ইরানের দুই কূটনীতিককে বহিষ্কার করবে ফ্রান্স

ফন্ট সাইজ:

তেহরানে ফরাসি দূতাবাসের দুই কর্মীকে আটক ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগের জেরে ফ্রান্সে নিযুক্ত দুই ইরানি কূটনীতিককে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বহিষ্কার করবে ফ্রান্স। ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো ১৮ আগস্ট এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। এর একদিন আগে ইরানও তেহরানে কর্মরত দুই ফরাসি দূতাবাসকর্মীকে ইরানে আর ফিরতে না দেওয়ার ঘোষণা দেয়। পাল্টাপাল্টি এই পদক্ষেপে প্যারিস ও তেহরানের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বারো জানিয়েছেন, জুলাইয়ে তেহরানে ফরাসি দূতাবাসের দুই কর্মীর সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে, তার জবাব হিসেবেই ফ্রান্স এই পদক্ষেপ নিচ্ছে। তিনি ঘটনাটিকে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, এর পরিণতি থাকা প্রয়োজন। ফ্রান্সে থাকা দুই ইরানি কূটনীতিককে খুব শিগগিরই বহিষ্কার করা হবে বলে জানান তিনি।
ঘটনার সূত্রপাত ১৯ জুলাই। ফরাসি সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, তেহরানে একটি ব্যক্তিগত স্থানে বৈঠকের সময় ফরাসি দূতাবাসের দুই কর্মীকে ইরানি নিরাপত্তা বাহিনী আটক করে কয়েক ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করে। ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, তাদের একজনকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয় এবং দুজনের মোবাইল ফোন নিয়ে নেওয়া হয়। তাদের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতেও বাধা দেওয়া হয়েছিল।
ফরাসি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, আটক দুই কর্মী দূতাবাসের পেশাগত দায়িত্ব পালন করছিলেন। পরে তারা তেহরানে অবস্থিত ফরাসি দূতাবাসে ফিরে যান এবং ২২ জুলাই প্যারিসে ফেরত আসেন। ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো ঘটনাটিকে গুরুতর ও পূর্বপরিকল্পিত ভয় দেখানোর ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেন এবং কূটনৈতিক দায়মুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলেন।
অন্যদিকে ইরান ফ্রান্সের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরানের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই দুই ফরাসি কর্মী এমন কয়েকজনের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন, যারা জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত তদন্তের আওতায় ছিলেন। তাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর কূটনৈতিক পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে ইরানি পক্ষ দাবি করেছে। ইরানের বক্তব্য, তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের শারীরিক নির্যাতন বা ভয় দেখানোর ঘটনা ঘটেনি।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ১৭ আগস্ট জানান, ওই দুই ফরাসি দূতাবাসকর্মী ভিয়েনা কনভেনশনের বিধান লঙ্ঘন করেছেন। তার অভিযোগ, তারা ইরানের নাগরিক সমাজকে সহায়তার কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। ইরানের দৃষ্টিতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপের শামিল।
ইরানের এই অবস্থানের পর দেশটি ঘোষণা দেয়, ওই দুই ফরাসি কর্মীকে আর ইরানে ফিরতে দেওয়া হবে না। এর পরদিনই ফ্রান্স পাল্টা দুই ইরানি কূটনীতিককে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে।
ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, তেহরানে থাকা ওই দুই কর্মীর দায়িত্বের মধ্যে ইরানের নাগরিক সমাজ, শিক্ষার্থী ও শিল্পীদের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গড়ে তোলার কাজও ছিল। ফ্রান্স এ ধরনের কার্যক্রমকে তার কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের অংশ হিসেবে দেখে। ইরান অবশ্য এসব কর্মকাণ্ডকে ভিন্নভাবে দেখছে এবং এগুলোকে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছে।
এই বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে কূটনৈতিক কর্মীদের অধিকার ও দায়িত্বের ব্যাখ্যা। ফ্রান্সের অভিযোগ, তেহরানে তার কর্মীদের আটক ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে এবং তাদের কূটনৈতিক সুরক্ষা লঙ্ঘন করা হয়েছে। ইরানের দাবি, সংশ্লিষ্ট ফরাসি কর্মীরা কূটনৈতিক দায়িত্বের সীমা অতিক্রম করে এমন কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন, যা ইরানের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
ফ্রান্স ২১ জুলাই ইরানের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে তলব করে ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছিল। ফরাসি কর্তৃপক্ষের অভিযোগের জবাবে ইরান ওই ঘটনার ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে এবং ফরাসি অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ফ্রান্স ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক আগে থেকেই নানা রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ইস্যুতে উত্তেজনাপূর্ণ। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানের নাগরিক সমাজের সঙ্গে ফ্রান্সের যোগাযোগ, ফরাসি সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং ইরানে আটক ফরাসি নাগরিকদের বিষয় দুই দেশের সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি করেছে।
Le Monde-এর অনুসন্ধান অনুযায়ী, ১৯ জুলাইয়ের ঘটনাটি তেহরানে ফ্রান্সের একটি সাংস্কৃতিক প্রকল্প নিয়ে কাজ করা দুই ইরানি গ্রাফিক ডিজাইনারের সঙ্গে ফরাসি দূতাবাসের দুই কর্মীর বৈঠকের সময় ঘটে। ওই বৈঠককে ইরানি কর্তৃপক্ষ গোপন বৈঠক হিসেবে বর্ণনা করলেও ফরাসি পক্ষ এটিকে পেশাগত কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে দেখেছে। ঘটনাটির পর ইরানি কর্তৃপক্ষ দুই ইরানি শিল্পীকে আটক করে এবং দুই ফরাসি কর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে।
ফরাসি সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দুই ফরাসি কর্মীর একজনের শরীরে আঘাতের চিহ্নও দেখা যায়। তবে ইরানি কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ফলে ঘটনাটির এই অংশে দুই দেশের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী।
এখন পর্যন্ত ফ্রান্সের ঘোষিত পদক্ষেপ হলো দুই ইরানি কূটনীতিককে বহিষ্কার করা। তবে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত পাওয়া নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, বহিষ্কার এখনো কার্যকর হয়নি। ফ্রান্স জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে। একইভাবে ইরানও দুই ফরাসি দূতাবাসকর্মীকে দেশে ফিরতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর রাখছে।
দুই দেশের এই পাল্টাপাল্টি কূটনৈতিক পদক্ষেপের পর পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ফ্রান্সের বহিষ্কার কার্যকর হওয়ার পর ইরান পাল্টা কোনো পদক্ষেপ নেয় কি না, তার ওপর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের পরবর্তী পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে।
প্রকাশ্য ও যাচাইকৃত তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্স যে দুই ইরানি কূটনীতিককে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাদের নাম এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তাই তাদের পরিচয় সম্পর্কে কোনো অনুমান বা অযাচাইকৃত তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না।