বিদেশে কর্মী পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে আনার উদ্যোগ

বিদেশে কর্মী পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে আনার উদ্যোগ

ফন্ট সাইজ:

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কর্মী পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনভিত্তিক করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বৈধতা, বিদেশে কর্মীর চাহিদাসহ অন্যান্য তথ্য ব্যবস্থাপনায় আরও স্বচ্ছতা আনা হবে। অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়া ঠেকাতে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এক্ষেত্রে সমাজের প্রতিটি স্তরকে যুক্ত করতে হবে। গতকাল সকালে রাজধানীর কাওরান বাজারে প্রথম আলোর কার্যালয়ে ‘নিরাপদ অভিবাসন ও বিদেশফেরতদের পুনঃএকত্রীকরণ: বাস্তবতা ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। বৈঠকের যৌথ আয়োজক ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও প্রথম আলো।

প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, অবৈধ পথে বিদেশে লোক পাঠানোর সঙ্গে জড়িত চক্র মানুষের জীবন নিয়ে চিন্তা না করে নিজ স্বার্থে কাজ করছে। এই চক্রের রুট চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ চলছে। এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জ-হবিগঞ্জ থেকে শুরু করে মাদারীপুরসহ কয়েকটি জেলায় আগামী এক মাস ব্যাপক প্রচার চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার ক্ষতি সম্পর্কে মানুষকে বোঝাতে হবে। অনেকেই জমিজমাসহ সম্পদ বিক্রি করে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে বিদেশে গিয়ে বিপদে পড়লে পরিবার-পরিজন নিঃস্ব হয়ে পড়ে। মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। তাই গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি মসজিদ, মন্দির ও গির্জাসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ বিষয়ে প্রচার চালানো প্রয়োজন। বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বিদেশে দক্ষ কর্মী পাঠানোর ওপর জোর দিয়ে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, বিদেশি নিয়োগকর্তারা যে ধরনের কর্মীর চাহিদা দেন, অনেক ক্ষেত্রে সেই দক্ষতার কর্মী পাঠানো হয় না।

যেমন প্লাম্বার বা ইলেকট্রিশিয়ানের চাহিদা থাকলেও সংশ্লিষ্ট কাজ না জানা ব্যক্তিকে পাঠানোর ঘটনা ঘটে। এতে কর্মী ও নিয়োগকর্তা উভয়ই সমস্যায় পড়েন। এ সমস্যার সমাধানে নতুন পদ্ধতি চালুর কথা জানিয়ে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী বলেন, কোনো দেশ নির্দিষ্ট দক্ষতার কর্মী চাইলে সেই দেশের নিয়োগকর্তার প্রতিনিধি বা প্রশিক্ষক বাংলাদেশে এসে প্রশিক্ষণ যাচাই করবেন। তারা প্রশিক্ষণে সন্তুষ্ট হওয়ার পর কর্মী নিয়োগ করবেন। বাংলাদেশ থেকে ছয় হাজার চালক সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেয়ার ক্ষেত্রে এমন পদ্ধতি চালু হয়েছে। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের সুযোগ কমবে। প্রবাসীদের বিভিন্ন সরকারি সেবা পেতে দূর-দূরান্ত থেকে দূতাবাস বা কনস্যুলেটে যেতে হয়, এতে সময় ও অর্থ দুটিই ব্যয় হয় উল্লেখ করে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, সরকারি সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে কিছু সেবা দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। পাসপোর্টসহ বিভিন্ন নথি ডাক বা কুরিয়ার সেবার মাধ্যমে প্রবাসীদের বাড়িতে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করা যায় কিনা, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে।

প্রবাসীদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর সরকারি পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী বলেন, সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে এই কার্ড চালুর বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে। এতে ভূমি, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসসহ বিভিন্ন সরকারি সেবায় প্রবাসীদের অগ্রাধিকার দেয়ার ব্যবস্থা থাকতে পারে। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও বিশেষ সুবিধা দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক হয়েছে। প্রবাসী সন্তানদের শিক্ষার জন্য ঋণের সীমা বাড়ানোর উদ্যোগের কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে এই ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা রয়েছে। দক্ষ কর্মী তৈরিতে দেশের ১০৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী বলেন, শুধু ভবন থাকলেই হবে না, দক্ষ প্রশিক্ষক ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। কিছু দেশের অর্থায়ন ও প্রশিক্ষক সহায়তা নেয়ার উদ্যোগ রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, কাতার বাংলাদেশের কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে প্রশিক্ষক ও অর্থায়ন দেয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে।

আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, আরবি ভাষায় অনেকটা এগিয়ে থাকা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের অল্প সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের উপযোগী করে তোলা সম্ভব। আমার নির্বাচনী এলাকার তিনটি মাদ্রাসায় এমন উদ্যোগ নিয়ে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেছে। বিদেশে দক্ষ জনবল পাঠাতে দেশের বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করা, নতুন নতুন শ্রমবাজার খোঁজা, বিদেশফেরতদের পেশায় ফেরাতে সহায়তা, বিদেশে মারা যাওয়া প্রবাসীদের মরদেহ দেশে আনার পাশাপাশি পরিবারকে সহায়তার কথা তুলে ধরেন আরিফুল হক চৌধুরী। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ছয় মাসে প্রবাসীদের জন্য অনেকগুলো কর্মসূচি নেয়া হয়েছে, যার সব প্রচার পায়নি। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার সামনে রেখেই প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মসূচিগুলো এগিয়ে নেয়া হবে। নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা, বিদেশফেরত প্রবাসীদের পুনঃএকত্রীকরণ- দুই ক্ষেত্রেই সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, গণমাধ্যম ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরীর সঞ্চা+লনায় গোলটেবিল বৈঠকে নিবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফরম) শরিফুল ইসলাম হাসান।