চট্টগ্রামে শিশুদের হামের প্রকোপ যেন থামছেই না। প্রতিদিনই নতুন করে হাম বা হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে শিশু। সর্বশেষ ১৭ই আগস্ট একদিনে আরও ৫৯ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে নগরের ৫৪ জন এবং বিভিন্ন উপজেলার পাঁচজন। স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৭ই আগস্ট পর্যন্ত চট্টগ্রামের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে ২৯১ শিশু। এর মধ্যে নগরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি ২৮৭ জন এবং উপজেলা পর্যায়ে রয়েছে চারজন।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, সামপ্রতিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে অর্ধশতাধিক শিশু হাম বা হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। গত ৮ই আগস্ট এক দিনেই সর্বোচ্চ ৭৭ শিশু ভর্তি হয়। এরপর ১৩ই আগস্ট ৭৪ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল।
এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে মোট ৬ হাজার ২৭২ শিশু। এর মধ্যে ৫ হাজার ৯৮১ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। এখন পর্যন্ত ৭১৬ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এ রোগ ও উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১৫ শিশু। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে মৃত্যু হয়েছে তিনজনের।
হাম শনাক্তের জন্য এখন পর্যন্ত চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ১ হাজার ৯৫৭ শিশুর নমুনা পাঠানো হয়েছে। সর্বশেষ একদিনে পাঠানো হয়েছে আরও ৩৫ শিশুর নমুনা। নমুনাগুলো পরীক্ষা করা হচ্ছে ঢাকার পাবলিক হেল্থ ইনস্টিটিউটের ন্যাশনাল পোলিও অ্যান্ড মিসেলস-রুবেলা ল্যাবরেটরিতে।
চিকিৎসকদের মতে, হাম নিশ্চিত করতে আইজিএম অ্যান্টিবডি ও আরটি-পিসিআর পরীক্ষা প্রয়োজন। এজন্য ভাইরোলজি বা মলিকুলার ডায়াগনস্টিক সুবিধাসম্পন্ন ল্যাব দরকার। চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি)-তে এ ধরনের পরীক্ষার সক্ষমতা থাকলেও সেখানে এখনো হাম শনাক্তের পরীক্ষা চালু হয়নি।
ফলে চট্টগ্রাম থেকে নমুনা ঢাকায় পাঠিয়ে পরীক্ষার ফল পেতে কয়েক দিন সময় লাগছে। এতে দ্রুত রোগ শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) চট্টগ্রাম নগরের নয়টি ওয়ার্ডকে হামের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বিভাগ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন টিকাদানসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় এ পর্যন্ত ২ লাখ ৮১ হাজার ৬৫০ শিশুকে হামবিরোধী টিকা দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯৪ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে। জেলার ১৫ উপজেলায়ও আরও ৭ লাখ ৭৬ হাজার ৬৫৯ শিশুকে টিকা দেয়া হয়েছে।
এরপরও সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় টিকার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তবে চিকিৎসকদের ভাষ্য, টিকা নেয়ার পরও কেউ হামে আক্রান্ত হলে সাধারণত রোগের তীব্রতা তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
চমেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা বলেন, ওয়ার্ডে ভর্তি শিশুর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামাল দিতে চিকিৎসকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, আক্রান্ত শিশুদের উপসর্গ একেক রকম। শরীরে ফুঁসকুড়ি দেখা দিলেই সেটিকে হাম ধরে নেয়া ঠিক নয়। সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার পাশাপাশি এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম বলেন, হাম ও হামের উপসর্গ থাকা শিশুদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি উপসর্গের ভিত্তিতে ভুল চিকিৎসা যাতে না হয়, সে বিষয়ে চিকিৎসকদের সতর্ক করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. শেখ ফজলে রাব্বী বলেন, রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং চট্টগ্রামে হাম পরীক্ষা চালুর বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বিআইটিআইডিতে ল্যাব ও প্রয়োজনীয় জনবল রয়েছে। তবে ঢাকার বাইরে হাম পরীক্ষা চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত সরকারকেই নিতে হবে। এক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত কিছু নির্দেশনাও অনুসরণ করতে হয়।
