পাস্তুরিত তরল দুধের দাম লিটারে ১০ টাকা বাড়িয়েছে বৃহৎ দুগ্ধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মিল্কভিটা। ফলে খুচরা দোকানে মিল্কভিটার প্রতি লিটার দুধ এখন ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৫ই আগস্ট থেকে বাড়তি এ দাম কার্যকর হয়েছে। তবে, এরমধ্যে বাজারের অন্যান্য ব্যান্ডের তরলীকৃত দুধের দাম অপরিবর্তিত আছে। তাই সরকারি নীতিমালায় চলা প্রতিষ্ঠান মিল্কভিটা দাম বাড়ানোয় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বুধবার রাজধানীর মগবাজার, ইস্কাটন, কাওরান বাজারসহ একাধিক এলাকার খুচরা তরল দুধ বিক্রির প্রতিষ্ঠানে কথা বলে জানা যায়, দোকানে মিল্কভিটার নতুন দামের দুধের প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে। ৫০০ মিলিলিটারের (আধা লিটার) স্ট্যান্ডার্ড দুধ (লো ফ্যাট) ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ছিল ৫৫ টাকা। মিল্কভিটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিক্রি হচ্ছে প্রাণ, আকিজ ডেইরির ফার্মফ্রেশসহ আরও একাধিক প্রতিষ্ঠানের দুধ। প্রাণ, ফার্মফ্রেশসহ এসব কোম্পানির দুধের দাম বাড়েনি। বিক্রেতারা জানান, আগে কিনে আনা মিল্কভিটার দুধ সনাতন দামে বিক্রি করলেও নতুন করে দোকানে আসা দুধের দাম ১০ টাকা বাড়তিতেই বিক্রি হচ্ছে। তারা বলেন, মিল্কভিটার দাম যেহেতু বেড়েছে স্বাভাবিকভাবেই অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের দুধের দামও বাড়বে শিগগিরই।
মগবাজার সততা জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী আল-আমিন বলেন, দোকানে এখনো আগের দুধ আছে, সেগুলো লিটার ১০০ টাকায় বিক্রি করছি। যা আজ চলবে। কিন্তু আগামীকাল থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি করতে হবে। নিউ ইস্কাটনের বিসমিল্লাহ ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের মো. ফরহাদ বলেন, দেশে কোনো পণ্যের দাম বাড়লে তা আর কমে না। দুধের একটা কোম্পানি দাম বাড়িয়েছে, মানে সবাই এখন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই দাম বাড়িয়ে দেবে। কাওরান বাজারের প্রাণ ও আকিজের পরিবেশক ঢাকা ট্রেডার্স অ্যান্ড সাপ্লায়ার্সের আব্দুল হক বলেন, প্রাণ-আকিজের সব রকম দুধই আগের দামে বিক্রি করছি। বাড়তি দামে বিক্রির কথা জানানো হয়নি এখনো।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মিল্কভিটার দুধের দাম বাড়ানো অযৌক্তিক। যা বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। বাজারের প্রতিযোগিতায় থাকা অন্যান্য বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান দাম না বাড়ালেও সরকারের আওতায় থাকা মিল্কভিটাই দাম বাড়ানোর সূচনা করেছে; এ নিয়েও চলছে সমালোচনা।
কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন মানবজমিনকে বলেন, এটা খুবই দুঃখজনক যে, সবসময় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দাম বাড়ানোর পেছনের অগ্রণী ভূমিকা রাখলেও এখন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান দাম বাড়ানোর সূচনা করলো। এই দাম বাড়ানোর কারণ হচ্ছে বাজারকে অস্থিতিশীল করার একটা পাঁয়তারা।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আখতারুজ্জামান মানবজমিনকে বলেন, মিল্কভিটার উপর ভোক্তাদের আলাদা একটি ট্রাস্ট আছে। বাজারে হঠাৎ করে ১০ টাকা বাড়ানোয় ভোক্তাদের উপর বাড়তি চাপ পড়বে। একজন শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে বলতে পারি, হঠাৎ করে লিটারপ্রতি ১০ টাকা বাড়ানোর যৌক্তিকতা দেখছি না। এর ফলে আড়ং, প্রাণসহ দুগ্ধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দাম বাড়াবে। ফলে ভোক্তাদের উপর সরাসরি প্রভাব পড়বে। এই শিক্ষক বলেন, মিল্কভিটা যেহেতু সমবায় সিস্টেম এবং এখানে যেহেতু সরকারের সাপোর্ট আছে, তারা অন্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ে কমদামেই দুধ কিনতে পারে। তাই তারা বরং অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে কমদামে দুধ সরবরাহ করার কথা। সরকারি প্রতিষ্ঠান লাভ অর্জন করার জন্য নয়; এখানে জনসেবাই মুখ্য। কিন্তু, সেখানে আয়ের কথা ভাবলে তো এটা একটি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান হয়ে গেলো।
মিল্কভিটা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত ৫ই আগস্ট দাম বাড়ানোর পর প্রতিষ্ঠানটির দুগ্ধ বিক্রির পরিমাণ বেড়েছে। বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ বিক্রি কমে গেলেও একদিন পর ফের বিক্রির পরিমাণ বেড়ে যায়। মিল্কভিটার দেয়া তথ্য বলছে, ৪ঠা আগস্ট অর্থাৎ, দাম বাড়ানোর আগের দিন ৭৭ হাজার ৮০০ লিটার দুধ বিক্রি হয়েছে। পরের দিন, অর্থাৎ দাম বাড়ানোর দিন বিক্রি কমে ৪৪ হাজার ৫০০ লিটারে নেমে আসে। এরপর বাকি ৩ দিনের বরাবরই বাড়তে থাকে বিক্রি। ৬ই আগস্ট ৫৪ হাজার লিটার, ৭ই আগস্ট ৬০ হাজার এবং ৮ই আগস্ট ৭৫ হাজার লিটার দুগ্ধ বিক্রি হয়েছে।
আয়-ব্যয়ের সমন্বয় করতেই দাম বাড়ানো হয়েছে: মিল্ক ভিটার চেয়ারম্যান এস এম আমীর হামজা শাতিল মানবজমিনকে বলেন, মিল্কভিটার দুধের উপর মানুষ নির্ভরশীল নয়। আমরা যা সরবরাহ করি তা প্রতিদিনের চাহিদার তুলনায় খুবই সামান্য। আমরা ৫ থেকে ১০ টাকা বাড়ালে এটা জনজীবনে কোনো প্রভাবই পড়ছে না। তাছাড়া, আমরা কমদামে যে গুণগত মানসম্পন্ন দুধ দেই তা অন্য প্রতিষ্ঠান দিতে পারবে না।
তিনি বলেন, জুলাই মাসে মিল্কভিটার কর্মচারীদের বেতন বেড়েছে। কৃষকের ক্রয়মূল্যও ৩ শতাংশ বাড়িয়েছি। উৎপাদন খরচও বেড়েছে কৃষকের। এই ১০ টাকা না বাড়ালে আগামী মাস বা এর পরের মাসে অচল হয়ে পড়তো মিল্কভিটা। এসবের জন্য খরচ বেড়েছে। আমরা প্রতিদিন ২ লাখ লিটার দুধ সংগ্রহ করি। কিন্তু বিদ্যুৎ খরচ বেড়েছে, লোডশেডিং, জেনারেটর দিয়ে খামারগুলো চালাতে হচ্ছে, প্যাকেজিংয়ের ম্যাটেরিয়ালসের দাম বেড়েছে। তাছাড়া গ্যাস নেই বেশ কয়েকদিন ধরেই। গ্যাসের সংকটের কারণে এলপিজি ব্যবহার করে সব কাজ করা লাগছে। প্রাণ বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ে আমাদের খরচ বেড়েছে।
মিল্কভিটার চেয়ারম্যান বলেন, আমাদের সরকারি বিধিবিধান মানতে হয়। ১৫ শতাংশ ট্যাক্স, ভ্যাট দিয়ে আমাদের কিনতে হয়। প্রথমেই আমাদের বেশি টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। যা অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে লাগছে না।
