ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে পুনর্গঠন করা হচ্ছে

সরকারের ৬ মাস পূর্তিতে মতবিনিময়

ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে পুনর্গঠন করা হচ্ছে

ফন্ট সাইজ:

সরকারের ১৮০ দিনের বড় সাফল্যের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেছেন, ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা এবং নির্বাচনী অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়ন হয়েছে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বর্তমান বিএনপি সরকার অন্তহীন পথ চলছে বলেও দাবি করেন তিনি। মাহদী আমিন বলেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গত ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে জনগণের ক্ষমতা সুনিশ্চিত হয়েছে। জনগণের সত্যিকারের প্রতিনিধিত্বমূলক এই সরকার গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি শপথ গ্রহণ করে। সরকারের এই ১৮০ দিনের পথচলা জনগণের প্রতি জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতারই প্রত্যক্ষ প্রতিফলন।

গতকাল রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং আয়োজিত জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ‘১৮০ দিন পূর্তি’ উপলক্ষে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
মাহদী আমিন বলেন, গত ছয় মাসের অজস্র জনসম্পৃক্ত কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী দেশ জুড়ে যেখানেই গিয়েছেন ঠিক জনগণের ঢল নেমে এসেছে। জনগণের আস্থা এবং বিশ্বাসকে ধারণ করে বর্তমানে আমাদের যে সরকার সেটি বারবার জনগণের প্রতি দেশের মানুষের প্রতি দায়িত্ব এবং দায়বদ্ধতা নিয়ে এগিয়ে চলেছে। সরকারের এই ছয় মাসের সবচাইতে যেটা ডিফারেন্ট একটা বিষয়, সেটা হচ্ছেÑ নির্বাচন ইশতেহারকে ধারণ করে সেখানকার প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য অবিরত কাজ করে চলেছে। আমরা দেখেছি, এই ছয় মাসে সুদৃঢ় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ কীভাবে সরকারের প্রতিটি কার্যক্রমে অনুমোদিত হয়েছে।

শিগগিরই জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করা হবে: জনপ্রশাসনকে ঢেলে সাজাতে শিগগিরই জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যে প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন আমরা করতে চাই, সেই সংস্কার কমিশনকে যারা সাপোর্ট করবে- ওইখানে যদি ভূত-টুত থাকে- ওইটা ক্লিয়ার না করে করলে তো ভালো কাজ হবে না। একটু সময় লাগতেছে, শিগগিরই হবে।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গণমাধ্যমের যারাই কথা বলেছেন, তারা সবাই আমাদের সরকারকে এবং প্রধানমন্ত্রীকে প্রশংসা করেছেন যে, এই প্রথম এ পর্যন্ত কোনো গণমাধ্যমে কোনো ধরনের কোনো সরকারি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রভাব তারা অনুভব করেন নাই। সেই কারণে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে একাধিকবার প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। এই ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক করার জন্য গণমাধ্যম কমিশন গঠন করার জন্য তাদের আগ্রহ এবং আমাদের প্রতিশ্রুতির মধ্যে কোনো অমিল নাই। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমরা অংশীদারদের সঙ্গে বৈঠক করার উদ্যোগ নিয়েছি এবং অংশীদারদের সঙ্গে বৈঠকের কাজও আমরা প্রায় শেষ করে নিয়ে এসেছি। এখন আমরা ওয়ার্কিং গ্রুপ করবো। তারা একটা ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যানের ড্রাফট তৈরি করবেন। তারপর আমরা এটা মন্ত্রিসভার কাছে উপস্থাপন করবো।

মব কালচার সহ্য করা হবে না: দেশে মব কালচার সহ্য করা হবে না বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, মব কালচার যখনই হোক, মব কালচার অনভিপ্রেত। আশা করি, মব কালচার হবে না, কখনই হওয়া উচিত নয়। আপনি যেটা বলেছেন, রিসেন্টলি মব কালচার হয়েছেÑ এমন কোনো স্পষ্ট উদাহরণ আমার কাছে নেই। আমি বলছি যে, মব কালচার সেইভাবে যেটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ দিকে হয়েছিল, সেই ধরনের মব কালচার নেই। তবে আমরা আপনাদের নিশ্চিত করতে পারি, এই ধরনের কোনো মব কালচার টলারেট করা হবে না। দেশ চলবে দেশের আইন অনুযায়ী এবং সেটাকে আমরা ইনফোরস করবো।

এই পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, আমি এখানে যুক্ত করতে চাই, সেটা হচ্ছে মব কালচারের মাত্রাটা এখন অনেক কমে গেছে। এটা অনেকটা পলিটিক্যাল সাপোর্ট থেকে এই মব কালচার হয়েছে। একটা প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক প্রভাব থাকে। আমি বলি যে, আইনের শাসন যত বাড়তে থাকবে তত এই মব কালচার কমে যাবে। যে আইনের শাসনের প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী, সেখানে দেখুন কোনো বিরোধী মতের কারণে বা বিরোধী রাজনৈতিক নেতা আজকে হয়রানির মুখে পড়ছেন না। সুতরাং এই আইনের শাসনের যে আবহাওয়াটা যতক্ষণ পর্যন্ত বিরাজমান থাকবে মব কালচার তত কমে যাবে।

সভায় মাহদী আমিন বলেন, গত ছয় মাসে বাক-স্বাধীনতা, আইন অনুশাসন এবং মানবাধিকারের ক্ষেত্রে আমরা সর্বোচ্চ মানবিক স্থাপন দেখেছি, যেখানে একটি বারের জন্য কখনো কোনো রাজনৈতিক নিপীড়ন হয়নি। যেখানে আমরা দেখেছি, সর্বোচ্চ বাক-স্বাধীনতা, অনেক সময় সেটা সীমা লঙ্ঘন করেছে। আমরা দেখেছি কীভাবে উস্কানি দেয়া হয়েছে, অশোভন আচরণ করা হয়েছে। তারপরও সরকারের সর্বোচ্চ ধৈর্য এবং সহনশীলতার মাধ্যমে ঠিক যেভাবে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, সেটিকে ধারণ করে এগিয়ে চলেছে জনগণের সরকার।
গত ছয় মাসে আমরা দেখেছি অত্যন্ত প্রাণবন্ত এবং স্বতঃস্ফূর্ত জাতীয় সংসদ, যেখানে সংসদ সদস্যরা একে অপরের আলোচনা করেছেন সমালোচনা করেছেন, যৌক্তিকভাবে বিভিন্ন বিষয় উপস্থাপন করেছেন। দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন যে সরকারের সংসদ গঠনের পর, সংসদের প্রথম অধিবেশনে শতাধিক অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর করা হয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সে আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে। সন্ত্রাসবিরোধী সংশোধিত যে অধ্যাদেশ, সেটিকে সংসদে আইনে রূপান্তরের মাধ্যমে সন্ত্রাসী একটি রাজনৈতিক সংগঠন যারা ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিল, তাদেরকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী বলেন, বর্তমান সরকার গত ছয় মাসে কী কাজ করেছে, আমি বলি সেটি হচ্ছে- এই রাষ্ট্র সমাজে মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা, মানুষের সম্মান প্রতিষ্ঠা করা, এগুলো আমরা দেখিনি আগে ছিল না। আপনারা দেখেছেন, মিরপুরে যখন শিশু রামিসা হত্যা হলো, সেই শিশু রামিসার ঘরে প্রধানমন্ত্রী নিজে গিয়েছেন। এর মানে হচ্ছে মজলুমের ঘরে যখন সরকার প্রধান যান তখন বুঝতে হবে যে, আসলে এমন বাংলাদেশ আমরা প্রত্যাশা করিÑ যেখানে জনগণের কাছে রাষ্ট্র সরকার দায়বদ্ধ।

সরকারের ১৮০ দিন গণমুখী ও বহুমাত্রিক ১০ কর্মযজ্ঞ: সরকারের ১৮০ দিনের কর্মযজ্ঞ তুলে ধরেন মাহদী আমিন। সেগুলো হচ্ছেÑ অভূতপূর্ব জনসমর্থন, সুদৃঢ় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাফল্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন, আর্থিক খাতে সংস্কার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, অবকাঠামো, পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদাপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি এবং প্রধানমন্ত্রীর স্বতন্ত্র ভিন্নমাত্রিক নেতৃত্ব।
সরকারের ১৮০ দিনের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে যে বাংলাদেশকে আমরা নতুন করে পুনর্গঠন করছি, সেখানে মাত্র ছয় মাসে সব সমস্যার শতভাগ সমাধান করে ফেলা হয়তো কিছুটা দুরূহ, তবে একটি বিষয় আজ নিশ্চিতভাবে বলা যায়, প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এই নির্বাচিত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সরকারের রয়েছে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা, সর্বোচ্চ দায়বদ্ধতা ও দায়িত্বশীলতা। আমরা সবাই মিলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সেই গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর, মানবিক, নিরাপদ, মেধাভিত্তিক ও জনকল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ে তুলবো। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত এই সরকারের ক্ষমতার একমাত্র উৎস জনগণ, অনুপ্রেরণার উৎস জনগণ এবং এই সরকার প্রকৃত অর্থেই জনগণের সরকার।

প্রধানমন্ত্রীর স্বতন্ত্র নেতৃত্বের কথা উল্লেখ করে মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতিমধ্যে তথাকথিত ভিআইপি সংস্কৃতি সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়ে সাধারণ মানুষের মতো করে সাধারণ মানুষের কাতারে নেমে এসেছেন। তিনি বারবার তৃণমূলের মানুষের কাছে ছুটে যাচ্ছেন, কোদাল হাতে নিয়ে খাল খনন কর্মসূচিতে নেমে পড়ছেন, স্কুলের কোমলমতি শিশুদের পরম স্নেহে কোলে তুলে নিচ্ছেন। আমরা প্রত্যক্ষ করেছি তার অত্যন্ত সাদাসিধে ও মিতব্যয়ী জীবনাচার। সামগ্রিকভাবে দীর্ঘদিন পর আজ আমরা এমন একটি সরকার পেয়েছি, যাকে দেশের প্রতিটি মানুষ গভীর আবেগ, অনুভূতি ও ভালোবাসা দিয়ে হৃদয়ে ধারণ করে।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলীর সঞ্চালনায় সভায় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান, স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু বিষয়ক বিশেষ সহকারী সাইমুম পারভেজ, কার্যালয়ের মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক এসএম আব্দুল আউয়াল, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়াও সভায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক বিশেষ সহকারী রাশেদ খান, তথ্য ও সম্প্রচার সচিব মাহবুবা ফারজানা, প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমেদ, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলম, সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাছির জামাল, প্রধানমন্ত্রীর স্ক্রিপট রাইটার মাহফুজুর রহমান, উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি, মো. সুজাউদ্দৌলা, শাহাদাৎ স্বাধীন, সহকারী প্রেস সচিব কেএম নাজমুল হক, আবদুল্লাহ আল মাহমুদ শাহরিয়ার ও আশরোফা ইমদাদ উপস্থিত ছিলেন।