চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় চার দিন পর অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা করেছে পুলিশ। নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ মামলা না করায় সোমবার সীতাকুণ্ড মডেল থানায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলাটি করে। সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ইয়ার্ডের একটি স্ক্র্যাপ জাহাজের ব্যালাস্ট ট্যাংকে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় ইউডি মামলা করা হয়েছে। ফরেনসিক প্রতিবেদন ও তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
গত শুক্রবার সকালে ভাটিয়ারী স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হন শ্রমিকরা। পরে একে একে ৯ জনের মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনার পর জাহাজের ভেতরে বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতির আশঙ্কায় তদন্তকারীরা তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে প্রবেশ করতে পারেননি।
ঘটনার তিন দিন পর সোমবার বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থায় দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজে প্রবেশ করে তদন্ত শুরু করেন সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্যরা। শিল্প মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের (বিএসআরবি) প্রতিনিধিদের পাশাপাশি ঢাকার বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ, পরিবেশ ও নৌ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও ঘটনাস্থলে ছিলেন। চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তর, বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারাও তদন্তে অংশ নেন। এদিকে ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় ফেরদৌস স্টিলের শ্রমিক নিরাপত্তা ও আইন পরিপালন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, প্রায় এক দশকে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে তিনটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৭ ও ২০১৮ সালের দুটি মামলায় প্রতিষ্ঠানটিকে দোষী সাব্যস্ত করে জরিমানা করেন আদালত। ২০১৭ সালের আগস্টে শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রথম মামলাটি করে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই)। মামলায় তৎকালীন মালিক মো. লোকমান হাকিম ও ইয়ার্ড ম্যানেজার মো. ইউসুফ আলীকে আসামি করা হয়। ওই মামলায় চট্টগ্রাম শ্রম আদালত প্রতিষ্ঠানটিকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেন।
পরের বছর একই ধারায় আবার মামলা করে ডিআইএফই। ওই মামলাতেও লোকমান হাকিম ও ইউসুফ আলীকে আসামি করা হয়। ২০১৮ সালের নভেম্বরে আদালত প্রতিষ্ঠানটিকে দোষী সাব্যস্ত করে দুই হাজার টাকা জরিমানা করেন। শুধু পুরনো মামলাই নয়, চলতি বছরও ফেরদৌস স্টিলের বিরুদ্ধে শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা হয়েছে। ডিআইএফই চট্টগ্রামের পক্ষ থেকে করা ওই মামলায় বর্তমান মালিক ফেরদৌস ওয়াহিদ ও ইয়ার্ড ম্যানেজার মো. ইউসুফ আলীকে আসামি করা হয়েছে। ডিআইএফই চট্টগ্রামের উপ-মহাপরিদর্শক মাহাবুবুল হাসান বলেন, আগের দুটি মামলায় আদালতের রায়ে শ্রম আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। চলতি বছর ইয়ার্ড পরিদর্শন করেও আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়ায় নতুন মামলা করা হয়েছে।
ফেরদৌস স্টিল বর্তমানে ‘গ্রিন শিপইয়ার্ড’ হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। হংকং কনভেনশনের আওতায় জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণে শ্রমিকের নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। বাংলাদেশে ২০২৫ সালের জুন থেকে এ কনভেনশনের বিধান কার্যকর হয়।
