৭০ অনুচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেবে পার্লামেন্ট, হাইকোর্ট নয়

ফন্ট সাইজ:

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার জাতীয় সংসদের। এই রিট আবেদনে কোনো সারবত্তা নেই- এমন পর্যবেক্ষণ দিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তফসিল ও ৭০ অনুচ্ছেদ চ্যালেঞ্জ করা রিট খারিজ করে দিয়েছেন আদালত। জাতীয় সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে আসন শূন্য হওয়ার বিধান সংক্রান্ত সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ এবং আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তফসিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে এই রিট দায়ের করা হয়েছিল। মঙ্গলবার বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রিট খারিজের এই আদেশ দেয়। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তার সঙ্গে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মামুন চৌধুরী ও আখতার হোসেন মো. আব্দুল ওয়াহাব। অন্যদিকে রিটকারী আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ নিজেই নিজের পক্ষে শুনানি করেন।

গত ১৩ই অগাস্ট সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ জনস্বার্থে রিটটি দায়ের করেন। মানবজমিনকে তিনি বলেন, হাইকোর্ট তার রিট আবেদন খারিজ করলেও এই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করবেন- কিনা এমন সিদ্ধান্ত এখনো নেননি। রিটে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের ৬ই আগস্টের তফসিল কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না তা জানতে রুল চাওয়া হয়েছিল। একইসঙ্গে রুল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় ওই তফসিলের কার্যক্রম স্থগিত চাওয়া হয়। আদেশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, রিটকারীর বক্তব্য ছিল, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে স্বতন্ত্র ও স্বাধীনভাবে কোনো সংসদ সদস্য পার্লামেন্টের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ বা ভোট দিতে পারেন না এবং প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও দলের মনোনীত প্রার্থীর বাইরে ভোট দেয়ার সুযোগ নেই। পাশাপাশি তিনি দ্রুততার সঙ্গে নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টিকেও চ্যালেঞ্জ করেছিলেন।

এর জবাবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনি যুক্তি হচ্ছে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে থাকা ৭০ অনুচ্ছেদ এখনো একইভাবে আছে। নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনের পর যখন প্রেসিডেন্সিয়াল ফর্ম থেকে সরকার ব্যবস্থা পার্লামেন্টারি ফর্মে আসে, তখন সংবিধানের ১২তম সংশোধনী গণভোটে যায়। সেই গণভোটে ৭০ অনুচ্ছেদটিও কিছুটা সংশোধিত আকারে জনগণের মতামতের ভিত্তিতে অনুমোদিত হয়। পরবর্তীতে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭২ সালের মূল অনুচ্ছেদটিই প্রতিস্থাপিত হয়। যে সংশোধনীর ব্যাপারে বাংলাদেশের জনগণ গণভোটের মাধ্যমে রায় দিয়েছে এবং যা গত ৫৪ বছর ধরে সংবিধানে একইরকমভাবে আছে, সেটি নির্বাচনকে সামনে রেখে চ্যালেঞ্জ করে প্রতিকার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আদালতে নজির হিসেবে ১৯৯১ সালের একটি রায়ের কথা তুলে ধরেন তিনি। ওই সময় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আইন হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করা হলেও আদালত রায়ে জানিয়েছিল, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদটি সংবিধানের সঙ্গে কোনোভাবেই সাংঘর্ষিক নয়।

দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে তিনি আদালতকে জানান, সংবিধানের ৫০ ও ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে নির্বাচন আয়োজনের একটি সর্বোচ্চ সময়সীমা দেয়া আছে, কিন্তু এর আগেই নির্বাচন করা যাবে না- এমন কোনো কথা নেই। পার্লামেন্ট মনে করেছে পদটি দ্রুত পূরণ করা দরকার, সে কারণেই অধিবেশন ডেকে সাংবিধানিক নিয়মেই নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে রিটকারীর সংক্ষুব্ধ হওয়ার কারণ নেই।
রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই একই আইনজীবী ২০১৭ সালেও ৭০ অনুচ্ছেদ চ্যালেঞ্জ করে রিট করেছিলেন। সে সময় হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চে বিভক্ত আদেশ আসার পর ২০১৮ সালে তৃতীয় বেঞ্চের বিচারপতি এ টি এম সাইফুর রহমান রিটটি সরাসরি খারিজ করে দেন এবং জানান, এটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। ওই আদেশের পর রিটকারী আপিল বিভাগে যাননি।

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট রুলসের সুস্পষ্ট বিধান হলো, কোনো পিটিশন রিজেক্ট হয়ে গেলে নতুন কোনো গ্রাউন্ড ছাড়া একই বিষয়ে পুনরায় রিট দায়ের করা যায় না। গত আট বছরে ইতিমধ্যে দু’জন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। তাই নতুন করে এটি আর বিচার বিশ্লেষণের সুযোগ নেই। তিনি বলেন, রিট সরাসরি খারিজ হওয়ার পর রিটকারী ইউনুছ আলী আকন্দ সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সরাসরি আপিল বিভাগে যাওয়ার জন্য আদালতের কাছে একটি সনদের (সার্টিফিকেট) আবেদন করেছিলেন। বিষয়গুলো উচ্চ আদালতে আগেই চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছে জানিয়ে রাষ্ট্রপক্ষ এর বিরোধিতা করলে আদালত সনদের আবেদনটিও নাকচ করে দেয়।

আদালতের পর্যবেক্ষণের বিষয়ে তিনি বলেন, রিটকারী পার্লামেন্টকে নির্দেশ দেয়ার আবেদন করেছিলেন যেন ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হয়। আমরা আদালতকে বলেছি, আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ- নির্বাহী, বিচার ও আইনসভা স্বতন্ত্রভাবে কাজ করবে। সংবিধান সংশোধন বা বিয়োজন পার্লামেন্টের নিজস্ব এখতিয়ার, সেখানে আদালত নির্দেশ দিতে পারে না। তিনি আরও বলেন, শুনানিতে রিটকারী ‘জুলাই সনদে’ ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাবনার কথা উল্লেখ করেছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেছে, পার্লামেন্ট ইতিমধ্যে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে, যারা আগামী দিনে সংবিধানকে যুগোপযোগী ও সংশোধনের বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। সুতরাং পার্লামেন্ট কী করবে বা করবে না, সে বিষয়ে নির্দেশ দেয়া আদালতের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না।