চলমান গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের কাছে থাকা বিরোধী দলের ১০ দফা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, নতুন কোনো পরিকল্পনা নয়, প্রায় তিন মাস আগে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটির কাছে দেয়া সুপারিশগুলোর বাস্তবায়ন এবং অগ্রগতির হিসাব জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে। আজ এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গত ১৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী দেশের চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে বিরোধী দলগুলোর কাছে কার্যকর পরিকল্পনা চেয়েছেন। জামায়াতে ইসলামী প্রধানমন্ত্রীর এ আহ্বানকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। তবে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিরোধী দলের পরিকল্পনা নতুন নয়। গত তিন মাস ধরেই সেটি সরকারের কাছে রয়েছে।
তিনি বলেন, ২১ মে ২০২৬ জাতীয় সংসদের জ্বালানি সংকটসংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্যরা লিখিতভাবে ১০ দফা সুপারিশ জমা দেন। ওই কমিটিতে সরকারি ও বিরোধী দলের পাঁচজন করে সদস্য ছিলেন। বিরোধী দলের পাঁচ সদস্যের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর তিনজন সদস্য ছিলেন। তারা দুটি বৈঠকে অংশ নিয়ে সংকটের কারণ নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেন। পরবর্তীতে ৭ জুন জ্বালানিমন্ত্রী ওই প্রতিবেদন জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেন। কমিটির নিজস্ব ১২ দফা সুপারিশের পাশাপাশি বিরোধী দলের ১০ দফাও প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ওই সুপারিশগুলো কোনো গোপন দলিল নয়। সংসদের নথিতে থাকা এসব প্রস্তাব বিভিন্ন গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে। ৮ আগস্ট জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যমান সংকট নিরসনে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছিল।
বিরোধী দলের দেয়া ১০ দফা সুপারিশে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে দ্রুত ফলদায়ক কূপগুলোতে ওয়ার্কওভার, ভোলা, জামালপুর ও জকিগঞ্জের গ্যাস জাতীয় ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ, স্থল ও সমুদ্রভাগে গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার এবং বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়।
এ ছাড়া সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) দ্রুত কার্যকর করা, ডিপো থেকে গ্রাহক পর্যায় পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহে ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ, কার্যকর নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে রুফটপ সোলার সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চাহিদা নির্ধারণে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আজ মূল প্রশ্ন পরিকল্পনা আছে কি নেই, সেটি নয়। মূল প্রশ্ন হলো, ২১ মে থেকে সরকারের হাতে থাকা এই পরিকল্পনার কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে, কোন সুপারিশে কাজ শুরু হয়েছে এবং কোনগুলো এখনো কাগজেই পড়ে আছে।
তিনি বলেন, তিন মাস আগে দেয়া পরিকল্পনার কোনটি বাস্তবায়িত হয়েছে, কোনটির কাজ শুরু হয়েছে এবং কোনটি গ্রহণ করা হয়নি-সরকারকে তার পরিষ্কার হিসাব দিতে হবে।
হারিকেন-ফ্যানের ছবি দিয়ে সংকটের বাস্তবতা খণ্ডন নয়: জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, হারিকেনের সামনে ফ্যান চলার ছবি দিয়ে দেশের জ্বালানি সংকটের বাস্তবতা খণ্ডন করা যায় না।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী একটি প্রতিবাদের ছবি নিয়ে কথা বলেছেন, যেখানে সামনে হারিকেন ও পেছনে ফ্যান দেখা গেছে। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে একটি স্থানে ফ্যান চলছিল কি না, সেটি দিয়ে দেশের সামগ্রিক গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা যায় না। হারিকেন রাজনৈতিক প্রতিবাদের প্রতীক হতে পারে, কিন্তু সংকটের জবাব দিতে হবে তথ্য ও কার্যকর সমাধানের মাধ্যমে।
তার দাবি, দেশে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। জুলাইয়ে একটি এফএসআরইউ বন্ধ হওয়ার পর দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। তাদের আগের নথি অনুযায়ী, দেশে গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট এবং সরবরাহ প্রায় ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে রয়েছে।
তিনি বলেন, মানুষ চুলায় গ্যাস, কারখানায় উৎপাদন এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ চায়। এ দাবির জবাব রাজনৈতিক ব্যঙ্গ দিয়ে নয়, কার্যকর সমাধান দিয়ে দিতে হবে।
তৃতীয় এফএসআরইউ নিয়ে প্রশ্ন: তৃতীয় এফএসআরইউ প্রয়োজন হতে পারে বলে উল্লেখ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জামায়াতে ইসলামী নতুন এফএসআরইউ নির্মাণের বিরোধিতা করছে না। তবে শুধু একটি নতুন এফএসআরইউ দিয়ে গ্যাস সংকটের সমাধান হবে না।
তিনি বলেন, এফএসআরইউ নিজে গ্যাস উৎপাদন করে না। এটি পরিচালনার জন্য এলএনজি আমদানি করতে হয়। এলএনজি কিনতে বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন এবং পুনঃগ্যাসীকরণের পর তা জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য পর্যাপ্ত পাইপলাইনও দরকার।
তিনি আরও বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয় এবং প্রায় ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা সরকারি ভর্তুকির তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। তাই তৃতীয় এফএসআরইউ করা হলে এলএনজি কোথা থেকে আসবে, কত দামে আসবে, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি কী হবে, পাইপলাইন কবে হবে এবং দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কত বাড়বে-এসব প্রশ্নের উত্তরও দিতে হবে।
৯০ দিনে ছয় কাজের প্রস্তাব: জামায়াত বলছে, সব সমস্যার সমাধান তিন মাসে সম্ভব নয়। সমুদ্রের নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, বড় পাইপলাইন নির্মাণ কিংবা ইস্টার্ন রিফাইনারি-২ সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন ৯০ দিনে সম্ভব নয়। তবে এই সময়ের মধ্যে অন্তত ছয়টি দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব।
প্রথমত, দ্রুত ফলদায়ক গ্যাসকূপে ওয়ার্কওভার শুরু করতে হবে। প্রথম ১৫ দিনের মধ্যে পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সকে ওয়ার্কওভারযোগ্য কূপের অগ্রাধিকার তালিকা প্রকাশ এবং ৩০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় অনুমোদন শেষ করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, কারিগরি সমস্যায় বন্ধ থাকা ও কম উৎপাদনশীল কূপগুলোর পূর্ণ তালিকা ৩০ দিনের মধ্যে প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে।
তৃতীয়ত, ভোলার গ্যাস ব্যবহারে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে সিএনজি বা এলএনজি আকারে পরিবহনের বিদ্যমান ব্যবস্থা আরও কার্যকর ও বিস্তৃত করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
চতুর্থত, সিস্টেম লস ও অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিরুদ্ধে ৯০ দিনের লক্ষ্য নির্ধারণ এবং প্রতি সপ্তাহে বিচ্ছিন্ন অবৈধ সংযোগ ও সাশ্রয় হওয়া গ্যাসের তথ্য প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে।
পঞ্চমত, গ্যাসের ঘাটতি থাকলে শিল্প, বিদ্যুৎ, সার ও আবাসিক খাতের জন্য যতটা সম্ভব পূর্বঘোষিত বণ্টনসূচি প্রকাশের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
ষষ্ঠত, ইতোমধ্যে নির্মিত সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং দ্রুত কার্যকর এবং ডিপো থেকে গ্রাহক পর্যায় পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহে ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
জামায়াতের পক্ষ থেকে সংকট মোকাবিলায় চারটি প্রশাসনিক সংস্কারের প্রস্তাবও তুলে ধরা হয়।
