জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ৬৯০ বন্দি এখনো পলাতক রয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৬৬ জনের বন্দি সংক্রান্ত কোনো নথি কারা অধিদপ্তরের কাছে নেই। এ ছাড়া কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ৯ জঙ্গির মধ্যে তিনজন এখনো গ্রেপ্তার হননি। মঙ্গলবার কারা অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহার হোসেন। তিনি বলেন, দেশের ৭৫টি কারাগারে ৯৮ হাজার বন্দি আছে, যা ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ। কারাগারের ধারণ সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ইতিমধ্যে ২টি কেন্দ্রীয় কারাগার ও ৪টি জেলা কারাগার চালু করা হয়েছে। ৫ই আগস্টের পর নরসিংদী জেল থেকে ৮২৬ জন বন্দি পালিয়ে গিয়েছিল। এদের মধ্যে ৬৬০ জনকে ফেরত আনা গিয়েছে। কিন্তু ১৬৬ জনকে ফেরত আনা সম্ভব হয়নি। তাদের বন্দির নথি কারা অধিদপ্তরের হাতে নেই। এ ছাড়া কারাগার থেকে ৯ জন জঙ্গি পালিয়ে গিয়েছিল এদের মধ্যে ৩ জন জঙ্গি এখনো পলাতক রয়েছেন।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ধারণক্ষমতার স্বল্পতার কারণে অনেক দুর্ধর্ষ আসামিকে আলাদা করে রাখা যাচ্ছে না। কিছু দুর্বলতা থাকায় সাধারণ আসামিরা হয়তো জঙ্গিদের সংস্পর্শে এসেছে। তবে সেটি চেষ্টা করা হচ্ছে তাদের আলাদা রাখার।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের কারাগারে মোবাইল ফোনে কথা বলার বিষয়ে কারা মহাপরিদর্শক বলেন, শতভাগ নিশ্চিত করতে পারছি না যে, তারা (মন্ত্রী ও এমপিরা) মোবাইলে কথা বলছেন না। একইসঙ্গে এর সঙ্গে জড়িত যারা তাদেরকে ছাড় দিচ্ছি না। গত এক বছরে প্রায় ৩ হাজার মোবাইল জব্দ করেছি। এখন এর প্রবণতা কমে এসেছে। এ ছাড়া অনেকেই আছেন যাদেরকে আমরা স্পেশাল জোনে রেখেছি, যেখানে জ্যামার রয়েছে। মোবাইল ফোন কারাগারে নিয়ে গেলেও জ্যামারের কারণে ব্যবহার করতে পারছেন না তারা। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ও এমপিদের কারাগারে কোনো বিশেষ সুবিধা দেয়া হচ্ছে না। বন্দির মৃত্যুর সংখ্যা তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০২৫ সালে কারাগারে ১৮৭ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে।
চলতি বছর এখন পর্যন্ত ১২২ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। একইসঙ্গে কারাগারগুলোতে চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে বলেও জানান তিনি। বন্দিদের মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারা হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কারা সদর দপ্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মেডিকেল চেকআপের জন্য প্যাথলজি ল্যাব চালু করা হয়েছে। এ ছাড়া ৫৫ জন ডিপ্লোমা নার্সের সুপারিশ পাওয়া গেছে এবং তাদের পদায়নের মাধ্যমে কারাগারের স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পাবে। সম্প্রতি ৭৭টি এম্বুলেন্স টিঅ্যান্ডই ভুক্ত করা হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন এম্বুলেন্স সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কারাগারের মূল দর্শনকে আরও সংশোধন ও পুনর্বাসনমুখী করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ জেলের নাম পরিবর্তন করে ঈঁংঃড়ফরধষ ধহফ ঈড়ৎৎবপঃরড়হ ঝবৎারপব ইধহমষধফবংয করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কারা মহাপরিদর্শক মোতাহের হোসেন।
বন্দিদের উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করতে ঈড়ৎৎবপঃরড়হধষ ওহফঁংঃৎরধষ চধৎশ স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ এ সাবান উৎপাদন কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং উৎপাদিত সাবান বন্দি ও স্টাফদের জন্য সরবরাহ করা হচ্ছে।
বন্দিদের খাবারের মান উন্নয়ন করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বন্দিদের খাবার নিয়ে একটি অভিযোগ ছিল- খাবারের মান নিম্নমানের এবং নির্ধারিত পরিমাণের তুলনায় কম দেয়া হতো। আমরা কঠোরভাবে খাবারের মান নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছি। গত দুই বছরে আমি বিশ্বাস করি, এখন খাবারের পরিমাণ ও মান নিয়ে তেমন কোনো অভিযোগ পাওয়া যাবে না। আমরা আধুনিক রুটি মেকিং মেশিন স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছি। ইতিমধ্যে কেরানীগঞ্জ ও চট্টগ্রামের দুটি কারাগারে এ ধরনের মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। ধীরে ধীরে যেখানে বন্দির সংখ্যা বেশি, সেখানে অটোমেটিক রুটি মেকিং মেশিন স্থাপন করা হচ্ছে।
মাদক নিয়ন্ত্রণে বিশেষ কারাগার: কারাগারে মাদক প্রবেশের বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেয়া হচ্ছে না উল্লেখ করে কারা মহাপরিদর্শক বলেন, বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার বন্দি মাদকসংক্রান্ত মামলায় কারাগারে আছেন। তাদের বড় একটি অংশ মাদকসেবী। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফেনী-২ ও কিশোরগঞ্জে দুটি মাদক বিশেষ কারাগার চালু করা হয়েছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ডিজিটালাইজেশন: কারা মহাপরিদর্শক মোতাহের হোসেন বলেন, কারাগারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রযুক্তিনির্ভর করতে কারা অধিদপ্তর এআইনির্ভর সিসিটিভি, বডি ক্যামেরা, বডি স্ক্যানার, লাগেজ স্ক্যানার, মোবাইল ডিটেক্টর ও মোবাইল জ্যামিং সিস্টেমসহ বিভিন্ন প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছে বলে। এর পাশাপাশি দেশব্যাপী কারাগারগুলো কারা অধিদপ্তরের নিজস্ব ফাইবার নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হয়েছে। ডিজিটাল এটেন্ডেন্স সিস্টেম ও টিম ট্র্যাকার চালুর ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি এবং কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ আরও কার্যকর হয়েছে।
কারাগারে মাদক প্রবেশে কারারক্ষীদের জড়িত প্রসঙ্গে কারা মহাপরিদর্শক বলেন, মাদক ও আর্থিক দুর্নীতি নিয়ে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি মেনে চলছি। মাদক সংক্রান্ত অপরাধে কেউ যদি জড়িয়ে পড়ে তাহলে তাদের জন্য আমরা অত্যন্ত কঠোর। গত দুই বছরে এসব কারণে ২১ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর, ৮২ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। ৮৭০ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে। এ ছাড়াও ছোটখাটো অপরাধে ৩০৩ জনকে বিভিন্ন বিভাগের বাইরে পাঠানো হয়েছে।
