ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে লিবিয়ায় পাড়ি জমিয়ে নির্যাতন, প্রতারণা ও কারাভোগের শিকার হয়ে গত দুই মাসে দেশে ফিরেছেন সুনামগঞ্জের ৬৬ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মাধ্যমে দেশে ফিরে আসা এসব তরুণের অনেকেই এখন ঋণের বোঝা ও মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
ফিরে আসা ব্যক্তিরা জানান, দালালদের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করে তারা লিবিয়ায় যান। পরে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পাঠানোর কথা বলে তাদের কাছ থেকে আরও টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে না পারলে আটকে রেখে মারধর ও নির্যাতন করা হতো। অনেককে আবার লিবিয়ার মাফিয়া চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়।
তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুল লতিফের ছেলে আল আমিন ২০২২ সালে লিবিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন। পর্যটন ভিসায় প্রথমে দুবাই যান তিনি।
সেখানে এক সপ্তাহ অবস্থানের পর লিবিয়ায় পাড়ি জমান। প্রায় সাড়ে তিন বছর লিবিয়ায় কাজ করে মাসে সর্বোচ্চ ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা আয় করতেন। পরে এক দালালের সঙ্গে সাড়ে ৭ লাখ টাকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিস যাওয়ার চুক্তি করেন আল আমিন। চুক্তির পুরো টাকা দেয়ার পর একটি বোটে করে তাদের সমুদ্রে পাঠানো হয়। প্রায় ৬২ ঘণ্টা সমুদ্রে ভাসার পর লিবিয়ার পুলিশ তাদের আটক করে। আল আমিন বলেন, পরে ওই দালাল পুলিশের কাছ থেকে তাদের ছাড়িয়ে নিয়ে আবারো গ্রিসে পাঠানোর চেষ্টা করেন। দ্বিতীয়বারও লিবিয়ার পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন তিনি। এরপর এক মাস পাঁচদিন কারাভোগ করতে হয়।
পরে আইওএমের মাধ্যমে দেশে ফিরে আসেন। দিরাই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের খেজাউরা গ্রামের সাইফুল ফজর আলী চার বছর আগে সৌদি আরব ও তুরস্ক হয়ে লিবিয়ায় যান। তার অভিযোগ, লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর দালাল তাকে মাফিয়া চক্রের কাছে বিক্রি করে দেন। টাকা আদায়ের জন্য তাকে নির্যাতন করা হয়। মাফিয়া চক্রের হাত থেকে বাঁচতে দেশে পরিবারের কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা নিয়ে দিতে হয়। এরপরও তাকে আরেকটি চক্রের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
সাইফুল বলেন, ওই চক্র ইউরোপে পাঠানোর কথা বলে আরও ৫ লাখ টাকা দাবি করে। টাকা দেয়ার পর সমুদ্রের পাড়ে লিবিয়ার পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে। পুলিশের কাছ থেকে ছাড়া পেতেও আরও ৫ লাখ টাকা দিতে হয়েছে। পরে আইওএমের মাধ্যমে দেশে ফেরেন তিনি।
জামালগঞ্জের মো. আহাদুল্লাহ জানান, লিবিয়ায় যাওয়ার পর চার মাস পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করেন তিনি। ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্নে এক দালালের সঙ্গে ৮ লাখ টাকায় চুক্তি করেন।
প্রথমে ৩ লাখ টাকা দিয়ে লিবিয়ায় যান। পরে বাকি ৫ লাখ টাকার জন্য দালালরা তাকে আটকে রেখে মারধর করে। একপর্যায়ে সেখান থেকে পালিয়ে যান আহাদুল্লাহ। তার কাছে মোবাইল ফোন না থাকার সুযোগে দালালরা দেশে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার নির্যাতনের ছবি পাঠিয়ে আরও ৫ লাখ টাকা দাবি করে। ছেলেকে দালালদের হাতে আটক মনে করে পরিবার ওই টাকা পরিশোধ করে। কিন্তু তারা জানতেন না, এরই মধ্যে আহাদুল্লাহ পালিয়ে এসেছেন।
সুনামগঞ্জে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের জেলা কো-অর্ডিনেটর মো. নজরুল ইসলাম বলেন, গত দুই মাসে সুনামগঞ্জের ৬৬ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী লিবিয়া থেকে দেশে ফিরেছেন।
দেশে ফেরার পর তাদের অনেকেই ঋণগ্রস্ত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছেন। এসব অভিবাসনপ্রত্যাশীকে পুনরেকত্রীকরণের মাধ্যমে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে ব্র্যাক। সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) সুজন সরকার বলেন, গত কয়েক মাসে এ বিষয়ে ৭ থেকে ৮টি মামলা হয়েছে। এসব মামলার তদন্ত সিআইডি’র কাছে পাঠানো হয়েছে। কয়েকটি মামলায় সিআইডি চার্জশিট দিয়েছে এবং কয়েকজন আসামিকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। তবে অধিকাংশ দালাল দেশের বাইরে অবস্থান করায় তাদের আইনের আওতায় আনতে কিছুটা জটিলতা রয়েছে।
