দেশভাগ এবং এর পরবর্তী সহিংসতার জন্য কংগ্রেসকে দায়ী করেছেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। তার দাবি, ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার সময় সরদার বল্লভভাই প্যাটেল কিংবা নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী থাকলে ভারতের ইতিহাস ভিন্ন হতে পারত। লখনউয়ে ‘পার্টিশন হররস রিমেমব্রেন্স ডে’ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে যোগী আদিত্যনাথ বলেন, কংগ্রেস রাজনৈতিক ক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। তার অভিযোগ, দেশভাগের পরিণতি এখনো ভারতকে ভোগ করতে হচ্ছে। বার্তা সংস্থা পিটিআই জানায় যে- তিনি বলেন, স্বাধীনতার সময় যদি নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী থাকতেন, তাহলে কেউই ভারতের সামান্যতম ক্ষতি করতে পারত না।
একই প্রসঙ্গে সরদার বল্লভভাই প্যাটেলের কথাও উল্লেখ করেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী। তার দাবি, সে সময় সরদার বল্লভভাই প্যাটেলের মতো কেউ প্রধানমন্ত্রী থাকলে কেউ ভারতকে খণ্ডিত করতে পারত না। যোগী আরও অভিযোগ করেন, কংগ্রেস নেতাদের ‘কাপুরুষতার’ জন্য দেশকে বড় মূল্য দিতে হয়েছে। তিনি এ প্রসঙ্গে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ-বিরোধী আন্দোলনের সময়কার ঘটনাগুলোরও উল্লেখ করেন।
দেশভাগের প্রসঙ্গে যোগী আদিত্যনাথ দাবি করেন সিন্ধু, পাঞ্জাব ও বাংলার মতো অঞ্চল পাকিস্তানের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল, যদিও তার ভাষ্য অনুযায়ী এসব অঞ্চলের জনসংখ্যাগত ও আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য ভিন্ন ছিল। তিনি বলেন, ‘বাংলা ছিল বাঙালিপ্রধান। সমস্ত হিন্দু গ্রাম জোর করে বাংলাদেশকে দিয়ে দেয়া হয়েছিল।’ তার অভিযোগ, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য কংগ্রেস অতিরিক্ত মরিয়া হয়ে উঠেছিল এবং জনগণের আস্থার প্রতিদান তারা বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে দিয়েছে। বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর কথিত হামলার অভিযোগের বিষয়ে কংগ্রেসের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন যোগী। তার অভিযোগ, নির্বাচনী সমর্থন হারানোর আশঙ্কায় দলটি বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর হামলার ঘটনায় নীরব থেকেছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ বিভাজন নিয়েও বক্তব্য দেন যোগী। তার মতে জাতি, অঞ্চল ও ভাষার ভিত্তিতে বিভক্তি ঐতিহাসিকভাবে ভারতকে দুর্বল করেছে এবং বহিরাগত শক্তিকে ষড়যন্ত্রের সুযোগ করে দিয়েছে। তিনি বলেন, যখন এ ধরনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থাকে, তখন ষড়যন্ত্র সহজেই ঢুকে পড়ে। দেশভাগের পরিণতি হিসেবে সন্ত্রাসবাদ, নকশালবাদ, মাওবাদ ও বিভিন্ন ধরনের উগ্রবাদের বিস্তার ঘটেছে বলেও দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে কংগ্রেসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী। তার অভিযোগ, আধুনিক ভারত গঠনে কংগ্রেস নিজেদের অপরিহার্য শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে।
তিনি বলেন, ১৯৪৭ সালের আগের কথিত ষড়যন্ত্র নিয়ে সমাজে যে নীরবতা রয়েছে, তা নিয়েও ভাবা প্রয়োজন। তার ভাষায়, আজও কিছু মানুষ এমনভাবে সমাজের সামনে নিজেদের উপস্থাপন করেন যেন তারাই ভারত সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের ছাড়া ভারতের অস্তিত্বই সম্ভব ছিল না। দেশভাগকে তিনি ‘মানবতার সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়’ বলে উল্লেখ করেন। কংগ্রেসের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়েও সরব হন যোগী। তার অভিযোগ, দেশের অসংখ্য প্রতিষ্ঠান একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যদের নামে নামকরণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান সেই পরিবারের নাম বহন করতে শুরু করেছিল। আমরা সবাই নীরবে দাঁড়িয়ে শুধু তা দেখেছি। বর্তমানেও ওই পরিবারের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএর পক্ষেও বক্তব্য দেন যোগী আদিত্যনাথ। তার দাবি, এই আইনের বিরোধিতা করার কোনো যৌক্তিকতা ছিল না। তিনি বলেন আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে নির্যাতনের কারণে ভারতে আশ্রয় নেয়া হিন্দু, শিখ, জৈন, বৌদ্ধ, পারসি ও খ্রিস্টানদের নাগরিকত্ব দেয়ার বিধান রয়েছে এই আইনে। যোগীর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব দেশ একসময় অবিভক্ত ভারতের অংশ ছিল এবং তাদের সঙ্গে ভারতের হাজার বছরের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে। তিনি দাবি করেন, সিএএতে মুসলমানদের জমি বা সম্পত্তি কেড়ে নেয়ার কোনো বিধান নেই। কংগ্রেস বা সমাজবাদী পার্টির সম্পত্তি দখলেরও কোনো প্রশ্ন নেই। অথচ এই আইনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে আন্দোলন উসকে দেয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সিএএ-বিরোধী আন্দোলনের প্রসঙ্গে সমাজবাদী পার্টিকেও আক্রমণ করেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী। তার দাবি, ওই সময় সমাজবাদী পার্টি ক্ষমতায় থাকলে উত্তরপ্রদেশে ব্যাপক অশান্তি দেখা দিত। তিনি বলেন, দাঙ্গাবাজরা জানত তাদের কী মূল্য দিতে হবে, তাই তারা ইচ্ছেমতো কর্মকাণ্ড চালাতে পারেনি। তবে তাদের ‘দুঃসাহস’ স্পষ্ট ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি। অনুষ্ঠানে সরদার বল্লভভাই প্যাটেলের মূর্তি থেকে লোক ভবন পর্যন্ত একটি নীরব পদযাত্রাও অনুষ্ঠিত হয়। উত্তরপ্রদেশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, যোগী আদিত্যনাথসহ বিজেপির অন্যান্য নেতারা ওই পদযাত্রায় অংশ নেন।
