সরকারি শিশু নিবাস

২১৭ কোটি টাকার অনিয়ম

ফন্ট সাইজ:

সরকারি শিশু পরিবার এবং ছোটমণি নিবাস নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এতিম ও বাবা-মায়ের স্নেহবঞ্চিত শিশুদের অধিকার নিশ্চিত, নিরাপদ আবাসন ও জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০১৮ সালে হাতে নেয়া হয়েছিল এই প্রকল্প। তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পের কাজ ২০২১ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও আজও শেষ হয়নি। উল্টো দফায় দফায় বেড়েছে প্রকল্প ব্যয়। আর এই ৩৮৫ কোটি টাকার প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে ২১৭ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে খোদ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ অডিট প্রতিবেদনে। যার ভিত্তিতে তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন দেয়ার নির্দেশনা জারি করেছে মন্ত্রণালয়। এরপরও গত ১৩ই মে একনেক সভায় আবারো প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় বৃদ্ধি করে জুন ২০২৮ পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছে।

শিশুদের পরিচর্যা, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ২০১৮ সালের জুলাইয়ে ২৯৬ কোটি ৭১ লাখ ৯১ হাজার টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পটির অনুমোদিত করে তৎকালীন সরকার। সমাজসেবা অধিদপ্তর ও খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড যৌথভাবে কাজ করা এই প্রকল্পটি ২০২১ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরে ব্যয় বাড়িয়ে ৩৮৫ কোটি ২০ লাখ ৬৪ হাজার টাকা নির্ধারণ করে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সাল পর্যন্ত করা হয়। পরবর্তীতে আবারও সময় বৃদ্ধি করে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। ১৯টি উপজেলা ও সিটি করপোরেশন এলাকায় এই প্রকল্প ৩ বছরে বাস্তবায়নের লক্ষ্য থাকলেও ৮ বছর পার হয়ে গেলেও প্রকল্পের কাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি।

অডিট অনুযায়ী, গত ৮ বছর ধরে চলা এই প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনা, কাজের অগ্রগতি যাচাই, ক্রয় প্রক্রিয়া, কর-ভ্যাট আদায়ের মতো প্রতিটি স্তরেই গুরুতর অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। বর্তমানে প্রকল্পটির ১৯টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৩টির নির্মাণ কাজ চলমান। পূর্ত কাজের অগ্রগতি ৭০ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৬৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এর অনেক খাতে ঠিক কত টাকা খরচ করা হয়েছে তারও কোনো সঠিক হিসাব পাইনি অডিট দল। নথি বলছে, প্রকল্পের ৬৬ কোটি ৮২ লাখ ৭৩ হাজার টাকা ব্যয়ের বিপরীতে কোনো বিল-ভাউচার বা প্রয়োজনীয় হিসাব-নথি নিরীক্ষা দলকে সরবরাহ করা হয়নি। অর্থাৎ এই বিপুল অঙ্কের টাকা কোথায়, কীভাবে এবং কার মাধ্যমে ব্যয় হয়েছে, তার কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই। ফলে প্রকল্পের একটি বড় অংশের ব্যয় পুরোপুরি অস্বচ্ছ। একইভাবে কাজের বাস্তব অগ্রগতি যাচাইয়ের মূল নথি মেজারমেন্ট বুক (এমবি) ছাড়াই ৫ কোটি ৫২ লাখ ৯২ হাজার ৯১৬ টাকার বিল পরিশোধ করা হয়ে ছে। মেজারমেন্ট বুক না থাকায় প্রকৃত কাজের পরিমাণ নির্ধারণ করা যায়নি। ফলে অর্থ ছাড়ের যৌক্তিকতাও প্রশ্নবিদ্ধ। অডিটে নির্মাণ খাতেও বড় ধরনের অসামঞ্জস্য ধরা পড়েছে। তিনটি ভবনের মধ্যে দু’টির কাজ সম্পন্ন না হলেও ১৩ কোটি ১৭ লাখ ১১ হাজার ৯৮ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে। অন্যদিকে আরেকটির ক্ষেত্রে কাজের অগ্রগতির তুলনায় ৪ কোটি ৮৩ লাখ ১০ হাজার ৫৬৮ টাকা অতিরিক্ত বা আগাম পরিশোধের তথ্য মিলেছে।

এদিকে ইন্টেরিয়র ডিজাইনের কাজ আংশিক সম্পন্ন হলেও পুরো কাজের বিপরীতে ২ লাখ ৯৪ হাজার ৩২৩ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী চেকের মাধ্যমে সরবরাহকারীকে অর্থ পরিশোধ না করে ২ লাখ ৪০ হাজার ৬৩৮ টাকা দেয়া হয়েছে, যা সরকারি আর্থিক বিধির সরাসরি লঙ্ঘন। ক্রয় প্রক্রিয়াতেও অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে। ১৪ লাখ ১৭ হাজার টাকার একটি ক্রয়ে দরপত্র মূল্যায়ন ও কোটেশন যাচাই যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। এতে প্রতিযোগিতামূলক ক্রয় প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে মনে করছে অডিট কর্তৃপক্ষ। প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় বিতর্কিত অংশ হলো ১১৫ কোটি ৮৭ লাখ ৫০ হাজার ৫০০ টাকার একটি কাজ। ভবন নির্মাণে অভিজ্ঞতা না থাকা একটি নৌযান নির্মাণ ও মেরামতকারী প্রতিষ্ঠানকে ডেলিগেটেড ওয়ার্কস পদ্ধতিতে এই কাজ দেয়া হয়। চুক্তিভিত্তিক অফিস ভাড়ার ক্ষেত্রেও অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। প্রকৃত আয়তনের চেয়ে বেশি স্পেস দেখিয়ে ভাড়া পরিশোধ করায় ১ লাখ ৩১ হাজার ৫২০ টাকার আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে।

তবে এসব বিষয়ে সরকারি শিশু পরিবার এবং ছোটমণি নিবাস নির্মাণ/পুনঃনির্মাণ প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা প্রকল্প পরিচালক ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. বরকাতুর রহমান বলেন, প্রকল্পের এক অংশ বাস্তবায়ন করছে সমাজসেবা অধিদপ্তর ও অপর অংশ খুলনা শিপইয়ার্ড। খুলনা শিপইয়ার্ড মোট প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে ২৯৬ কোটি টাকার কাজ করছে। আর ২১৬ কোটি টাকার যে অডিট আপত্তি এসেছে সেটা তাদের ব্যয়ের অংশ। সেখানে আমার বা সমাজসেবা অধিদপ্তরের কোনো অনিয়ম নেই। তিনি বলেন, আমার অংশে যতটুকু আপত্তি এসেছিল তা আমি নিষ্পত্তি করে ফেলেছি। মেজারমেন্ট বুকে উল্লেখ ছাড়া ব্যয় বা সরাসরি টাকা পরিশোধের বিষয়ে তিনি বলেন, এগুলো সব কিছু খুলনা শিপইয়ার্ড করেছে। ‘কিন্তু একটা প্রকল্পে পিডি’র অনুমতি ছাড়া কিছুই হয় না’-এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমি নামে মাত্র পিডি’র দায়িত্বে আছি। বাকি সব কিছু খুলনা শিপইয়ার্ড করছে। আমাদের তারা কোনো তোয়াক্কা করে না। তারা তাদের মতো কাজ করছে।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. মামুন আল রশিদ বলেন, এটা প্রকিউরমেন্ট আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। কাজ শতভাগ শেষ হওয়ার আগে কোনোভাবেই বিল পরিশোধের সুযোগ নেই। এখানে যেটা হয়েছে তা অন্যায়। এতে অসৎ উদ্দেশ্য থাকতে পারে।

আরও পড়ুন:
১৫ই আগস্ট আজ

এদিকে গত ২৩শে জুলাই এনইসি-একনেক ও সমন্বয় অনুবিভাগের সহকারী সচিব হাবিবুর রহমান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে সরকারি শিশু পরিবার এবং ছোটমণি নিবাস নির্মাণ/পুনঃনির্মাণ প্রকল্পের অনিয়মের বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে তদন্তপূর্বক একটি প্রতিবেদন প্রদানের নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এ বিষয়ে সহকারী সচিব হাবিবুর রহমান বলেন, অনিয়মের বিষয়ে জানতে পেয়ে আমরা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছি। এখন এটা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের অধীনে আছে। তারাই বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।