বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও পরিবহণে জ্বালানির চাহিদা বাড়ছে। ঘাটতি মেটাতে বাড়ছে এলএনজি, জ্বালানি তেল ও কয়লা আমদানি। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেই বাড়ছে সরকারের ব্যয়, ভর্তুকি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ। এমন বাস্তবতায় আগামী ২৫ বছরের জ্বালানি নিরাপত্তার হিসাব শুধু আমদানির ওপর রেখে করলে বড় ঝুঁকিতে পড়বে বাংলাদেশ। তাই স্থলভাগের গ্যাসক্ষেত্রের পাশাপাশি এখন বড় করে তাকাতে হচ্ছে বঙ্গোপসাগরের দিকে। সাগরের তলদেশে তেল-গ্যাসের সম্ভাব্য মজুতের পাশাপাশি সমুদ্রভিত্তিক বায়ুশক্তিসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানিও হতে পারে ভবিষ্যতের বড় সম্পদ।
এরই মধ্যে বঙ্গোপসাগরের ২৬টি ব্লকে আন্তর্জাতিক কোম্পানির জন্য তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দরজা খুলেছে সরকার। এর মধ্যে ১১টি shallow-water এবং ১৫টি deep-water block। নতুন Offshore Model Production Sharing Contract (PSC) 2026-এর আওতায় এই দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। বিনিয়োগ আকর্ষণে চুক্তির শর্তও আগের তুলনায় সহজ করা হয়েছে। তবে বিডিং রাউন্ড আয়োজনই শেষ কথা নয়। সাফল্য নির্ভর করবে কত দ্রুত অনুসন্ধান শুরু হয়, কতগুলো কূপ খনন হয়, কী পরিমাণ বিনিয়োগ আসে এবং আবিষ্কৃত সম্পদ কত দ্রুত জাতীয় অর্থনীতিতে যুক্ত করা যায় তার ওপর।
বাংলাদেশের জ্বালানি অর্থনীতির অন্যতম দুর্বলতা আমদানিনির্ভরতা। গ্যাসের ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে এর প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় ও সরকারের ভর্তুকিতে। চলতি বছরের মার্চে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে এলএনজির দাম বেড়ে যায়। একটি কার্গোতে যেখানে আগে প্রায় ৪৩৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিল, পরে একই সরবরাহকারীর কাছ থেকে একটি কার্গোর জন্য ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৯০৮ কোটি টাকা।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জ্বালানি নিরাপত্তাকে বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছেন। তারমতে, উচ্চ দামে দীর্ঘদিন আমদানিনির্ভর জ্বালানি সরবরাহ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই দেশীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও দেশে ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বাপেক্সের মাধ্যমে ভূতাত্ত্বিক ও সিসমিক জরিপ এবং নতুন কূপ খননের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
জানা গেছে, গত ২৪শে মে আনুষ্ঠানিকভাবে Offshore Bidding Round 2026 চালু করা হয়। ২৬টি ব্লকের মধ্যে ১১টি অগভীর ও ১৫টি গভীর সমুদ্রের। বিনিয়োগ আকর্ষণে নতুন পিএসসিতে সিগনেচার বোনাস ও রয়্যালটি না রাখা, আন্তর্জাতিক বাজারের ব্রেন্টের সঙ্গে গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ এবং যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক সুবিধার মতো বিষয় রাখা হয়েছে। আগের ২০২৪ সালের অফশোর বিডিং রাউন্ডে আন্তর্জাতিক কোম্পানির সাড়া না পাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকেই নতুন কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এবার সরকারের লক্ষ্য হলো বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি কমিয়ে অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিকে আনা।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এ বিষয়ে বলেছেন, দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান না করে আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ায় বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সমুদ্রের তেল-গ্যাস উত্তোলন করা গেলে তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, স্থলভাগের পাশাপাশি সমুদ্রেও অনুসন্ধান বাড়িয়ে দেশের নিজস্ব জ্বালানি সম্পদের ব্যবহার বাড়াতে হবে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের (সিএসইআর) চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম সমুদ্রকে বৃহত্তর Blue Economy-র অংশ হিসেবে দেখার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, সমুদ্র শুধু মাছ, বন্দর বা পর্যটনের ক্ষেত্র নয়, মেরিন জ্বালানি, নবায়নযোগ্য শক্তি, নৌপরিবহণ, পর্যটন ও প্রযুক্তি মিলিয়ে একটি বড় অর্থনৈতিক অঞ্চল।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়েও তিনি সৌর ও বায়ুশক্তির সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে এ ক্ষেত্রে নীতির স্থিরতা, অর্থায়ন, অবকাঠামো এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। সাকিফ শামীম বলেন, গ্যাস মিললে বদলাবে অর্থনীতির হিসাব। বঙ্গোপসাগরে বড় কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হলে বিদ্যুৎকেন্দ্রে তো সমৃদ্ধ হবেই, পাশাপাশি কমবে এলএনজি আমদানির চাপ। শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়বে। সার, বিদ্যুৎ, সিরামিক, টেক্সটাইল, স্টিলসহ গ্যাসনির্ভর শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। সবচেয়ে বড় বিষয়, ডলারে জ্বালানি আমদানি কমলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমবে। একটি বড় গ্যাসক্ষেত্র তাই একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি বলেন, আগামী ২৫ বছরের পরিকল্পনায় বঙ্গোপসাগরকে শুধু গ্যাসের উৎস হিসেবে দেখলে চলবে না। সমুদ্রভিত্তিক বায়ুশক্তির সম্ভাবনাও মূল্যায়ন করতে হবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)-এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম দেশীয় অনুসন্ধান বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, নতুন কূপ খনন ও গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন করা গেলে আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব। দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোই জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান পথ। সব মিলিয়ে আগামী দিনের জ্বালানি কৌশলে তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে-দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, আমদানির ঝুঁকি কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তর। বঙ্গোপসাগরের ২৬টি ব্লকের অনুসন্ধান সেই যাত্রার বড় পরীক্ষা।
আগামী ২৫ বছরের জ্বালানি অর্থনীতি:
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের (সিএসইআর) চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম আগামী ২৫ বছরের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে সম্প্রতি সিএসইআরের পক্ষ থেকে তার বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি আগামী ২৫ বছর কোন পথে এগোবে, তার একটি বড় অংশ নির্ধারিত হবে আমরা জ্বালানি নিরাপত্তাকে কীভাবে দেখি তার ওপর। এখন পর্যন্ত আমাদের জ্বালানি আলোচনার কেন্দ্রে ছিল স্থলভাগের গ্যাসক্ষেত্র, আমদানি করা এলএনজি, কয়লা, জ্বালানি তেল এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা। কিন্তু বাংলাদেশের জ্বালানি অর্থনীতির মানচিত্রটি আমাদের আরও বড় করে দেখা উচিত। সেই মানচিত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নতুন অধ্যায় হতে পারে আমাদের বঙ্গোপসাগর।
বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা শুধু মাছ, বন্দর, পর্যটন বা সামুদ্রিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রই নয়, বরং এটি সম্ভাব্য প্রাকৃতিক গ্যাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সামুদ্রিক অবকাঠামো, প্রযুক্তি, গবেষণা এবং বিস্তৃত ব্লু ইকোনমির একটি কৌশলগত সম্পদ। আগামী ২৫ বছরে বাংলাদেশ যদি সমুদ্রকে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে পরিকল্পনার আওতায় আনতে পারে, তাহলে সেটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার গতিপথ বদলে দিতে পারে। আজকের বাস্তবতা অবশ্য খুব আশাব্যঞ্জক নয়। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন দীর্ঘদিন ধরে চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। গ্যাসের ঘাটতি পূরণ করতে বাংলাদেশকে আমদানি করা এলএনজির ওপর ক্রমেই বেশি নির্ভরশীল হতে হচ্ছে। ২০২৫ সালে ১০৯টি এলএনজি কার্গো আমদানিতে প্রায় ৩.৮৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে, যা ২০২৪ সালের প্রায় ৩.০২ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমদানিনির্ভর জ্বালানির সঙ্গে অর্থনৈতিক ব্যয়ের পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিও যুক্ত। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সংঘাত ও সামুদ্রিক পরিবহন ঝুঁকি দেখিয়ে দিয়েছে, দূরবর্তী বাজার থেকে জ্বালানি আমদানি করে একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা কঠিন। ২০২৬ সালে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার ঘটনাও সেই ঝুঁকিকে সামনে নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের অর্থনীতি যত শিল্পায়িত হবে, বিদ্যুতের চাহিদাও তত বাড়বে। বিদ্যুৎ বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩৩,০৯২ মেগাওয়াট এবং সর্বোচ্চ উৎপাদন ১৭,২০১ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। সরকারের বিদ্যমান পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০,০০০ মেগাওয়াট এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০,০০০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার লক্ষ্য রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা আগামী ২৫ বছরের জ্বালানি চাহিদা মেটাব কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর আরও এলএনজি আমদানি, আরও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বা আরও জ্বালানি আমদানির মধ্যে খুঁজলে চলবে না। আমাদের প্রয়োজন দেশীয় সম্পদের অনুসন্ধান, জ্বালানি দক্ষতা, নবায়নযোগ্য শক্তি, সঞ্চালন অবকাঠামো, প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতার সমন্বিত কৌশল। আর এই কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হওয়া উচিত বঙ্গোপসাগরের সম্পদ অনুসন্ধান।
বাংলাদেশের সামুদ্রিক সীমানা নির্ধারিত হয়েছে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এর ফলে দেশের বিশাল সমুদ্রাঞ্চল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য আরও স্পষ্টভাবে উন্মুক্ত হয়েছে। কিন্তু একটি মৌলিক সমস্যা রয়ে গেছে: সমুদ্রসীমা আমরা পেয়েছি বটে কিন্তু তার সম্পদের পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন এখনো করতে পারিনি। পেট্রোবাংলার তথ্যেও দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সামুদ্রিক এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। দেশের সমুদ্রসীমা গ্যাস ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হলেও পর্যাপ্ত অনুসন্ধান না হওয়ায় এই সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত ধারণা তৈরি হয়নি। এখানেই নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ Offshore Bidding Round 2026 চালু করেছে এবং বঙ্গোপসাগরের ২৬টি ব্লকে আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে, যার মধ্যে ১১টি shallow-water এবং ১৫টি deep-water block। নতুন Offshore Model Production Sharing Contract বা PSC 2026-এর মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য চুক্তির কাঠামোও সংশোধন করা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে bidding round আয়োজন করাই শেষ কথা নয়। আসল সাফল্য নির্ভর করবে কত দ্রুত অনুসন্ধান শুরু হয়, কতটা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, কতটি কূপ খনন করা হয় এবং আবিষ্কৃত সম্পদ কীভাবে দ্রুত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা যায় তার ওপর।
ধরা যাক, আগামী কয়েক বছরে বঙ্গোপসাগরে উল্লেখযোগ্য গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেল। এর প্রভাব শুধুমাত্র বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দেশীয় গ্যাস বাড়লে এলএনজি আমদানির ওপর চাপ কমবে। শিল্পকারখানার জ্বালানি সরবরাহ আরও স্থিতিশীল হতে পারে। সার, বিদ্যুৎ, সিরামিক, টেক্সটাইল, স্টিলসহ বিভিন্ন শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডলারে পরিশোধ করা আমদানি বিল কমলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ কমবে। অর্থাৎ, একটি নতুন গ্যাসক্ষেত্র জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এখানে একটি বিষয় মনেরাখা জরুরি। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি কৌশল যেন আবার পুরোপুরি জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর হয়ে না পড়ে। কারণ কোনো প্রাকৃতিক সম্পদই অসীম নয় এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য বঙ্গোপসাগর একটি transition resource. অর্থাৎ আগামী দুই থেকে তিন দশকের অর্থনৈতিক রূপান্তরকে সহায়তা করার জন্য দেশীয় গ্যাসের সর্বোচ্চ দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ সঞ্চয়, জ্বালানি দক্ষতা ও পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সমুদ্রকে এখন ‘offshore gas frontier’ হিসেবে দেখার পাশাপাশি ‘energy frontier’ হিসেবেও দেখতে হবে। বঙ্গোপসাগর ভবিষ্যতে সৌর ও বায়ুশক্তির মতো নবায়নযোগ্য উৎসের জন্যেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সমুদ্রভিত্তিক বায়ুশক্তির প্রযুক্তি বিশ্বের অনেক দেশে দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশসহ উদীয়মান অর্থনীতিতে offshore wind-এর প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। একই সঙ্গে সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য খাতও জ্বালানি অর্থনীতির অংশ হতে পারে। অফশোর অবকাঠামো, সমুদ্রবন্দর, জাহাজ চলাচল, সাবমেরিন কেবল, সামুদ্রিক গবেষণা, ডেটা ও প্রযুক্তি, সামুদ্রিক প্রকৌশল, মৎস্য এবং সামুদ্রিক পর্যটন একটি সমন্বিত ocean economy গড়ে তুলতে পারে। এ কারণে ‘ব্লু ইকোনমি’ এবং ‘জ্বালানি অর্থনীতি’কে আলাদা করে দেখার সময় শেষ। বাংলাদেশের জন্য আগামী দশকগুলোতে এ দুটি পরস্পরসম্পর্কিত অর্থনৈতিক বাস্তবতা হতে পারে। আমাদের এখন একটি দীর্ঘমেয়াদি National Offshore Energy Strategy প্রয়োজন। এর প্রথম ধাপ হওয়া উচিত সমুদ্রের নিচে কী আছে, তার দ্রুত ও নির্ভুল মানচিত্র তৈরি করা। আধুনিক 2D এবং 3D seismic survey, geological modelling, data interpretation এবং exploratory drilling-এ বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক কিন্তু জাতীয় স্বার্থসুরক্ষাকারী PSC কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। ২০২৬ সালের নতুন PSC ইতোমধ্যে এই দিকের একটি পদক্ষেপ। কিন্তু চুক্তি শুধু বিনিয়োগ আকর্ষণকারী হলেই হবে না; এতে সরকার, জনগণ ও বিনিয়োগকারীর মধ্যে ঝুঁকি ও লাভের ভারসাম্য থাকতে হবে। তৃতীয়ত, অনুসন্ধান থেকে উৎপাদনের সময় কমাতে হবে।
কোনো সম্ভাব্য গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের পর বছরের পর বছর সিদ্ধান্তহীনতা, অনুমোদন জটিলতা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় আটকে থাকলে বিনিয়োগের অর্থনৈতিক মূল্য কমে যায়। চতুর্থত, offshore exploration-এর পাশাপাশি একটি শক্তিশালী দেশীয় সার্ভিস ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলতে হবে। drilling, subsea engineering, marine logistics, geological services, environmental monitoring, data analytics এবং specialised maritime services-এ বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানকে ধীরে ধীরে সক্ষম করে তুলতে হবে। বিদেশি কোম্পানি আসবে, কিন্তু প্রযুক্তি ও দক্ষতার বড় অংশ যদি দেশের বাইরে থেকে আনতে হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক multiplier effect সীমিত থাকবে। পঞ্চমত, সমুদ্রভিত্তিক নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য এখন থেকেই pilot project শুরু করা প্রয়োজন। কোনো প্রযুক্তি পরিপক্ব হওয়ার পর অপেক্ষা না করে এখন থেকেই গবেষণা, feasibility study এবং grid integration পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। ষষ্ঠত, জ্বালানি দক্ষতাকে জাতীয় জ্বালানি সম্পদের সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি দক্ষতা ও সংরক্ষণকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যমাত্রাও রয়েছে।
সপ্তমত, জ্বালানি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ ও পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের পরিসর বাড়াতে হবে। আগামী ২৫ বছরের জ্বালানি চাহিদা, offshore exploration, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন অবকাঠামো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে, তা রাষ্ট্রীয় অর্থায়নের ওপর নির্ভর করে পূরণ করা কঠিন। তাই জাতীয় স্বার্থ ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে দেশি-বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।
এর লক্ষ্য অবশ্য জ্বালানি খাতকে বেসরকারিকরণ করা নয়; বরং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী ও নিয়ন্ত্রক ভূমিকা বজায় রেখে বেসরকারি খাতকে উন্নয়ন ও বিনিয়োগের অংশীদার করা। একটি দক্ষ regulatory framework, competitive bidding, transparent pricing এবং দীর্ঘমেয়াদি contractual certainty নিশ্চিত করা গেলে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এর দীর্ঘমেয়াদি ফল আরও বিস্তৃত হতে পারে। পর্যাপ্ত ও প্রতিযোগিতামূলক দামে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে দেশের শিল্পখাতের উৎপাদন ব্যয় কমবে, রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে এবং ভবিষ্যতে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য ও energy trade সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে। অর্থাৎ লক্ষ্য হওয়া উচিত জ্বালানি খাতকে এমন একটি উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক খাতে রূপান্তর করা, যা অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে। সমুদ্রে গ্যাস পাওয়া গেলে বাংলাদেশ লাভবান হবে, এই ধারণা স্বাভাবিক। কিন্তু নতুন প্রাকৃতিক সম্পদ কখনো কখনো আশীর্বাদের পাশাপাশি ঝুঁকিও তৈরি করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে, প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনীতিকে বৈচিত্র্যহীন করতে পারে, দুর্নীতি বাড়াতে পারে এবং সম্পদের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে ব্যর্থ হতে পারে। বাংলাদেশকে তাই শুরু থেকেই একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক offshore revenue management framework তৈরি করতে হবে। সমুদ্র থেকে আয় হলে তার একটি অংশ জ্বালানি অবকাঠামোতে, একটি অংশ মানবসম্পদ ও প্রযুক্তি উন্নয়নে এবং একটি অংশ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য sovereign বা national resource fund-এ রাখা যেতে পারে। এতে গ্যাসের মতো সীমিত সম্পদকে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় সম্পদে রূপান্তরের সুযোগ তৈরি হবে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত গ্যাস বিক্রির পাশাপাশি গ্যাসের অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করা।
আজ থেকে ২৫ বছর পর, অর্থাৎ ২০৫১ সালের বাংলাদেশকে কল্পনা করলে সেখানে হয়তো দেশীয় offshore gas থাকবে, কিন্তু সেটি একমাত্র ভরসা হবে না। এর পাশাপাশি সৌর ও বায়ুশক্তি থাকবে, বিদ্যুৎ সঞ্চয়ের প্রযুক্তি থাকবে, উন্নত গ্রিড থাকবে, শিল্পে energy efficiency বাড়বে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা আরও গভীর হবে। সবচেয়ে বড় কথা, বঙ্গোপসাগর তখন হয়ে উঠতে পারে জাতীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনশীল অঞ্চল। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হবে না। সমুদ্রের সম্পদ আমাদের সামনে সম্ভাবনা তৈরি করে, নিশ্চয়তা নয়। সম্ভাবনাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে প্রয়োজন তথ্য, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও নীতিগত ধারাবাহিকতা। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ২০২৬ সালের Offshore Bidding Round-এর মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ দরজা খুলেছে। এখন প্রয়োজন সেই দরজা দিয়ে দ্রুত, পরিকল্পিত ও বিচক্ষণভাবে এগিয়ে যাওয়া। (Emergency Management and Relief Division)
সমুদ্রের নিচে সম্পদ আবিষ্কার করাই লক্ষ্য নয়, সেই সম্পদকে কীভাবে বাংলাদেশের শিল্প, রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের শক্তিতে পরিণত করা যায়, সেটিই হবে আগামী ২৫ বছরের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। তাই, আগামী ২৫ বছরের জ্বালানি অর্থনীতির মূল প্রশ্ন হলো, আমরা আমাদের সমুদ্রকে কতটা জ্ঞান, জ্বালানি, শিল্প, বিনিয়োগ ও জাতীয় সম্পদে রূপান্তর করতে পারব? বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার একটি বড় অধ্যায় হয়তো মাটির নিচে নয়, সমুদ্রের নিচেই লেখা আছে।
