনতে পারেনি পুলিশ। গত ১৯ মে পল্লবীতে এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এর আগে ৯ মে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় আরেক শিশুকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়।
ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, খুলনা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ঘটনাও ঘটেছে। চট্টগ্রামের হত্যাকাণ্ড, গোলাগুলি ও অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য বিস্তার নিয়ে প্রথম আলোর সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একের পর এক ঘটনার পরও অনেক পরিকল্পনাকারী ও অস্ত্রধারী গ্রেপ্তার হয়নি। এতে অপরাধীদের শাস্তি হওয়া নিয়ে মানুষের মধ্যে সংশয় তৈরি হচ্ছে।
অবৈধ অস্ত্রে ঝুঁকি, অভিযানেও বাধা
আইনশৃঙ্খলার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে আছে অবৈধ অস্ত্র। ২০২৪ সালের আগস্টে থানা ও পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও গুলির একটি অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। বিভিন্ন অপরাধের তদন্তে অপরাধীদের হাতে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র থাকার তথ্যও সামনে এসেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জামিনে মুক্তি পাওয়া পুরোনো ও তালিকাভুক্ত অপরাধীদের কেউ কেউ আবার চাঁদাবাজি, দখল, আধিপত্য বিস্তার ও হত্যাকাণ্ডে জড়িয়েছেন বলে পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের বাধা ও হামলার মুখেও পড়তে হচ্ছে।
গত ৯ জুন সাভারে মাদক মামলার এক পরোয়ানাভুক্ত আসামিকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে পুলিশের দুই সদস্য হামলার শিকার হন। হামলাকারীরা গ্রেপ্তার ব্যক্তিকেও ছিনিয়ে নেয়। এর এক সপ্তাহ পর ১৬ জুন রাজধানীর আদাবরে ছিনতাইকারীদের ধরতে গিয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ দুই পুলিশ সদস্যকে কুপিয়ে আহত করা হয়।
কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার অভিযোগ, কোনো কোনো অভিযানের সময় রাজনৈতিক পক্ষগুলো লোকজন জড়ো করে মব তৈরি করছে। এমন পরিস্থিতিতে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে গিয়েও পুলিশ সদস্যরা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। পরিস্থিতি জটিল হলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমর্থন পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও তাঁদের সংশয় রয়েছে।
ভয় থেকে সিদ্ধান্তহীনতা
পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের অন্তত ১০ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক। তাঁদের ভাষ্য, মাঠপর্যায়ের সদস্যদের পুরো মনোবল ফিরে না পাওয়ার পেছনে কয়েকটি বিষয় কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ঘিরে তৈরি হওয়া মানসিক আঘাত, দায়িত্ব পালনকালে হামলা ও বাধা, ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের সমর্থন নিয়ে সংশয়, রাজনৈতিক চাপ, ঘন ঘন বদলি-পদায়ন এবং চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এবং পরবর্তী সময়ে পুলিশ সদস্য ও স্থাপনায় হামলার ঘটনায় বাহিনীর মধ্যে তৈরি হওয়া ভয় পুরোপুরি কাটেনি। এখন আইনসিদ্ধ বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রেও অনেক সদস্য সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন। ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে তাঁরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকেন।
অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘অপরাধ অনেকটা ঢেউয়ের মতো বাড়ে-কমে।’ গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশ মানসিক আঘাতের মধ্যে ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেই অবস্থা থেকে বাহিনী ধাপে ধাপে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। তাঁর মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশ নিয়ে অপপ্রচার বাহিনীর স্বাভাবিক হওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করছে। সাধারণ মানুষের সহযোগিতা পেলে পুলিশ পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
প্রশাসনিক ব্যবস্থায়ও অস্থিরতা
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানোর অভিযোগে পুলিশের ১ হাজার ৪৯০ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অভ্যুত্থান ঘিরে হওয়া মামলায় এখন পর্যন্ত ৬৮ পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং পলাতক রয়েছেন ৫৭ জন। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায়ও দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েকজন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা কারাগারে আছেন।
বিভিন্ন পদমর্যাদার ১৯৭ পুলিশ সদস্যকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। সর্বশেষ ১৩ আগস্ট ৫৬ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়। বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা করা অথবা বিভিন্ন ইউনিটে সংযুক্ত করা হয়েছে আরও ১৪২ জনকে। পলায়নের অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন ৯৩ কর্মকর্তা। এ ছাড়া গণ-অভ্যুত্থান ঘিরে হওয়া মামলায় বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত আরও ২৬ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এগুলো আলাদা আইনি ও প্রশাসনিক হিসাব, তালিকাগুলোতে একই ব্যক্তি একাধিকবার আছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। তাই সংখ্যাগুলো যোগ করে ব্যবস্থা নেওয়া সদস্যের মোট সংখ্যা নির্ধারণ করা যায় না।
মামলা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার মুখে পড়া পুলিশ সদস্যদের একটি অংশের অভিযোগ, প্রকৃত সম্পৃক্ততা যাচাই না করেই অনেক কর্মকর্তাকে বিভিন মামলায় আসামি করা হয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, কেউ ঘটনাস্থলে ছিলেন না, কারও নাম দায়িত্ব পালনের তালিকায় ছিল না, আবার কেউ ঘটনার সময় অন্য ইউনিটে কর্মরত ছিলেন। এরপরও তাঁদের আসামি করা হয়েছে। পুলিশের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেও কেউ কেউ মামলার আসামি হয়েছেন বলে অভিযোগ আছে।
অন্যদিকে পুলিশের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের কেউ কেউ মনে করেন, অতীতে ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং আন্দোলন দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগে জড়িত কর্মকর্তাদের বিচার হওয়া জরুরি। তবে অভিযোগের যথাযথ তদন্ত এবং ব্যক্তির দায় নির্ধারণ করেই আইনি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, মামলা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার কারণে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের একটি অংশ এখন বাহিনীর বাইরে। এতে কোনো কোনো ইউনিটে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তার সংকট তৈরি হয়েছে। উচ্চপর্যায়ে এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা অনেকের দক্ষতার ঘাটতি নিয়েও অনেক আলোচনা রয়েছে। বাহিনীর ভেতরের অস্থিরতার প্রভাবও পড়ছে মাঠপর্যায়ের সদস্যদের ওপর। নেতৃত্বে বা সঠিক জায়গায় সঠিক ব্যক্তিকে না বসালে বাহিনীর ঘুরে দাঁড়ানো এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হবে।
ঘন ঘন বদলিতে কাজের ধারাবাহিকতা নষ্ট
মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলেন, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের বদলি বা পদায়নের পর তাঁদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার শুরু হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরোনো ছবি ও অতীতের কর্মস্থলের তথ্য ব্যবহার করে রাজনৈতিক তকমা দেওয়া হয়। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, যাচাইহীন প্রচারের কারণে নতুন কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনে অনেকে অস্বস্তি ও চাপের মধ্যে পড়েন।
কোনো ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দায়িত্ব নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট এলাকার অপরাধ পরিস্থিতি, অপরাধী গোষ্ঠী এবং স্থানীয় সমস্যা সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার আগেই বদলি হলে কাজের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। আবার দীর্ঘ সময় অপারেশন শাখায় দায়িত্ব পালন না করা কর্মকর্তাদের হঠাৎ গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল দায়িত্ব দেওয়া হলে নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে বেগ পেতে হয়। কর্মকর্তাদের মতে, ঘন ঘন বদলি এবং যথাযথ অভিজ্ঞতা বিবেচনা না করে পদায়ন-দুটিই পুলিশের স্বাভাবিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর পথে বাধা তৈরি করছে।
জবাবদিহি ও মনোবল-দুটিই প্রয়োজন
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (সাবেক আইজিপি) মো. আবদুল কাইয়ুম প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশের প্রথম কাজ অপরাধ প্রতিরোধ করা। সেখানে ব্যর্থ হলে দ্রুত ঘটনা উদ্ঘাটন করতে হবে। কোনো অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত না করার অর্থ অপরাধীকে উৎসাহিত করা এবং ভুক্তভোগীকে প্রতিকার থেকে বঞ্চিত করা।
আবদুল কাইয়ুমের মতে, পদোন্নতি ও পদায়নে যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিয়ে পুলিশের চেইন অব কমান্ড শক্ত করতে হবে। হত্যা, নির্যাতন, দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে যাচাই ছাড়া কোনো সদস্যকে হয়রানি বা শাস্তি দেওয়া যাবে না।
সাবেক এই আইজিপি বলেন, পুলিশ সদস্যরা ঘুষ, ক্ষমতাসীনদের তোষণ, অসদাচরণ ও মানুষের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে বাহিনীর ভাবমূর্তি ও জনসমর্থন ফিরবে না। তাঁর মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য পুলিশের মনোবল ফেরানোর পাশাপাশি জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং মানুষের আস্থা অর্জন করাও জরুরি।
যুগান্তর
দৈনিক যুগান্তরের প্রথম পাতার খবর ‘নিম্নমানের এলএনজিতে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত’। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় এক মাস বড় ধরনের গ্যাস সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশ। এর মধ্যেই নিম্নমানের এলএনজিতে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে একটি কোম্পানি। গত এক মাস রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি (আরপিজিসিএল) নিম্নমানের এলএনজি আমদানি করছে জানিয়ে তারা বলেছেন, এ ধরনের এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন করা যাচ্ছে না। কমে যাচ্ছে টার্মিনালের সক্ষমতা। সোমবার সামিট গ্রুপ সঠিক মানের এলএনজি আমদানির তাগাদা দিয়ে পেট্রোবাংলাকে তিন পৃষ্ঠার একটি চিঠি দেয়। ওই চিঠিতে তারা এ অভিযোগ তুলে ধরে।
এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের বাইরে এলএনজি আমদানির কোনো সুযোগ নেই। সামিটের অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
এদিকে, এলএনজি কার্গো না থাকায় গত ৪ দিন ধরে অলস বসে আছে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান টার্মিনাল। অন্যদিকে, ফিল্টারিং সমস্যার কারণে এলএনজি সরবরাহে বারবার হোঁচট খাচ্ছে সামিট গ্রুপের টার্মিনাল। এ কারণে সারা দেশে আবারও গ্যাস সরবরাহে ধস নেমেছে।
সরকারি কর্মকর্তারা জানান, সামিটের টার্মিনালে রিগ্যাসিফিকেশন সমস্যার কারণে মঙ্গলবার সারা দেশে গ্যাস সরবরাহ ভয়াবহভাবে কমে যায়। এদিন বিকাল ৪টায় সরবরাহ দেওয়া হয়েছে মাত্র ২০৭ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট গ্যাস। এর মধ্যে দুই টার্মিনাল থেকে সরবরাহ হয়েছে ৪৪ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে সারা দেশে আবারও শত শত শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। শিল্পের বাইরে সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনসহ বিভিন্ন গ্রাহকের দুর্ভোগও ছিল চরমে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, শিল্পকারখানায় গ্যাস না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানির অফিসে মঙ্গলবার হাজির হন নাসির গ্লাস, প্রাণ ও মোশাররফ কম্পোজিটসহ বিভিন্ন কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারা। তাদের দাবি-ফ্যাক্টরি চালাতে গ্যাস লাগবে। নইলে সব ধ্বংস হয়ে যাবে।
এ বিষয়ে তিতাস গ্যাস কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ যুগান্তরকে বলেন, গ্যাসের জন্য বিভিন্ন কোম্পানি তিতাস অফিসে ধরনা দিচ্ছে। তারা ফ্যাক্টরির উৎপাদন করতে পারছে না।
এবার নতুন আতঙ্ক নিম্নমানের এলএনজি : সামিট গ্রুপের টার্মিনাল বা এফএসআরইউ সোমবার থেকে মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ফিল্টারিং সমস্যার কারণে ২-৩ বার উৎপাদন কমিয়ে দিতে হয়েছে। তাদের দাবি, কার্গো বা জাহাজ থেকে নিম্নমানের এলএনজি খালাস করে ঠিকমতো রিগ্যাসিফিকেশন করা যাচ্ছে না। যে কারণে ১৭ এবং ১৮ আগস্ট টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ ৩৪ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুটে নামিয়ে আনা হয়।
পরিষ্কার করা হয়েছে টার্মিনালের ফিল্টার। অথচ এই টার্মিনাল থেকে দৈনিক ৫৫ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস সরবরাহ করা যায়। শুক্রবার রাত থেকে সামিটের টার্মিনালে এখন বিটল এশিয়ার একটি কার্গো থেকে এলএনজি খালাস করা হচ্ছে। সামিট গ্রুপের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, নিম্নমানের এলএনজির ব্যাপারে পেট্রোবাংলাকে জানিয়ে বলা হয়েছে, সাধারণত ৩ মাস অন্তর এফএসআরইউর ফিল্টার পরিবর্তন করা হয়। বর্তমানে কার্গোর এলএনজির মান বেশ খারাপ। এ কারণে এখন ২-১ দিন পরপর ফিল্টার পরিবর্তন বা পরিষ্কার করতে হচ্ছে। এতে করে কমে যাচ্ছে গ্যাসের সরবরাহ। দেশে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও পুরোদমে সরবরাহ দেওয়া যাচ্ছে না।
সামিটের চিঠিতে আরও বলা হয়, ৮ জুলাই অ্যাঙ্গোলা এবং ১৩ ও ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি লোড করে কার্গো। এই তিন কার্গো স্পট মার্কেট থেকে কেনা। ১৭ আগস্ট ও ১৮ আগস্ট সামিট গ্রুপের কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি অব বাংলাদেশের (জিটিসিএল ও আরপিজিসিএল) হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠিয়েছে। সেই মেজেসে বলা হয়েছে, রিগ্যাসিফিকেশনে ময়লা থাকায় টার্মিনালের সরবরাহ কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে সামিট। এ কারণে সোমবার একদিনে ৩ বার ফিল্টার পরিষ্কার করা হয়।
কালের কণ্ঠ
‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জোর প্রস্তুতি’-এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রত্যাশিত স্থানীয় সরকারের নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি জোরদার করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ নির্বাচনের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বৈঠক করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন না হওয়া স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে পর্যায়ক্রমে ভোটের আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারের পরামর্শ অনুযায়ী, ইসি চলতি অর্থবছরের মধ্যে স্থানীয় সরকারের পাঁচ প্রতিষ্ঠান—ইউপি, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও জেলা পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন করার কর্মপরিকল্পনা করছে। এই পাঁচ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনের সম্ভাব্য ব্যয়ের প্রস্তাব সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানিয়েছে। তবে প্রথম ভোট কোন স্থানীয় সরকারের হবে, এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, আগামী ডিসেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ভোট আয়োজনের প্রস্ততি চলছে। নির্বাচনের সময়সূচি নির্বাচন কমিশনই নির্ধারণ করবে।
নির্বাচন কমিশন ও সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকারের পাঁচ প্রতিষ্ঠানের ভোটে সম্ভাব্য ব্যয় হবে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা। অর্থ বিভাগের অনুমোদনের পর অর্থছাড়ের পরই ভোটের দিন-তারিখ চূড়ান্ত করা হবে।
শীতকালকে ভোটের জন্য উপযুক্ত সময় বিবেচনা করে ডিসেম্বর থেকে ভোটগ্রহণ শুরুর সম্ভাবনাও রয়েছে। অর্থাৎ ডিসেম্বরকে ভোটের সম্ভাব্য সূচনাকাল হিসেবে আলোচনা করা হলেও এখন পর্যন্ত এটিকে চূড়ান্ত সময় বলা যাচ্ছে না।
এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের আগেভাগেই প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সম্প্রতি তৃণমূলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বিএনপিপ্রধান বলেন, নির্বাচনে প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে কাউকে জিতিয়ে আনার সুযোগ থাকবে না; জনগণের আস্থা অর্জন করে কাজের মাধ্যমে নির্বাচিত হতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
সরকারের দায়িত্বশীল সূত্রের বক্তব্য, ‘স্থানীয় সরকারের ভোটের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী খুবই সিরিয়াস। যেকোনো মূল্যে আমাদের সুষ্ঠু ভোট নিশ্চিত করতে হবে। এখানে ন্যূনতম কম্প্রোমাইজ করার সুযোগ নেই।’
স্থানীয় সরকারের পাঁচ প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত হবে। ইসির হিসাব অনুযায়ী, নির্বাচন উপযোগী রয়েছে চার হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টি পৌরসভা, ১৩টি সিটি করপোরেশন ও ৬১টি জেলা পরিষদ। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ছাড়া বাকি সব সিটিতেই প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে বিএনপি সরকার।
দ্রুতই সমন্বয় সেল গঠন : স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মাঠের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে দ্রুতই সমন্বয় সেল গঠন করা হবে। এ লক্ষ্যে গতকাল দুপুরে আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে আইজিপি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে সমন্বয় সেল গঠন সংক্রান্ত বিষয়ে আজ (মঙ্গলবার) সিইসির সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।’
এ বিষয়ে সিইসি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দ্রুতই সমন্বয় সেল গঠন হয়ে যাবে। সেখানে সশস্ত্র বাহিনীসহ সব ধরনের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী থাকবে। নির্বাচন কমিশন থেকেও প্রতিনিধি থাকবে। এর বাইরেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সব ধরনের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।’
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রথমত ভোট হচ্ছে—সেটা দেখতে চাই। নির্বাচন কমিশনের যত প্রস্তুতিই থাকুক, সরকারের যদি সিদ্ধান্ত না হয়, তাহলে নির্বাচন হবে না।’
বিএনপির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘যারা জাতীয় নির্বাচনের জন্য একসময় প্রতিদিন দাবি জানিয়ে আসছিল, তারা যদি স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে টালবাহানা করে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘নির্বাচনটা প্রতীকবিহীন মানে নির্দলীয় হওয়া। নির্দলীয় মানে কেউ কোনো দলীয় প্রার্থী যাতে না দেয়। একক প্রার্থীর জন্য যেন তারা অপচেষ্টা না চালায়। নির্বাচন প্রকৃত অর্থে যেন নির্দলীয় হয়। সমাজের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি আছেন, বিভিন্নভাবে সমাজে তাঁদের জনপ্রিয়তা আছে, দলীয় নির্বাচন হলে তাঁরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে নিরুৎসাহ হন এবং এর জন্য প্রার্থী কমে যায়। আমরা ইতিবাচক দিক থেকে বলতে চাই, সত্যিকার অর্থে নির্দলীয় নির্বাচনটা হোক, যাতে সবাই অংশগ্রহণ করতে পারে।’
তবে নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা অনেকেই বলেন, ২০১৫ সালের আগেও স্থানীয় নির্বাচন আইনত নির্দলীয় ছিল। কিন্তু সে সময়ও দলীয় সমর্থন এড়ানো যায়নি। এবারও জামায়াত ও এনসিপি তাদের প্রার্থী ঘোষণা করে রেখেছে।
জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চলতি অর্থবছরেই স্থানীয় সরকার বিভাগের পাঁচটি নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে। এ নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা বাজেট ধরা হয়েছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কমিশনের প্রস্তুতি শেষ হলে কোন নির্বাচন আগে অনুষ্ঠিত হবে, তা নির্ধারণ করা হবে।’
তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বাজেট অর্থ বিভাগ থেকে ছাড় পেলেই কবে নাগাদ নির্বাচন শুরু হতে পারে তা চূড়ান্ত করা হবে। সরকার দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচন দিতে চায়। সরকারের পরামর্শেই নির্বাচন কমিশন নির্বাচন আয়োজন করবে।
তিনি আরো জানান, এবার চেয়ারম্যান ও মেয়র পদে ভোট হবে দলীয় প্রতীক ছাড়া। দলীয়ভাবে কোনো প্রার্থী দেওয়া হবে না। প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনা আছে, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। এখানে দলীয় কোনো প্রভাব কাজে আসবে না।
কোন নির্বাচনে কত ব্যয় হতে পারে : জানা গেছে, ইউনিয়ন পরিষদে প্রায় দুই হাজার ৯০০ কোটি, উপজেলা পরিষদে প্রায় দুই হাজার কোটি, সিটি করপোরেশনে প্রায় ৩৩০ কোটি এবং পৌরসভায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। নির্বাচন কমিশন এমন চাহিদার কথায় জানিয়েছে। জেলা পরিষদ নির্বাচনের ব্যয় যুক্ত হলে মোট ব্যয় ছয় হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে।
এদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে নির্বাচন কমিশনের জন্য প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা এসেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন ছাড়াও কমিশনের অন্যান্য নির্বাচনী ও প্রশাসনিক ব্যয় এর মধ্যে রয়েছে।
সমকাল
দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম ‘২৩৫ কোটি টাকার ইনস্টিটিউট, প্রশিক্ষণ পাননি একজনও’। প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষ করে তুলতে ২৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা হয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হেলথ ম্যানেজমেন্ট (বিআইএইচএম)। ২০২৩ সালের নভেম্বরে ভবনগুলোর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। অথচ আজ পর্যন্ত এখানে কোনো চিকিৎসকের প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব হয়নি। চালু করা যায়নি প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম। এ ছাড়া জনবল কাঠামো চূড়ান্ত না হওয়ায় এই জাতীয় অবকাঠামো পড়ে আছে অরক্ষিত ও অযত্নে। অন্যদিকে দেশে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সময়োপযোগী প্রশিক্ষণের তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে গত দুই বছরে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ চিকিৎসক কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ পাননি। আর যারা প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন, প্রশাসনিক ও সম্পদ সংকটের কারণে অর্জিত জ্ঞান কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারছেন না।
গত বৃহস্পতিবার সাভারের বিআইএইচএমে গিয়ে দেখা যায়, সুবিশাল বহুতল ভবন দাঁড়িয়ে থাকলেও প্রাঙ্গণজুড়ে সুনসান নীরবতা ও অযত্নের ছাপ। প্রকল্পটিতে রয়েছে চারটি ভবন। এর মধ্যে একটি ১৪ তলা প্রধান ভবন, একটি ৯ তলা, একটি ৮ তলা এবং দুটি ৫ তলা ডরমিটরি ভবন।
জনবল নিয়োগ ছাড়াই ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি প্রতিষ্ঠানটির উদ্বোধন করেন। তবে উদ্বোধনের আড়াই বছর পার হলেও এখনও কার্যক্রম শুরু হয়নি। প্রকল্প এলাকা ঘুরে কোনো প্রকল্প পরিচালক বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। গণপূর্ত অধিদপ্তরের (পিডব্লিউডি) দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মতিনকেও পাওয়া যায়নি। পুরো ভবন দেখভাল করছেন মাত্র তিনজন কেয়ারটেকার। তারা জানান, এত বড় অবকাঠামোর নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত জনবল ও প্রশাসনিক সহায়তা প্রয়োজন, যা তাদের একার পক্ষে সম্ভব নয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, চব্বিশের ৫ আগস্টের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সেখানে সেনাবাহিনী অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করে। তবে গত ৫ জুন তারা চলে যায়। এর পর থেকেই ক্যাম্পাসের নিরাপত্তায় শিথিলতা দেখা দিয়েছে এবং সন্ধ্যার পর বখাটে ও মাদকসেবীদের আনাগোনা বাড়ে।
জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবু জামিল ফয়সাল বলেন, সাভারের বিআইএইচএমের মতো বিশাল অবকাঠামো ফেলে রেখে সরকার বড় অঙ্কের আর্থিক বিনিয়োগকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। দ্রুত অর্গানোগ্রাম অনুমোদন করে স্থায়ী প্রশাসনিক কাঠামো গঠন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতের মানোন্নয়নে শুধু আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ না দিয়ে প্রয়োজনভিত্তিক প্রশিক্ষণ, প্রশিক্ষণ-পরবর্তী কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন এবং অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট ও লজিস্টিক সহায়তা দেওয়ার জোর সুপারিশ করেন তিনি।
সম্প্রতি বিআইএইচএমের সভায় জানানো হয়, প্রতিষ্ঠানটি রাজস্ব খাতে পরিচালনার জন্য শুরুতে ১৩৮টি পদ সৃজনের প্রস্তাব করা হলেও বর্তমানে ৮৫টি পদ সৃজনের পুনঃপ্রস্তাব যাচাই-বাছাই শেষে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিআইএইচএমের পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘২৩৫ কোটি টাকার প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় ২০১১ সালে। পরিকল্পনা ছাড়াই ২০২৩ সালে উদ্বোধন করা হয়। এক বছর ধরে আমি পরিচালক হিসেবে রয়েছি। প্রতিষ্ঠানটি এখনও ব্যবহারের উপযোগী না হওয়ায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অফিস করি। কিছুদিন আগে গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। ভবনটি বুঝে পেলে কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করা যাবে। তবে এখনও অনেক কাজ বাকি।’
ইত্তেফাক
‘পর্যালোচনা হবে পুরো সংবিধানের’-এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, তাড়াহুড়ো নয়, সময় নিয়ে পুরো সংবিধান পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করেই সংবিধানে ১৮তম সংশোধনী আনতে চায় বর্তমান সরকার। সরকারের এমন বার্তা মাথায় রেখেই ধীরে ও সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। জুলাই জাতীয় সনদ ও বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারকে ভিত্তি ধরেই হবে এবারের সংশোধনী। সুপারিশ প্রণয়নের আগে সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন অংশীজনেরও মতামত নেবে বিশেষ কমিটি। সব মিলিয়ে এ বছর সংবিধানে সংশোধনী আসার সম্ভাবনা কম।
চলতি ত্রয়োদশ সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে গত ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের ‘সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ গঠন করে জাতীয় সংসদ। কমিটি গঠনের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী এই কমিটির কার্যপরিধি হলো ‘সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনের নিমিত্ত সুপারিশ প্রণয়নপূর্বক সংসদে রিপোর্ট পেশ’। তবে, কতদিনের মধ্যে কমিটিকে সংসদে প্রতিবেদন দিতে হবে, সেটা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি।
১৩ জুলাই গঠনের পর বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক হয় গত ৪ আগস্ট। এটিই এখন পর্যন্ত একমাত্র বৈঠক। আগামী ২৭ আগস্ট শুরু হচ্ছে সংসদের তৃতীয় অধিবেশন। তৃতীয় অধিবেশনটি সাধারণত সংক্ষিপ্ত হয়ে থাকে। এরপর সংসদের চতুর্থ অধিবেশন বসবে নভেম্বরে। এর মধ্যে সুপারিশ চূড়ান্ত করে বিশেষ কমিটির তা সংসদে উপস্থাপনের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ফলে, সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনী যে আগামী বছরে গড়াচ্ছে তা মোটামুটি নিশ্চিত। আর সংশোধনী না আসা পর্যন্ত অনিষ্পন্ন থাকছে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো।
বিরোধী দল থেকে এই কমিটিতে পাঁচ জনের নাম দেওয়ার অনুরোধ করেছিল সরকারি দল। তবে কারো নাম দেয়নি বিরোধী দল। সংসদে এই কমিটি গঠনের দিনই তা প্রত্যাখ্যান করে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছিল বিরোধী দল। সেদিন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সংসদে বলেছিলেন, এ ধরনের কমিটি গঠনের বিষয়ে তাদের ধারণাগত মতপার্থক্য আছে। সংশোধন নয়, তারা চান সংবিধান সংস্কার। অন্যদিকে, বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠকে অংশ নেননি কমিটির সদস্য ইসলামী আন্দোলনের সংসদ সদস্য মো. অলি উল্লাহ।
প্রথম বৈঠকের দিনে কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কারের যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো সংশোধনী প্রস্তাবে রাখার চেষ্টা করবে কমিটি। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে যে পাঁচটি নাম দেওয়ার কথা ছিল, একপর্যায়ে হয়তো তারা নাম দেবে। সেটা হলে তাদের সঙ্গেও আলোচনা হবে। এভাবে আমরা একটা গ্রহণযোগ্য সংশোধনী আনতে চাই এবং জনপ্রত্যাশা সবকিছু ধারণ করতে চাই। সবার সঙ্গে আলোচনা করেই রিপোর্টটা প্রণয়ন করতে চাই।’
জুলাই সনদে থাকা সংবিধান সম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘৪৮টার মধ্যে অনেক কিছু আছে। আমরা অ্যাগ্রিড হয়েছি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে জুলাই জাতীয় সনদে। সেগুলো তো আমরা নেবই। আর যেগুলোতে আমরা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছি, সেগুলো নোট অব ডিসেন্ট আকারে নেব। এর বাইরে আমাদের নির্বাচনি ইশতেহারে আছে। সেগুলো আমরা ধারণ করব।’
প্রথম বৈঠক শেষে কমিটির সদস্য ও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানান, পুরো সংবিধানই পর্যালোচনা করতে হবে। কারণ, একটার সঙ্গে আরেকটার গাঁথুনি রাখতে হবে। জুলাই সনদের মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপির নোট অব ডিসেন্টের বিষয়ে তিনি বলেন, জুলাই সনদেই সেটার ব্যাখ্যা দেওয়া আছে। কোনো জায়গায় যদি বিএনপি দ্বিমত পোষণ করে থাকে এবং সেই দ্বিমতের আলোকে যদি তার নির্বাচনি ইশতেহার অন্তর্ভুক্ত করা থাকে, তাহলে সেটা প্রিভেইল করবে। সেটাও কিন্তু জুলাই সনদেরই অংশ।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করেছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সনদের ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান-সম্পর্কিত। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে। দলটি নিজেদের ভিন্নমতের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের পক্ষে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিরোধী জোট সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে জুলাই সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের পক্ষে।
জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত ৪৮টি প্রস্তাব বাস্তবায়নের প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবগুলোতে বিএনপির দেওয়া ভিন্নমত গুরুত্ব পায়নি। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় জাতীয় সংসদের নিয়মিত কাজের পাশাপাশি সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও কাজ করার কথা। তবে, বিএনপি ও তাদের জোট থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় পরিষদ গঠিত হয়নি। বিরোধী দলের সদস্যরা এ শপথ নিয়েছিলেন। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার নির্ধারিত সময় গত ১৫ মার্চ শেষ হয়েছে।
নয়া দিগন্ত
দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম ‘ভরমৌসুমে তীব্র সারসঙ্কট’। খবরে বলা হয়, আমন রোপণের ভরা মৌসুমে এক দিকে জমি প্রস্তুত ও চারা রোপণের ব্যস্ততা, অন্য দিকে প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। সরকার নির্ধারিত দামে সার না পেয়ে তাদের এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ছুটতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও বাড়তি টাকা দিয়েও মিলছে না প্রয়োজনীয় সার। সারের দাবিতে লালমনিরহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের মহাসড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভে নামতে দেখা গেছে। অথচ কৃষি বিভাগ থেকে দাবি করা হচ্ছে- দেশে সারের কোনো সঙ্কট নেই, পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে।
মাঠপর্যায়ের এই বাস্তবতার সাথে সরকারি বক্তব্যের বড় ধরনের ফারাক দেখা দিয়েছে। সরকারি হিসাবে খাতাকলমে সার মজুদ থাকলেও তা কৃষকের হাতে পৌঁছানো নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ডিএপি, টিএসপি ও এমওপির মজুদ নিরাপদ মাত্রার নিচে নেমে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। আমনের পরপরই শুরু হবে রবি ও বোরো মৌসুম। ফলে আগামী মার্চ পর্যন্ত দেশের কৃষির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সার সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, দেশে সার সঙ্কটের সূচনা হয়েছিল বিগত সরকারের শেষ সময়ে, যা পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে আরো ঘনীভূত হয়। তৎকালীন কৃষি সচিব সময়মতো সার আমদানির প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করায় সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করে। সে সময়ের প্রশাসনিক অবহেলার খেসারত এখনো দিতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তৎকালীন সচিবকে পরবর্তী সরকার বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠালেও তার অনুসারীরা এখনো সার ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ উইংগুলো পরিচালনা করছেন।
মাঠপর্যায়ের চিত্র
রাজশাহী, লালমনিরহাট, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, নাটোর ও কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার কৃষকরা চাহিদামতো সার না পাওয়ার অভিযোগ করছেন। কোনো কোনো এলাকায় সরকারি বরাদ্দ বাড়লেও সেই সার কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছে না; আবার কোথাও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা দিলেই সার মিলছে।
নাটোর: কৃষকদের অভিযোগ, বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। তাদের দেয়া হিসাব অনুযায়ী, টিএসপি এক হাজার ৮০০, ইউরিয়া এক হাজার ৫০০, ডিএপি এক হাজার ৭৫০ এবং এমওপি এক হাজার ১৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, ডিলাররা বেশি দাম রাখায় তারাও বাড়তি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে ডিলারদের দাবি, তারা সরকার নির্ধারিত দামেই সার দিচ্ছেন। অন্য দিকে কৃষি বিভাগের ভাষ্য, জেলায় সারের কোনো ঘাটতি নেই।
কিশোরগঞ্জ: করিমগঞ্জ, কটিয়াদী, পাকুন্দিয়া ও হোসেনপুরে কৃষকরা কয়েক দিন ঘুরেও সার পাচ্ছেন না। ২৭ টাকা কেজি দরের ইউরিয়া ৩৫ টাকা, টিএসপি ৩০-৩৫ টাকা এবং এমওপি ২২ টাকা কেজি দরে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। ডিলারদের দাবি, বিসিআইসি ও বিএডিসি থেকে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। বিশেষ করে ডিএপি ও টিএসপির সঙ্কট প্রকট। তবে স্থানীয় কৃষি বিভাগ বলছে, জেলায় পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে।
বণিক বার্তা
‘১৭ হাজার কোটি টাকার সম্পদ নিয়ে ‘তিন তারকা’ এয়ারলাইনস বিমান’-এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের। সে হিসেবে আঞ্চলিক কয়েকটি আকাশ পরিবহন সংস্থার তুলনায় উল্লেখযোগ্য সম্পদভিত্তি নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে বিমান।
কিন্তু সেই শক্তির যথাযথ প্রতিফলন নেই যাত্রীসেবা ও পরিচালন দক্ষতায়। বিপুল সম্পদ ও আধুনিক ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজের বহর থাকার পরও যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্কাইট্র্যাক্সের সর্বশেষ মূল্যায়নে বিমান পেয়েছে ‘থ্রি স্টার’ রেটিং। সংস্থাটির আছে বড় দেনাও, যার পরিমাণ ১৩ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা।
স্কাইট্র্যাক্সের মতে, থ্রি স্টার রেটিং পাওয়া এয়ারলাইনসের পণ্য ও সেবার মান মোটামুটি গ্রহণযোগ্য হলেও কিছু দুর্বলতা বা অসামঞ্জস্য থাকে। বিমানের ক্ষেত্রেও ঢাকার বিমানবন্দরে সেবা, কেবিনের পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং কর্মীদের আচরণ ও সেবায় ধারাবাহিকতার ঘাটতি রয়েছে বলে মূল্যায়নে উঠে এসেছে। অর্থাৎ বিমানের বহর ও সম্পদের আকার বড় হলেও যাত্রী অভিজ্ঞতায় তার প্রতিফলন এখনো পুরোপুরি দেখা যাচ্ছে না।
প্রতিষ্ঠার ৫৪ বছরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও হয়েছেন ৪৪ জন। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘন ঘন নেতৃত্ব পরিবর্তনের ফলে সংস্থাটির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনাগত ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছে। বহর ও রুট সম্প্রসারণ, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, ঋণ ব্যবস্থাপনা ও যাত্রীসেবার মানোন্নয়নে নেয়া পরিকল্পনা অনেক সময় নেতৃত্ব পরিবর্তনের সঙ্গে থমকে গেছে বা নতুন মডেলে শুরু হয়েছে। বিশেষ করে অনেক সময় এয়ারলাইনস পরিচালনায় অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকা ব্যক্তিরা নেতৃত্বে এসেছেন। তাদের যথেষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা গড়ে ওঠার আগেই নেতৃত্ব পরিবর্তন হয়ে গেছে। ফলে বিমানের বিপুল সম্পদ ও বাজার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো এবং প্রতিযোগীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিচালন দক্ষতা ও যাত্রীসেবার মান বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিমানের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য ও এভিয়েশন বিশ্লেষক কাজী ওয়াহিদুল আলম এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শুধু সম্পদ থাকলেই একটি এয়ারলাইনস লাভজনক বা প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে পারে না। বিমানের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা পেশাদার ব্যবস্থাপনার ঘাটতি। ৫৪ বছরে প্রায় ৪৪ জন সিইও পরিবর্তন হওয়া এবং এয়ারলাইনস পরিচালনায় পূর্বাভিজ্ঞতা না থাকা ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেয়ার কারণে ধারাবাহিক ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। অথচ যেসব এয়ারলাইনস র্যাংকিংয়ে বিমানের চেয়ে এগিয়ে, তাদের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায় পেশাদারত্ব অনেক বেশি। বিমানের পর্যাপ্ত সম্পদ, যাত্রী ও কার্গো বাজার এবং বাড়তে থাকা চাহিদা রয়েছে। কিন্তু এসব সুযোগ কাজে লাগানোর মতো দক্ষ ব্যবস্থাপনা না থাকায় সংস্থাটি পিছিয়ে পড়ছে।’
বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহরে ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯, চারটি বোয়িং ৭৮৭-৮, চারটি ৭৭৭-৩০০ ইআর, চারটি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ ও পাঁচটি ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজ। এসব উড়োজাহাজ দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭৮৫ কোটি টাকা মুনাফা করেছে সংস্থাটি। মুনাফা করলেও জ্বালানি তেলের মূল্য বাবদ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও অ্যারোনটিক্যাল চার্জ বাবদ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কাছে মোটা অংকের দায় রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংস্থা্সারতিবেদন থবছরের নিরীটির দেনার পরিমাণ ১৩ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা।
স্কাইট্র্যাক্সের সর্বশেষ মূল্যায়নে বিমান পেয়েছে ‘থ্রি-স্টার’ রেটিংছবি: ফাইল
বিমানের মতোই বা তুলনামূলক কম সম্পদ ও বহর নিয়ে কয়েকটি এয়ারলাইনস ফোর স্টার রেটিং ধরে রেখেছে। মাত্র ১২টি উড়োজাহাজ নিয়ে রয়্যাল ব্রুনাই এয়ারলাইনস ফোর স্টার রেটিং পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সম্পদের মূল্য বাংলাদেশী মুদ্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এয়ারলাইনসটি বাংলাদেশী মুদ্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বেশি মুনাফা করেছে।
স্কাইট্র্যাক্সের ফোর স্টার রেটিং পাওয়া আরেকটি এয়ারলাইনস হলো ব্যাংকক এয়ারওয়েজ। বহরে সক্রিয় উড়োজাহাজ আছে ২৩টি। ২০২৫ সালের হিসাবে এয়ারলাইনসটির মোট সম্পদ বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০২৫ সালে এয়ারলাইনসটি প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কাছাকাছি সম্পদমূল্য রয়েছে লুক্সেমবার্গভিত্তিক এয়ারলাইনস লাক্সএয়ারেরও। বহরে ২৪টি উড়োজাহাজ থাকা লাক্সএয়ারও ফোর স্টার রেটিংপ্রাপ্ত এয়ারলাইনস।
আজকের পত্রিকা
দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ‘হামে মৃত্যু আবার ঊর্ধ্বমুখী’। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে গত পাঁচ মাসে হাম এবং এর উপসর্গে প্রাণ হারিয়েছে নয় শর বেশি মানুষ। মৃতদের বেশির ভাগ শিশু। হামের প্রকোপ ঠেকাতে নেওয়া বিশেষ কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। এরপরও সংক্রমণ ও মৃত্যু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। জুনের মাঝামাঝি থেকে জুলাইয়ের প্রথমার্ধে মৃত্যু কমলেও এই নিম্নমুখী ধারা স্থায়ী হয়নি। জুলাইয়ের মাঝামাঝি আবার মৃত্যু বাড়তে শুরু করে। বিষয়টি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিভিন্ন প্রশ্ন জাগিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত ১৫ মার্চ থেকে হামের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করে আসছে। রোগতাত্ত্বিকভাবে এই তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৬ থেকে ১২ জুলাই এই সপ্তাহে হাম এবং এর উপসর্গে মৃত্যু ছিল ১৭ জনের। পরের সপ্তাহে (১৩ থেকে ১৯ জুলাই) তা বেড়ে ৩০ জন এবং ২০ থেকে ২৬ জুলাই ৩২ জনে দাঁড়ায়। ২৭ জুলাই থেকে ২ আগস্ট সাময়িকভাবে কমে ২৪ জন হলেও পরের দুই সপ্তাহে আবার বেড়ে যথাক্রমে ২৯ ও ৩৫ জনে পৌঁছায়। অর্থাৎ ৬ থেকে ১২ জুলাইয়ের তুলনায় ১০ থেকে ১৬ আগস্ট এই সপ্তাহে হাম এবং এর উপসর্গে মৃত্যু বেড়েছে ১০৬ শতাংশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, সংক্রামক রোগের তথ্য বিশ্লেষণে সোমবার থেকে রবিবারকে একটি রোগতাত্ত্বিক সপ্তাহ ধরা হয়। ক্যালেন্ডার মাসের দিনসংখ্যার পার্থক্য এড়াতে বিশ্বজুড়ে এ পদ্ধতিতে রোগের তথ্য তুলনা করা হয়। এই প্রতিবেদনে সে অনুযায়ীই হামের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
সরকারের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মে মাসের শুরুতে হামের প্রাদুর্ভাবের তীব্রতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এরপর মৃত্যুর হার ধীরে ধীরে কমতে থাকে। ১২ জুলাই পর্যন্ত দেশে হাম এবং এর উপসর্গে মোট মৃত্যু ছিল ৭৫৮ জন। এরপর মৃত্যুর ধারা আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়। ২৬ জুলাই পর্যন্ত মোট মৃত্যু বেড়ে দাঁড়ায় ৮২০ জনে। গতকাল ১৮ আগস্ট পর্যন্ত মোট ৯১৮ জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে হামে ৯৯ এবং হামের উপসর্গে ৮১৯ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত ৬ জুলাই দেশে হাম এবং এর উপসর্গের রোগী ছিল ১ লাখ ৬ হাজার ৫৬৫ জন এবং হাম রোগী ১২ হাজার ৭৯১ জন। ২৬ জুলাই তা বেড়ে যথাক্রমে ১ লাখ ২৩ হাজার ৭৫৩ ও ১৫ হাজার ৪৪২ জনে দাঁড়ায়। গতকাল ১৮ আগস্ট মোট উপসর্গের রোগী দাঁড়ায় ১ লাখ ৪৪ হাজার ৭৮০ জন। আর ১৭ হাজার ৯৮৯ জন নিশ্চিত হামের রোগী। গতকাল সকাল পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজারের বেশি। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ৮৮০ জন।
সংক্রমণ বন্ধ হয়নি
হামে মৃত্যুর নিম্নমুখী ধারা স্থায়ী না হওয়ার পেছনে এখনো সংক্রমণ চলতে থাকাকেই প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। হাম-রুবেলা নির্মূলবিষয়ক ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটির চেয়ারম্যান ও রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সরকার পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের টিকাদানের আওতায় আনলেও ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যেও হাম হচ্ছে। আবার ছয় মাসের বেশি বয়সী সব শিশু টিকার আওতায় আসেনি। ফলে সংক্রমণের শৃঙ্খল পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।’
ডা. মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘সংক্রমণ যদি বন্ধ না হয়, নতুন রোগী হবে। হামের স্বাভাবিক জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়াসহ নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। এরই পরিণতিতে মৃত্যু বাড়বে।’
শুধু টিকাদান কর্মসূচি দিয়ে হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলে মনে করেন ডা. মাহমুদুর রহমান। তাঁর মতে, জ্বর শুরুর পর র্যাশ ওঠার আগেই হামের সংক্রমণ বেশি ছড়ায়। এ সময়ে আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখার বিষয়ে পরিবারগুলোকে যথেষ্ট সচেতন করা হয়নি। টিকাদানের পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুকে দ্রুত শনাক্ত করে আলাদা রাখা এবং কমিউনিটি পর্যায়ে সংক্রমণ প্রতিরোধের ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।
টিকা কর্মসূচিতে কারা বাদ পড়ল
গত ৫ এপ্রিল হামের প্রাদুর্ভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলা ও পৌরসভায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। পরে ৮ এপ্রিল চার সিটি করপোরেশন এবং ২০ এপ্রিল সারা দেশে তা সম্প্রসারণ করা হয়। ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১ কোটি ৯৩ লাখ ৯০ হাজারের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়ার দাবি করা হয়েছে। এটি লক্ষ্যমাত্রার ১০৭ শতাংশ।
জাতীয় টিকাদান-সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা গ্রুপের (নাইট্যাগ) সাবেক সদস্য অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ এ হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সংক্রমণ প্রতিরোধে যত শিশুকে টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন, তা সম্ভব হয়নি। টিকাদান কর্মসূচির প্রচার-প্রচারণা, প্রস্তুতি ও লক্ষ্য নির্ধারণ—সব ক্ষেত্রে ঘাটতি ছিল। এ কারণেই সংক্রমণ প্রত্যাশিতভাবে কমছে না।’
এমন প্রেক্ষাপটে দেশের বিভিন্ন এলাকায় হাম-রুবেলার টিকা থেকে বাদ পড়া ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী প্রায় ১৬ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি হামের ক্লিনিক্যাল গাইডলাইন প্রচার ও চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রোগী ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হবে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে টিকাবিষয়ক আন্তসংস্থা সমন্বয় কমিটির সভায় এসব সিদ্ধান্ত হয়।
দেশ রূপান্তর
‘কঠিন সময়ে ভারসাম্যমূলক বৈদেশিক সম্পর্কের চেষ্টা’-এটি দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রথম পাতার খবর। প্রতিবেদনে বলা হয়, ছয় মাস আগে দায়িত্বগ্রহণ করা বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে বাস্তবধর্মী ও সমতাভিত্তিক বৈদেশিক সম্পর্ক গড়ে তোলার কথা বলা আছে। ভারসাম্যমূলক এমন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে কিছু পরিকল্পিত ও কৌশলগত উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ কিছুটা বিঘিœত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট এবং ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে তৈরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে গিয়ে।
বাস্তবধর্মী বৈদেশিক সম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগে যুক্ত আছেন সরকারের এমন একজন প্রভাবশালী কূটনীতিক দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, নবগঠিত সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে দেশের পাশাপাশি বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়ানো, জনশক্তি পাঠানো বহুমুখী করা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের অসুবিধাগুলো দূর করা। এ ছাড়া সরকারকে বৈদেশিক মুদ্রার সীমিত মজুদ সত্ত্বেও জরুরিভিত্তিতে জ¦ালানি জোগাড় করতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সরকারকে দেশের ভেতরকার ‘রাজনৈতিক স্পর্শকাতরতা’ বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সরকার কঠিন সময় পার করছে।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গতকাল মঙ্গলবার ছিল তিন হাজার ৭২৫ কোটি ডলার। তবে আইএমএফ মানদ- অনুযায়ী, এ রিজার্ভ তিন হাজার ২৪৪ কোটি ডলার।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে শুধু একটি দেশের সম্পর্ক নয়, বহু দেশের সম্পর্ক আছে; এটি হচ্ছে স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক। দেশের স্বার্থে যখন, যেখানে, যার সঙ্গে প্রয়োজন, সরকার সম্পর্ক রাখবে এমনটি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সব দেশের সঙ্গে আমাদের নিজস্ব স্বার্থ অক্ষুণœ রেখে এবং স্বার্থকে এগিয়ে নিয়ে আমরা সম্পর্ক বৃদ্ধির চেষ্টা করেছি।’
ক্ষমতাসীন বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের ‘পররাষ্ট্রনীতি’ অংশে প্রতিবেশীসহ সব রাষ্ট্রের সঙ্গে সমতা, ন্যায্যতা এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে বাস্তবধর্মী, আত্মমর্যাদাশীল, সক্রিয় ও দায়িত্বশীল অবস্থান গ্রহণের কথা বলা আছে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশ অন্য কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না এবং অন্য কোনো রাষ্ট্রকেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে দেবে না। এ ছাড়া অর্থনৈতিক কূটনীতি চর্চা, বাণিজ্য সুবিধা রক্ষা, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান, সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পদ্মা ও তিস্তাসহ সব আন্তঃসীমান্ত নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে অংশগ্রহণ বাড়ানো, উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব এবং অর্থনৈতিক জোটগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।
কর্মরত কূটনীতিকরা মনে করেন, তিন দিকে ভূ-সীমান্ত এবং বিশাল সমুদ্রসীমাসহ প্রভাবশালী প্রতিবেশী হওয়ায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ‘নিরাপত্তা বিষয়ে ভারতের স্পর্শকাতরতা’ বিবেচনায় রেখেই সরকার দেশের ভবিষ্যৎ ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য অন্য দেশগুলোর সঙ্গেও বাস্তবসম্মত সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়।
সরকারের একজন কূটনীতিক বলেন, কূটনৈতিক সম্পর্কের সবকিছু কৌশলগত বিষয় নয়। এ কারণে ‘ভারত অথবা চীন’ এবং ‘যুক্তরাষ্ট্র অথবা চীন’ এমন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় সফর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আগে ভারত নয়, চীন যেতে হবে’ এ চিন্তা থেকে চীন সফরটি হয়নি। চীন সফরটি হয়েছে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের দিক থেকে জাতীয় প্রয়োজন বিবেচনায় রেখে। ‘চীন সফর আগে’ না ‘ভারত সফর আগে’ চিন্তার এই চক্র থেকে সরে আসাও দরকার বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ভারতীয় কৌশলগত চিন্তক ড. ব্রহ্ম চ্যালানি গত সোমবার এক এক্স পোস্টে বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও কল্যাণের জন্য ভারতের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক অত্যন্ত জরুরি। অথচ গত ছয় মাস ধরে নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নয়াদিল্লি সফরের জন্য “মোদির আমন্ত্রণ গ্রহণে গড়িমসি করছেন’, যেন এই সফরটি করা ভারতকে কোনো অনুগ্রহ করার শামিল হবে।”
ভারতের সরকার ও সরকারের বাইরের অনেকের এমন দৃষ্টিভঙ্গি প্রসঙ্গে বাংলাদেশের একজন কূটনীতিক বলেন, হিমালয় থেকে দক্ষিণে অবস্থিত সব রাষ্ট্রকে ভারত কেবল নিজের স্বার্থে ‘নিয়ন্ত্রণ’ করতে চায়। এ কারণে ভারতীয়রা আশা করে প্রতিবেশী যেকোনো রাষ্ট্রে কেউ নতুন সরকার গঠন করলে তাকে দিল্লি আগে যেতে হবে। ‘এমন আশা ত্রুটিযুক্ত’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশে নতুন সরকার গঠনের পর নরেন্দ্র মোদি নিজেও তো আগে শুভেচ্ছা সফরে যেতে পারেন। উনি যেতে চাইলে কি কোনো দেশ না বলবে? নিশ্চয়ই না।’
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের সফরের জন্য উপযুক্ত ‘পরিবেশ তৈরি’র জন্য বাংলাদেশ সরকারের দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একদিকে সফরের আমন্ত্রণ, অন্যদিকে তার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে নয়াদিল্লি থেকে ‘রাজনীতি করা’র সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে ‘চাপ তৈরি’র কৌশল থেকে ভারতের সরে আসা দরকার। দিল্লি থেকে অকারণ ‘খোঁচাখুঁচি’ বন্ধ করা দরকার। বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আরোপ করা বাধাগুলো দূর করা দরকার।
ওই কূটনীতিক বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভারতে যেতে চেয়েছিলেন। তার সরকারের সঙ্গে দূরত্ব রেখে ভারত সরকার ঠিক করেনি। তাকে আমন্ত্রণ জানানো হলে সম্পর্কের কিছু ধারাবাহিকতা রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারত। ভারতের আমলাতন্ত্রসহ ক্ষমতা কাঠামোতে যারা আছেন ও আসবেন, তাদেরও দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করা দরকার বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জ্বালানি তেল ও এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত অব্যাহত রাখার জন্য সরকার ভারতের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এ বিষয়ে গতকাল মঙ্গলবার দিল্লিতে নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘জ্বালানি সহযোগিতার জন্য দুই দেশের মধ্যে একটি ব্যবস্থা চালু আছে। অতিরিক্ত জ্বালানি সরবরাহের জন্য যে অনুরোধ [বাংলাদেশ থেকে] এসেছে, তা [ভারতের] নিজস্ব চাহিদা ও সামর্থ্য অনুযায়ী বিবেচনা করা হবে।’
জয়সওয়াল বাংলাদেশে উন্নয়ন সহযোগিতা অব্যাহত রাখা প্রসঙ্গে বলেন, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে ‘অনুকূল ও গঠনমূলক’ সম্পর্ক চায়।
