নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারদর বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য সরকারি ওএমএস (খোলা বাজারে বিক্রি) কর্মসূচি এখন অনেকটা ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে। তবে চাহিদার তুলনায় বিক্রয়কেন্দ্র ও পণ্য বরাদ্দ কম থাকায় শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভায় প্রতিদিনই বিপুলসংখ্যক মানুষ ওএমএস’র চাল ও আটা কিনতে এসে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন। ভোর থেকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকের ভাগ্যে জুটছে না সরকারি দামের এসব পণ্য। শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভায় ওএমএস’র জন্য ছয়জন ডিলার নিয়োগ থাকলেও বর্তমানে মাত্র একজন ডিলারের মাধ্যমে চাল ও আটা বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে পৌরসভার নয়টি ওয়ার্ডের বিপুলসংখ্যক নিম্ন্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষের চাহিদা একটি মাত্র বিক্রয়কেন্দ্র দিয়ে পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এর সঙ্গে আশপাশের ইউনিয়ন থেকেও মানুষ পণ্য কিনতে আসায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
বর্তমান সময়ে বাজারে চাল, আটা, ডাল, তেলসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার তুলনায় বেশি হওয়ায় কম দামে সরকারি পণ্য পাওয়ার আশায় ওএমএস কেন্দ্রে মানুষের উপস্থিতি দিন দিন বাড়ছে। ভোর থেকেই দীর্ঘ লাইন সরজমিন দেখা যায়, পৌরসভার হাসপাতাল সড়কের জহুর আলী মার্কেটের ভেতরে একটি ওএমএস বিক্রয়কেন্দ্রে চাল ও আটা বিক্রি করা হচ্ছে। সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন ভোর থেকেই নারী-পুরুষ সেখানে এসে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লাইনের দৈর্ঘ্যও বাড়তে থাকে। স্থানীয়দের ভাষ্য, দুপুর ২টার আগেই প্রায় ৩০০ ভোক্তার মধ্যে চাল ও আটা বিক্রি শেষ হয়ে যায়। ফলে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা শেষের দিকের মানুষগুলো পণ্য না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যান।
প্রতিদিন একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় ভোগান্তি যেন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ডিলার সংশ্লিষ্টরা জানান, কেন্দ্র খোলার পর পুরুষের তুলনায় বোরকা পরা নারীর উপস্থিতি প্রায় তিন গুণ বেশি দেখা যায়। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পণ্য না পাওয়ায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা যায়। চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ বাড়ানো এবং আরও কয়েকটি বিক্রয়কেন্দ্র চালু করা গেলে পরিস্থিতির অনেকটা উন্নতি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বন্যাকবলিত এলাকায়ও চাহিদা বেশিএদিকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য শায়েস্তাগঞ্জ ইউনিয়নের কলিমনগর এলাকায় পৌরসভার একজন ওএমএস ডিলারের মাধ্যমে পৃথকভাবে পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। সেখানে একজন ভোক্তাকে ৫ কেজি আটা এবং দু’জন ভোক্তাকে ৫ কেজি করে চাল দেয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে কলিমনগর এলাকাতেও বরাদ্দের তুলনায় নিম্ন্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। আরও তিনটি কেন্দ্র চালুর দাবিস্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভায় আরও অন্তত তিনটি ওএমএস বিক্রয়কেন্দ্র চালু করা হলে মানুষের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে।
তারা পুরান বাজার, থানা রোড এবং দাউদনগর বাজারের মনিকা সিনেমা হলের পাশে পৃথক ওএমএস কেন্দ্র চালুর দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় কেন্দ্রগুলো ছড়িয়ে দেয়া হলে একটি কেন্দ্রে অতিরিক্ত মানুষের চাপ থাকবে না। শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভায় একটি ওএমএস কেন্দ্র এবং শায়েস্তাগঞ্জ ইউনিয়নের কলিমনগর এলাকায় আরও একটি বিক্রয়কেন্দ্র চালু রয়েছে। চাল ও আটার বরাদ্দ খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
পৌরসভায় নতুন কেন্দ্র চালু ও বরাদ্দ বাড়ানোর বিষয়টি উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের এখতিয়ারভুক্ত নয়। এ বিষয়ে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ওএমএস কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হলো সাধারণ মানুষের কাছে তুলনামূলক কম দামে খাদ্যপণ্য পৌঁছে দেয়া। কিন্তু পর্যাপ্ত বিক্রয়কেন্দ্র ও প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না থাকলে প্রকৃত উপকারভোগীদের বড় একটি অংশ এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। পৌরসভার পশ্চিম লেঞ্জাপাড়া গ্রামের দিনমজুর মো. লাল মিয়া বলেন, ভোরে এসে লাইনে দাঁড়াই। অনেক সময় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করার পরও চাল-আটা শেষ হয়ে যায়। তখন খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়।
পৌরসভায় আরও তিনটি ওএমএস বিক্রয়কেন্দ্র চালু করা হলে মানুষের ভোগান্তি অনেক কমবে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, শুধু কেন্দ্র বাড়ালেই হবে না, প্রতিটি কেন্দ্রে পর্যাপ্ত পরিমাণ চাল ও আটার বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। যাতে ভোক্তারা দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে পণ্য না পেয়ে ফিরে যেতে বাধ্য না হন। সাধারণ মানুষের দাবি, বাজারদরের ঊর্ধ্বগতির সময়ে ওএমএস কর্মসূচি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা। তাই পৌরসভায় পর্যাপ্ত চাল-আটা বরাদ্দ এবং সুষ্ঠু বিতরণব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক।
