রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ও পরিচয় নিয়ে মিয়ানমারের সামপ্রতিক বক্তব্যে বিভ্রান্তি রয়েছে উল্লেখ করে তা সংশোধনের তাগিদ দিয়েছে বাংলাদেশ। ঢাকা বলেছে, মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামপ্রতিক বিবৃতিতে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা নিয়ে যে তথ্য দেয়া হয়েছে, তা সঠিক নয়। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে অভিহিত করার বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে বাংলাদেশ। ঢাকার অবস্থান- রোহিঙ্গাদের নিজস্ব জাতিগত পরিচয় রয়েছে এবং সামপ্রতিক সময় পর্যন্ত মিয়ানমার কর্তৃপক্ষও তা স্বীকার করেছে।
গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মিয়ানমার অনুবিভাগের মহাপরিচালক মো. তৌফিক-উর-রহমানের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত ইউ কিয়াও সোয়ে মোয়ের বৈঠকে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়। বৈঠক শেষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মিয়ানমারের সামপ্রতিক বিবৃতির বিভিন্ন তথ্য ও পরিসংখ্যান নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগের কথা রাষ্ট্রদূতকে জানানো হয়েছে।
বৈঠকে তৌফিক-উর-রহমান বলেন, মিয়ানমারের ১৫ই আগস্টের বিবৃতিতে অনেক তথ্যই ভুল পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা নিয়ে দেয়া তথ্য সঠিক নয়। জাতিসংঘের ব্যবস্থার অধীনে নিবন্ধিত তথ্যই রোহিঙ্গাদের প্রকৃত সংখ্যা প্রতিফলিত করে বলে বাংলাদেশ মনে করে।
দ্বিপক্ষীয়ভাবে সম্মত কাঠামোর আওতায় রোহিঙ্গাদের যাচাই প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে অনুরোধ করেন মহাপরিচালক। একই সঙ্গে যাচাইয়ের ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা শিবিরে জন্ম নেয়া শিশু এবং ২০১৭ সালের পর রাখাইন থেকে জোরপূর্বক পালিয়ে বাংলাদেশে আসা নতুন রোহিঙ্গাদেরও অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
বৈঠকে জানানো হয়, বাংলাদেশ বর্তমানে নতুন করে আসা রোহিঙ্গাদের নিবন্ধনের কাজ করছে। ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের প্রাথমিক তালিকার পর নিবন্ধিত নতুন রোহিঙ্গাদের তথ্য যথাসময়ে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিনিময় করা হবে। যাচাই প্রক্রিয়ায় এসব অতিরিক্ত তথ্য যথাযথভাবে প্রতিফলিত করার জন্যও অনুরোধ জানানো হয়।
রোহিঙ্গাদের পরিচয়ের প্রসঙ্গেও বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বলা হয়েছে, রোহিঙ্গারা ‘বাঙালি’ নয়, তাদের নিজস্ব জাতিগত পরিচয় রয়েছে, যা সামপ্রতিক সময় পর্যন্ত মিয়ানমার কর্তৃপক্ষও স্বীকার করেছে।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের বক্তব্য তার সরকারের কাছে তুলে ধরার আশ্বাস দিয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের নিজস্ব পরিচয় রয়েছে এবং সেই পরিচয় নিয়েই তাদের নিজ দেশে ফিরে যেতে হবে। যাচাই প্রক্রিয়া বর্তমানে চলছে, তবে তা ধীরগতিতে হচ্ছে। প্রক্রিয়াটি দ্রুত করার জন্য মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
রাষ্ট্রদূত ইউ কিয়াও সোয়ে মোয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ ও পর্যবেক্ষণগুলো তার সরকারের কাছে পৌঁছে দেয়ার আশ্বাস দেন। যাচাই করা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরুর লক্ষ্যে যাচাই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার বিষয়ে তার সরকারের অঙ্গীকারের কথাও জানান তিনি।
মিয়ানমারের বিজ্ঞপ্তিতে যা বলা হয়েছিল: মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ১৫ই আগস্টের বিজ্ঞপ্তিতে রোহিঙ্গা ও রাখাইন থেকে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের বিষয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনকে একপক্ষীয় এবং ‘ভুল তথ্য ও অপতথ্যনির্ভর’ বলে দাবি করা হয়েছে। এতে বলা হয়, রাখাইন থেকে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের প্রকৃত পরিস্থিতি তুলে ধরতেই এই ব্যাখ্যা দিয়েছে দেশটি।
মিয়ানমারের দাবি, এআরএসএ’র হামলার আগে রাখাইনের বুথিডং, মংডু ও রাতেদংয়ে ৭ লাখ ৪০ হাজারের বেশি ‘বাঙালি’ বসবাস করতো। ২০১৭ সালে হামলার পর ২ লাখের বেশি ‘বাঙালি’ ওই এলাকাগুলোতে থেকে যায় এবং ৫ লাখ ৪০ হাজারের বেশি বাংলাদেশে চলে আসে। এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে রাখাইন থেকে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার যে বর্ণনা দেয়া হয়, তা সঠিক নয় বলে দাবি করেছে দেশটি।
বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের প্রত্যাবাসনের জন্য দুই মাসের মধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে তিনটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করা হয়েছিল বলে বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়। এসব চুক্তির আওতায় ২০১৮ সালের ২৩শে জানুয়ারি, একই বছরের ১৫ই নভেম্বর এবং ২০১৯ সালের ২২শে আগস্ট মিয়ানমার প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছিল। তবে তিন দফার কোনোবারই বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিরা মিয়ানমারে ফিরে যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশের দেয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকার মধ্যে ২০২৬ সালের ৩১শে জুলাই পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনকে যাচাই করা হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। তাদের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে, ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং ৪ হাজার ২৪১ জন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল বলে দাবি করেছে মিয়ানমার।
এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে বাংলাদেশের ক্যাম্পে অবস্থানকারী সবাই মিয়ানমার থেকে আসা- এমন দাবির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশটি। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশে নৌপথে যাওয়া ‘বোট পিপল’সহ অন্য ব্যক্তিদের মিয়ানমার থেকে আসা বলে অভিহিত করারও বিরোধিতা করেছে তারা।
মিয়ানমারের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ১৯৭৮, ১৯৯১ ও ১৯৯২ সালে পরিচালিত অভিবাসন যাচাইয়ের সময় রাখাইনের কিছু ‘বাঙালি’ বাংলাদেশে চলে যায়। তবে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় ১৯৭৮ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে ১ লাখ ৮৬ হাজার ৯৬৮ জন এবং ১৯৯২ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৪৯৫ জন বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিকে মিয়ানমার সফলভাবে গ্রহণ করেছিল বলে দাবি করা হয়।
প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের স্বার্থে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে যাচাই করা বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে মিয়ানমার। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের প্রত্যাবাসন বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যেই সমাধান করতে হবে। তাই বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক ইস্যু হিসেবে উপস্থাপনের ঘটনায় মিয়ানমার ‘গভীরভাবে অসন্তুষ্ট’ বলেও উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে প্রত্যাবাসন নিয়ে গঠনমূলক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা জানানো হয়েছে।
