সবজিতে সিসা মরিচে নিষিদ্ধ রং

খাদ্যে বিষ

সবজিতে সিসা মরিচে নিষিদ্ধ রং

ফন্ট সাইজ:

শাকসবজিসহ মানুষের দৈনন্দিন খাবারে মেশানো হচ্ছে ক্ষতিকারক রাসায়নিক। জীবন রক্ষাকারী এসব খাবারই এখন অসুখের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনিরাপদ হয়ে উঠেছে মানুষের জীবন। এসব খাবার ধীরে ধীরে মানুষকে অকাল মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে খাদ্যে ভেজাল ও দূষণের এক ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে। চাল, ডাল থেকে শুরু করে শিশুখাদ্য ও জীবন রক্ষাকারী পানি- সবকিছুতেই মিলেছে ক্ষতিকারক রাসায়নিক, ভারী ধাতু এবং নিষিদ্ধ সব উপাদানের ছড়াছড়ি। রাজধানীর শাকসবজিতে মেশানো হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত সিসা থেকে শুরু করে মরিচের গুঁড়ায় নিষিদ্ধ রং, ডালডায় বিপজ্জনক মাত্রার ট্রান্স ফ্যাট, মুড়িতে ইউরিয়া এবং পানিতে মলজাতীয় জীবাণু।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তার খাবার টেবিল পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সরকারের কার্যকর নজরদারি ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। শস্য উৎপাদনের সময় কোন কীটনাশক কতোটুকু দেয়া যাবে, কোন কীটনাশক মানবজীবনের জন্য কম ক্ষতিকর এবং কোন সময়ে প্রয়োগ করতে হবেÑ এসব বিষয়ে নির্দেশনা বা গাইডলাইন সরকারকে নির্ধারণ করে দিতে হবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ও এলাকা থেকে সংগৃহীত শাকসবজির নমুনায় উদ্বেগজনক মাত্রায় ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। শাকসবজিতে ০.৩ পিপিএম সিসা থাকা স্বাভাবিক কিন্তু নমুনায় পাওয়া গেছে সর্বোচ্চ ২.৩৭ পিপিএম। এ ছাড়াও সবজির কিছু নমুনায় ই-কোলাই, ফিকাল কলিফর্ম এবং সালমোনেলা জীবাণুর উপস্থিতিও পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিসা ও ক্যাডমিয়াম কিডনি, লিভার ও স্নায়ুতন্ত্রের স্থায়ী ক্ষতি করে। সিসা শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে ব্যাহত করে। একইসঙ্গে ভারী ধাতু উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়ায়।

মরিচের গুঁড়ায় ভেজাল ও নিষিদ্ধ রং: প্রতিবেদনে দেখা যায়, নিত্যপ্রয়োজনীয় মসলা ও খাবারে নিষিদ্ধ রাসায়নিকের ব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। কক্সবাজার, মৌলভীবাজার ও বগুড়ার মরিচের গুঁড়ায় পাওয়া গেছে, ক্যান্সার সৃষ্টিকারী নিষিদ্ধ কৃত্রিম রং সুদান ডাই (ঝঁফধহ-ও) কক্সবাজারের একটি নমুনায় এর মাত্রা পাওয়া গেছে ১২৪২.৩২৪ পিপিএম। যা নিয়মিত গ্রহণে লিভার ও মূত্রথলির ক্যান্সার সৃষ্টি করে।

ডালডায় ট্রান্স ফ্যাট: কুমিল্লার একটি ডালডায় সর্বোচ্চ ৩০.৯৮% ট্রান্স ফ্যাট পাওয়া গেছে, যেখানে অনুমোদিত সীমা মাত্র ২%। এ ছাড়া, ভোলা (২৩.৯৩%) এবং পাবনায় (২০.৫৩%)। ট্রান্স ফ্যাট রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল বাড়িয়ে হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া, মাখনে সর্বোচ্চ ৮.৪৪% এবং মার্জারিনে সর্বোচ্চ ১০.৭% ট্রান্স ফ্যাট পাওয়া গেছে।
মুড়িতে ইউরিয়া: ঝালকাঠি থেকে সংগৃহীত মুড়িতে পাওয়া গেছে সর্বোচ্চ ৬৭৫৮.৭ মিলিগ্রাম ইউরিয়া, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। ফেনী, ঠাকুরগাঁও এবং সাতক্ষীরার মুড়িতেও উচ্চমাত্রায় ইউরিয়া মিলেছে। যা পাকস্থলীর প্রদাহ, আলসার এবং দীর্ঘমেয়াদে কিডনি বিকল করতে পারে।

সস ও আচারে রাসায়নিকের ছড়াছড়ি: বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন ব্রান্ডের সস ও আচারে প্রিজারভেটিভ হিসেবে ব্যবহৃত বেনজোয়িক অ্যাসিডের অতিরিক্ত উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সসের ক্ষেত্রে অনুমোদিত সীমা ৭৫০ পিপিএম হলেও রংপুরের একটি নমুনায় পাওয়া গেছে অবিশ্বাস্য ২৩২৭২ পিপিএম। কুড়িগ্রাম ও ভোলার আচারেও ১০০০ পিপিএম সীমার বিপরীতে ৩০০০ পিপিএমের বেশি বেনজোয়িক অ্যাসিড মিলেছে।

পানিতে মলের জীবাণু (ফেক্যাল কলিফর্ম) ও রান্না করা খাবারে জীবাণু: বাগেরহাট, দিনাজপুর ও খাগড়াছড়ির পানিতে মারাত্মক ক্ষতিকারক ফেক্যাল কলিফর্ম এবং টোটাল কলিফর্মের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। যা পানিতে মানুষের বা পশুর মলমূত্রের সরাসরি দূষণ নির্দেশ করে। দিনাজপুরের প্রতি ১০০ মিলিলিটার পানিতে ১২০ সিএফইউ ফেক্যাল কলিফর্ম শনাক্ত হয়েছে, খাগড়াছড়ির ১০০ মিলিলিটার পানিতে ৬০ সিএফইউয়ের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এ ছাড়া, বাগেরহাটে মিলেছে ৪৩ সিএফইউ। কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয় থেকে সংগৃহীত মোরগ পোলাও, চিংড়ি ও ভাতে ই-কোলাই (ঊ.পড়ষর) ও সালমোনেলার মতো রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত হয়েছে।

সয়াবিন ও সরিষার তেলে অ্যাসিড: পরীক্ষায় সরিষার তেলে উচ্চমাত্রার অ্যাসিড পাওয়া গেছে। যা তেলের গুণগত মানের অবনতি এবং সংরক্ষণ বা উৎপাদন প্রক্রিয়ার ত্রুটি বলা হচ্ছে। সঙ্গে সয়াবিন তেলের বিভিন্ন নমুনায় ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতি ধরা পড়েছে। এ ছাড়া, কয়েকটি নমুনায় অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি ট্রান্স ফ্যাট পাওয়া গেছে; যা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। সরিষার তেলে লক্ষ্মীপুর থেকে সংগৃহীত একটি নমুনায় ৫.৩ মাত্রার অ্যাসিড ভ্যালু পাওয়া গেছে। যেখানে অ্যাসিড ভ্যালু সর্বোচ্চ ৩.০ হওয়ার কথা ছিল। ভোজ্য তেলে ট্রান্স ফ্যাটের মাত্রা ২% হলেও নমুনায় সর্বোচ্চ ৬.৬২% পাওয়া গেছে।

গুড় ও মিষ্টি জাতীয় খাবার: রাজশাহী, গাজীপুর এবং নাটোরের খেজুর ও আখের গুড়ে নিষিদ্ধ সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট এবং সারফেস অ্যাক্টিভ এজেন্ট (সাবান জাতীয় উপাদান) পাওয়া গেছে। কক্সবাজার, হবিগঞ্জ এবং মৌলভীবাজারের জিলাপিতে ক্ষতিকর সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট শনাক্ত হয়েছে।

মধু, দুগ্ধজাতসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনে কারসাজির প্রমাণ: খুলনা থেকে সংগ্রহ করা মধুর নমুনায় অতিরিক্ত সুক্রোজ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া, বিভিন্ন জেলার নমুনায় অতিরিক্ত ফ্রুক্টোজ ও গ্লুকোজ শনাক্ত হয়েছে। রাজবাড়ী ও চট্টগ্রামের ঘি’র নমুনায় মিল্ক ফ্যাটের পরিমাণ কম বা একেবারেই অনুপস্থিত। অর্থাৎ এসব পণ্য প্রকৃত ঘি’র মান পূরণ করেনি। বরিশাল থেকে সংগ্রহ করা মিল্ক পাউডারের নমুনায় সিসা শনাক্ত হয়েছে। যা শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয়ের জন্যই অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পাশাপাশি বিভিন্ন ফলের পানীয়, সফট ড্রিংক ও কৃত্রিম ফ্লেভারযুক্ত পানীয়তে অতিরিক্ত বেনজোয়িক অ্যাসিড, টারট্রাজিন এবং ক্যাফেইন পাওয়া গেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বেনজীর আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, যে খাবার মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে সেই খাবারেই বিষ! আমাদের মতো খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বিশ্বের খুব কম দেশেই আছে। এই খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা আমরা যদি দূর না করি, তাহলে জনগণ ক্রমাগত ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, ক্যান্সার, পেপটিক আলসারসহ নানা রোগে আক্রান্ত হবে। তাই উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজারজাতকরণ ও ভোগ- প্রতিটি পর্যায়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সরকারের কার্যকর নজরদারি ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। কৃষিতে কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের নিরাপদ মাত্রা, ফল পাকাতে ব্যবহৃত হরমোনের অনুমোদন ও ব্যবহারবিধি নির্ধারণ করতে হবে।

কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন মানবজমিনকে বলেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দু’টি বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। প্রথমত, খাদ্য নিরাপত্তা-সংক্রান্ত আইন ও বিধিবিধানের কার্যকর প্রয়োগ এবং ভেজাল বা নিম্নমানের খাদ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, ভোক্তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে নিয়মিতভাবে খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষা করে ফলাফল জনসাধারণকে জানাতে হবে, যাতে ভোক্তারা সচেতনভাবে পণ্য নির্বাচন করতে পারেন। যে পণ্যটি আমার শরীরের জন্য ক্ষতিকর, সেটা তো আমি কিনবো না। তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত পেস্টিসাইড, কেমিক্যাল ও প্লাস্টিকের ব্যবহার খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। কৃষিতে পেস্টিসাইড ব্যবহারের পর নির্ধারিত সময় অপেক্ষা না করে দ্রুত ফসল বাজারজাত করলে খাদ্যে ক্ষতিকর অবশিষ্টাংশ থেকে যেতে পারে।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, ভেজাল রোধে আমরা প্রতিনিয়ত অভিযান পরিচালনা করছি। যেসকল স্থানে ভেজাল বা মানহীন পণ্য পাচ্ছি সেগুলোকে আমরা জরিমানা করছি, কোথাও কোথাও কারখানা বন্ধ করে দিচ্ছি। তবে আমাদের নাগরিকদের সচেতন হতে হবে, কোন খাবার দেহের জন্য উপকারী আর কোনটা ক্ষতিকরÑ এসব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। ক্রেতা যদি না কিনে তাহলে ব্যবসায়ীরা ওই পণ্য উৎপাদন করবে না। তিনি আরও বলেন, আমাদের ল্যাব ও লোকবল সংকট রয়েছে। পর্যাপ্ত পরিমাণে ল্যাব ও লোকবল পেলে আমরা অধিক টেস্ট ও অভিযান চালাতে পারবো।