‘আমাকে শান্তিতে মরতে দাও’

তিশার জীবনের শেষ ৯০ মিনিট

‘আমাকে শান্তিতে মরতে দাও’

ফন্ট সাইজ:

ভুপালে তিশা শর্মার মৃত্যুরহস্য ক্রমশ জটিল হচ্ছে। সর্বশেষ অনুসন্ধানে জানা গেছে, তার জীবনের শেষ ৯০ মিনিটে কি ঘটেছিল। এ সময় তিনি তার ননদকে লিখেছিলেন- ‘আমাকে এখন শান্তিতে মরতে দাও’। ১২ই মে রাত ৯টা ৩৬ মিনিট। তিশা শর্মা তার ননদ রাশি আবরোলকে আতঙ্কজনক হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা পাঠান। সেখানে তিনি তার স্বামীর উদ্দেশে লিখেছেন, ‘তাকে বলো, তার স্ত্রীর অবশিষ্টাংশ নিয়ে যেতে। তবে কাল। আমাকে এখন শান্তিতে মরতে দাও।’ এর চার মিনিট পর সিবিআইয়ের উদ্ধৃত সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, ৩৪ বছর বয়সী তিশাকে ভুপালের বাড়ির নিচতলা থেকে একা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে এবং ছাদের দিকে যেতে দেখা যায়। রাত ৯টা ৪১ মিনিটে তিনি তার বাবাকে ফোন করেন। তখন তিনি কাঁদছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিশা তার বাবাকে জানান, তার স্বামী সমর্থ সিং ‘খুব আক্রমণাত্মক ও সহিংস’ হয়ে উঠেছেন। তিনি ভয় পাচ্ছেন এবং তার বাবা-মাকে যত দ্রুত সম্ভব তার কাছে আসতে বলেন।

রাত ১০টা ৫ মিনিটের দিকে তিনি মাকে ফোন করেন। আবারও জানান, সমর্থ আক্রমণাত্মক ও সহিংস আচরণ করছেন। এরপর ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। রাত ১০টা ২৩ মিনিটে সিসিটিভিতে সমর্থ সিং ও তার মা গিরিবালা সিংকে ছাদের দিকে যেতে দেখা যায়। পরে তিশাকে নিচে নামিয়ে আনা হয় এবং ভুপালের অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসে (এইমস) নেয়া হয়। সেখানে রাত ১০টা ৫৫ মিনিটের দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

তিশা শর্মার মৃত্যুর ঘটনায় সিবিআইয়ের ৬০০ পৃষ্ঠার চার্জশিটে এই অসাধারণ মিনিটভিত্তিক বিবরণ উঠে এসেছে। ১৪ আগস্ট দাখিল করা চার্জশিটে তিশার স্বামী সমর্থ সিং এবং তার মা গিরিবালা সিংয়ের বিরুদ্ধে তিশাকে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক নির্যাতন এবং আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ আনা হয়েছে। গিরিবালা ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও জেলা জজ। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (বিএনএস) ৮৫, ১০৮ ও ৩(৫) ধারায় দু’জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেছে সিবিআই। তবে চার্জশিটটি শুধু একটি রাতের ঘটনা নয়, এতে উঠে এসেছে বিস্তারিত। হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা, ফোনকল, পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য, চিকিৎসক, কাউন্সেলিং সেশন, সিসিটিভি ফুটেজ এবং আর্থিক অভিযোগের মাধ্যমে সংস্থাটি এমন একটি দাম্পত্য সম্পর্কের চিত্র তুলে ধরেছে, যেখানে মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যেই মানসিক নির্যাতন ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল বলে অভিযোগ। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মৃত্যুর দিন সকালেই তিশা ভুপাল ছেড়ে পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য একটি ট্রেনের টিকিট কেটে ফেলেন।

সিবিআইয়ের দাবি, সাবেক মিস পুনে তিশা আগে অভিনেত্রী হিসেবে কাজ করতেন। পরে করপোরেট খাতে যোগ দেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি অনলাইন ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে সমর্থ সিংয়ের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। একই বছরের ৯ই ডিসেম্বর তাদের বিয়ে হয়। সংস্থাটির অভিযোগ, বিয়ের পর সমর্থ বারবার তিশাকে মানসিক নির্যাতন করতেন। বিয়ের আগে তিশা তার কাছে যেসব সম্পর্কের কথা জানিয়েছিলেন, সেগুলো নিয়ে তিনি যৌন অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করতেন এবং তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন। তিশা তার আচরণ নিয়ে অভিযোগ করলে গিরিবালা বারবার ছেলের পক্ষ নিতেন বা তাকে উসকে দিতেন বলেও অভিযোগ করেছে সিবিআই।

চার্জশিটে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চ ও এপ্রিল মাসে এই সম্পর্ক দ্রুত অবনতির দিকে যায়। তিশার বাবা হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন থাকাকালে তিনি বাবার কাছে ছিলেন। সিবিআইয়ের অভিযোগ, তখনও সমর্থ ও গিরিবালা তাকে ভুপালে ফিরে যাওয়ার জন্য চাপ দেন। ২৪শে মার্চ তিনি ফিরে আসেন। এরপর তিশা ১৬ই এপ্রিল জানতে পারেন যে তিনি অন্তঃসত্ত্বা। সিবিআইয়ের দাবি, গর্ভধারণটি অনাকাক্সিক্ষত হওয়ায় এবং সমর্থের কথিত নির্যাতনমূলক আচরণের কারণে তিশা গর্ভধারণ চালিয়ে যাবেন কি না, তা নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন।

১৭ই এপ্রিল এ নিয়ে তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়। সিবিআইয়ের অভিযোগ, ওই সময় সমর্থ আবারও তিশাকে অত্যন্ত অবমাননাকর ভাষায় কথা বলেন। সংস্থাটির দাবি, ওই দিনই তিশা শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যান। দাম্পত্য বিরোধের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিষয়ও সামনে আসে। চার্জশিট অনুযায়ী, তিশার ডিম্যাট অ্যাকাউন্টে প্রায় ২০ লাখ রুপির শেয়ার ছিল। সিবিআইয়ের অভিযোগ, সমর্থ ও গিরিবালা তাকে ওই বিনিয়োগ একটি যৌথ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরের জন্য চাপ দেন। ৭ই এপ্রিল তিশা ও সমর্থের নামে ওই যৌথ অ্যাকাউন্টটি খোলা হয়। চার্জশিটে বলা হয়েছে, তিশা এতে রাজি হননি। তিনি তাদের জানান, ওই অর্থ তার বাবার। মৃত্যুর দিনও এই আর্থিক চাপের বিষয়টি আবার সামনে আসে।

সিবিআইয়ের দাবি, ১২ই মে সন্ধ্যা ৭টা ৫১ মিনিটে তিশা তার ননদ রাশি আবরোলকে ফোন করে জানান, তিনি বাড়ি ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, সমর্থ তাকে বিনিয়োগের অর্থ হস্তান্তরের জন্য চাপ দিচ্ছেন, যাতে তিনি তা চীনা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে পারেন। যৌতুকের বিষয়টি নিয়ে সিবিআই আলাদাভাবে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।

চার্জশিটের একাধিক পৃষ্ঠাজুড়ে তিশার নিজের হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা রয়েছে। ৩০শে এপ্রিল ভুপালে ফিরে আসার পর তিনি মাকে হোয়াটসঅ্যাপে লিখেছিলেন, পরিস্থিতি আবার আগের মতো হয়ে গেছে। এমনকি যাত্রাপথেও তার উদ্বেগজনিত সমস্যা হয়েছিল বলে জানান। সিবিআইয়ের উদ্ধৃত বার্তায় তিনি লিখেছেন, ‘মা, আমার জীবন নরক হয়ে গেছে।’ সেদিন তাকে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছেও নেয়া হয়। চার্জশিটে বলা হয়েছে, চিকিৎসক দেখতে পান যে গর্ভধারণ নিয়ে তিশা অস্বস্তিতে ছিলেন এবং উদ্বেগ ও মানসিক চাপে ভুগছেন। তাকে উদ্বেগ কমানোর ওষুধ দেয়া হয় এবং মানসিকভাবে শান্ত অবস্থায় গর্ভধারণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়।

৬ই মে সিবিআইয়ের দাবি, তিশা তার আগের চাকরিতে ফেরার প্রস্তাব গ্রহণ করেন। একই দিন তিনি গর্ভপাতের জন্য প্রথম ওষুধ গ্রহণ করেন। এর কয়েক ঘণ্টা পর, ৭ই মে ভোরে তিনি মাকে একের পর এক বার্তা পাঠিয়ে তাকে এসে নিয়ে যেতে বলেন। চার্জশিটে উদ্ধৃত একটি বার্তায় তিনি লিখেছেন, ‘মা, প্লিজ আমাকে কাল এখান থেকে নিয়ে যেও।’

এরপরের ঘটনাপ্রবাহকে বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছে সিবিআই। চার্জশিট অনুযায়ী, গিরিবালা চেয়েছিলেন প্রথমবার গর্ভপাতের ওষুধ নেয়ার পর গর্ভধারণ আবার ফিরিয়ে আনা যায় কি না, তা পরীক্ষা করা হোক। ৭ই মে তিশা শাশুড়ির সঙ্গে একটি হাসপাতালে যান। তবে চিকিৎসক জানান, প্রক্রিয়াটি আর উল্টোদিকে ঘোরানো সম্ভব নয়। পরে তাকে আরেক চিকিৎসক ডা. কাকোলি রায়ের কাছে পাঠানো হয়। সিবিআই বলেছে, ওই চিকিৎসক তিশাকে ‘মানসিকভাবে বিপর্যস্ত’, উদ্বিগ্ন এবং অস্বস্তিতে থাকা অবস্থায় দেখতে পান। তিশা নাকি চিকিৎসককে জানান, গর্ভপাতের সিদ্ধান্তে সমর্থ ও তার পরিবার অসন্তুষ্ট এবং তারা তাকে গর্ভধারণ চালিয়ে যেতে চাপ দিচ্ছে। চার্জশিটে আরও একটি বিস্ফোরক অভিযোগ রয়েছে। তিশা নাকি তার ননদকে বলেছিলেন, গর্ভপাতের কারণে গিরিবালা তাকে তিনবার ‘খুনি’ বলেছেন।