সরকার আরও ভালো আইন আনার কথা বলে বরং উল্টো পথে পা বাড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। তিনি বলেন, সরকার আরও ভালো আইন আনার কথা বলে মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধের আগের অধ্যাদেশগুলো বাতিল করেছে। কিন্তু বর্তমান খসড়া আইনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কমিশনের স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে। গুমের ঘটনায় তদন্তের দায়িত্বও এমন বাহিনীর হাতে দেয়ার কথা বলা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ থাকতে পারে। গতকাল বিকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে এনসিপি’র সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির আয়োজনে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ খসড়া আইন, ২০২৬: আইনি পর্যালোচনা ও করণীয় নির্ধারণ’- শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।
আখতার হোসেন বলেন, গুমের ভুক্তভোগী কোনো পরিবার অভিযোগ করতে গেলে, অভিযোগ মিথ্যা হলে পাঁচ বছরের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। ফলে গুমের ঘটনা ঘটলেও ভুক্তভোগী পরিবারকে ভয় দেখানোর সুযোগ তৈরি হবে। তিনি বলেন, আমরা একটা ফেয়ার সিস্টেম বাংলাদেশে চাই। একটা জবাবদিহি চাই। বাংলাদেশের গণতন্ত্রটা আমরা সামনের দিকে নিয়ে যেতে চাই।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আখতার বলেন, শুধুমাত্র আমলা ও বাহিনীর মতামতের ভিত্তিতে নয়, সাধারণ নাগরিকদের মতামতকে ধারণ করে নতুন করে আইনগুলো প্রণয়ন করতে হবে। আলোকচিত্রী, লেখক ও মানবাধিকার কর্মী শহিদুল আলম বলেন, এইভাবে কথা বলতে পারছি- এটা একটা বিশাল ব্যাপার এবং এটাকে ভুলে গেলে চলবে না। স্বৈরাচার চলে যাওয়ার পর একটি ভিন্ন বাংলাদেশ পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, একটি জাতি বা রাষ্ট্রের একটি শক্ত আদর্শগত ভিত্তি প্রয়োজন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভিত্তি শুরু থেকেই নানা বিতর্ক ও বিভাজনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। ১স্বাধীনতার পরও স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ, রাজাকার-নন-রাজাকারসহ নানা বিতর্ক সমাজে বিভাজন তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, এসব বিতর্কের কারণে রাষ্ট্রের মৌলিক সমস্যা ও মানুষের অধিকার-প্রাপ্তির বিষয়গুলো আড়ালে পড়ে যাচ্ছে।
অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী আরও বলেন, বিএনপি তাদের প্রতিশ্রুতি ও জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন, গুম কমিশন ও পুলিশ কমিশনের মতো স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে নেয়া উচিত নয়।
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দলগুলোর পুরনো খাসলত বদলায় না কেন- এটি বোঝা জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলো অনেক কিছু ওয়াদা করে, কিন্তু বাস্তবে তা বাস্তবায়ন করে না।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র এডভোকেট ও সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল উদ্দেশ্য সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনা। তাই এসব প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি।
জুলাই সনদ ও নির্বাচনী ইশতেহারে বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন ও সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতার বিষয়ে দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন ড. শরীফ ভূঁইয়া।
এনসিপি’র সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির উপ-প্রধান সারোয়ার তুষার বলেন, গুম প্রতিরোধের খসড়া আইনে গুম হয়েছে কি না, তা নির্ধারণের দায়িত্ব পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর দেয়া হয়েছে। অথচ এই সরকারি বাহিনীগুলোই কিন্তু এই ধরনের সম্ভাব্য গুমের সঙ্গে জড়িত থাকে এবং তারাই ঠিক করবে, গুম হয়েছে কি হয় নাই।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন- সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ব্যারিস্টার তানিম হোসেন শাওন, গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুর, মানবাধিকার কর্মী রুবি আমাতুল্লাহ প্রমুখ।
