ব্যবসা-বিনিয়োগে ধীরগতি, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোর সতর্কতার কারণে দেশের ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে। গত জুন শেষে ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য প্রথমবারের মতো ৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। তবে উদ্বৃত্ত অর্থ থেকে ঋণ হিসেবে বিনিয়োগ হচ্ছে না। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। মে শেষে এর পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, এক মাসে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়েছে ৭১ হাজার কোটি টাকা। গত বছরের জুনে এর পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৮৩ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল ১ লাখ ৯৩ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। আর ২০২৩ সালের জুনে ছিল ১ লাখ ৬৬ হাজার ২৭২ কোটি টাকা।
এক বছরে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বেড়েছে ৪৩ শতাংশ অন্যদিকে জুনে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০.৭৪ শতাংশ। বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪.৪৭ শতাংশে। অর্থাৎ ব্যাংকে যে হারে টাকা জমা হচ্ছে, সেই তুলনায় ঋণ হিসেবে অর্থ বের হচ্ছে অনেক কম।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও অনিশ্চিত ব্যবসায়িক পরিবেশের কারণে নতুন বিনিয়োগে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ কম। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোও ঋণ বিতরণে ঝুঁকি নিতে চাইছে না। ফলে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.৪৭ শতাংশে নেমেছে।
এদিকে, মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থের একটি অংশ আবার ব্যাংকে ফিরতে শুরু করেছে। তবে, আমানতের বড় অংশ যাচ্ছে অপেক্ষাকৃত ভালো ও নির্ভরযোগ্য কয়েকটি ব্যাংকে। এসব ব্যাংকও নতুন ঋণ দেওয়ার বদলে ঝুঁকিমুক্ত সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে অর্থ বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী।
তবে, উদ্বৃত্ত তারল্যের পুরোটা হাতে থাকা নগদ অর্থ নয়। এর বড় অংশ বিভিন্ন বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা। ব্যাংকগুলোকে বর্তমানে তলবি ও মেয়াদি দায়ের ১৩ শতাংশ এসএলআর এবং ৪ শতাংশ সিআরআর হিসাবে সংরক্ষণ করতে হয়। এর অতিরিক্ত অর্থই উদ্বৃত্ত তারল্য হিসাবে গণ্য হয়। প্রয়োজন হলে বিল-বন্ডে বিনিয়োগ করা অর্থ দ্রুত নগদায়ন করা সম্ভব।
ব্যাংকারদের আশঙ্কা, বিনিয়োগের চাহিদা না বাড়লে শিল্প উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তারা বলছেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ ও অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধান না হলে উদ্যোক্তাদের ঋণ নেয়ার আগ্রহ বাড়বে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত মে মাসে কম সুদের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেও এতে এখন পর্যন্ত প্রত্যাশিত সাড়া মেলেনি। পাশাপাশি নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশ করা হয়েছে। সমপ্রতি ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান সর্বোচ্চ ৪ শতাংশে সীমিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এর আগে, করোনার সময় ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় ১২টি প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ৯৪ হাজার ২৫০ কোটি টাকা বিতরণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। ওই সময়ও ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। ফলে, ২০২১ সালের শেষে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়ে ২ লাখ ৩১ হাজার ৭১১ কোটি টাকায় উঠেছিল। সেটিই তখন পর্যন্ত ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের সর্বোচ্চ রেকর্ড ছিল।
ব্যাংক এশিয়ার সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরফান আলী বলেন, ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নতি না হওয়ায় উদ্যোক্তারা এখন ঋণ নিতে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। একইসঙ্গে উদ্বৃত্ত তারল্যের বড় অংশ কয়েকটি ব্যাংকের কাছে রয়েছে। এসব ব্যাংক ঝুঁকি না নিয়ে সরকারি বিল ও বন্ডে অর্থ খাটানোকে বেশি নিরাপদ মনে করছে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধান না হলে বিনিয়োগের চাহিদা বাড়বে না। ঋণের সুদহার কমলেও বিনিয়োগের পরিবেশ ঠিক না হলে পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন হবে না।
